‘ছেলে আমার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। ছেলেকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল যাচ্ছিলাম। তখন আমার সন্তান অ্যাম্বুলেন্স চালককে বলছিল ভাইয়া হাসপাতাল কত দূরে, এত দূরে হাসপাতাল কেন? এতদূর হাসপাতাল হলে মানুষ মারা যাবে। কাছাকাছি বানালো না কেন? আর বলছিল- আম্মুগো হাসপাতালে আমার সঙ্গে থাকবা তো! আমি বলেছিলাম যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমি তোমার পাশে থাকব বাবা। কিন্তু আমি থাকলেও বাবাটা নেই।’
ছেলের মৃত্যুর আগের কথাগুলো এভাবেই কান্না জড়িত কণ্ঠে বলছিলেন উত্তরায় যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত আব্দুল্লাহ ছামীমের (১৪) মা জুলেখা বেগম।
রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত আব্দুল্লাহ ছামীম। তাদের বাড়ি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিএম খালি মাঝিকান্দি গ্রামে। আজ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে অ্যাম্বুলেন্স করে ছামীমের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। পরে সকাল ৯টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। নিহতদের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
আব্দুল্লাহ ছামীমের মা জুলেখা বেগম বলেন, ‘মুঠোফোনে কল আসে, আপনার ছেলে আব্দুল্লাহ ছামীম বিমান দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে, আপনি তাড়াতাড়ি আসেন। পরে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই, গিয়ে বাবাটাকে দেখতে পাই। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আমরা কোনো অ্যাম্বুলেন্স খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাই, তাতে আবার এসি নাই। পরে ওই অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ভর্তি করা হয় ছামীমকে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১১টার দিকে মারা যায় আমার ছেলে ছামীম।’
ছামীমের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছামীমের মৃত্যু হয়। এর আগে গত ডিসেম্বরে ছামীমের বাবা সৌদি আরব প্রবাসী আবুল কালাম আজাদ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে না উঠতেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ছামীমের। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে ছামীম ছোট। বাবাহারা তিন সন্তানকে নিয়ে রাজধানী উত্তরা দিয়াবাড়ি খালপাড় এলাকায় থাকেন মা জুলেখা বেগম।
ছামীমের পাশের বাড়ির মজিবুর রহমান বলেন, ‘ঈদ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গ্রামের বাড়িতে আসতো ছামীম। তার মৃত্যুর খবর শুনে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। গ্রামের মানুষ তাকে একনজর দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে অ্যাম্বুলেন্স আসার শব্দ শুনে গ্রামের মানুষ যেন জেগে ওঠে। মুহূর্তেই বাড়িতে লোকজন ভরে যায়। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে।’
ছামীমের মামা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় ডিএম খালি চর ভয়রা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে ছামীমকে দাফন করা হয়। আমরা চাই বিমান বিধ্বস্তর ঘটনায় সঠিক তদন্ত করা হোক। এটা কি কোনো দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পনা করে করা হয়েছে?
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ছামীমরা দুই ভাই, এক বোন। বড় বোন অনিকা পড়াশোনা শেষ করে বেকার আছেন। আর ভাই জাহিদ ঢাকার একটি কলেজে আইন বিভাগে পড়াশোনা করছেন। তিনজনের মধ্যে ছামীম সবার আদরের ছিল।’



