কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা রাইস মিলগুলোর নির্গত উড়ন্ত ছাই ও বর্জ্যের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অধিকাংশ মিল পরিবেশগত শর্ত না মেনে চলায় বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সেচ প্রকল্প জিকে (গড়াই-কুষ্টিয়া) ক্যানাল মারাত্মক দূষণের মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি সদর উপজেলার কদমতলা, কবুরহাট, খাজানগর, আইলচারা ও পোড়াদহ এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাতাসে উড়ন্ত ছাইয়ে ঢেকে যাচ্ছে বাড়িঘর, উঠান, আসবাবপত্র ও কৃষিজমি। সামান্য বাতাসেই ছাইয়ের কণা ছড়িয়ে পড়ছে চোখ-মুখে। ফলে শিশুদের ঘরের বাইরে খেলাধুলা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কদমতলা এলাকার এক গৃহিণী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কাঁথা ধুয়ে রোদে দিলেই ছাইয়ে ঢেকে যায়। বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে বের হতে পারি না, চোখে ছাই ঢুকে কান্নাকাটি করে। ছাইয়ের ভয়ে বাচ্চারা ঘর থেকেই বের হতে চায় না, বাধ্য হয়ে মোবাইলে সময় কাটায়।’
একই ভোগান্তির কথা জানান স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘দরজা-জানালা খুললেই খাট ও পড়ার টেবিল ছাইয়ে ভরে যায়। ঠিকমতো পড়াশোনাও করা যাচ্ছে না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুষ্টিয়া সদর এলাকায় গড়ে ওঠা তিন শতাধিক রাইস মিলের অধিকাংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো শর্ত মানছে না। চাল উৎপাদনের সময় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত তুষ থেকে যে ছাই তৈরি হয়, তা আধুনিক প্রযুক্তিতে সংগ্রহ বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে ছাই বাতাসে ছড়িয়ে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা আচ্ছন্ন করে ফেলছে। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার অভিযোগ জানানো হলেও মিলগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুষ্টিয়ায় ৬০টির বেশি অটো রাইস মিল রয়েছে। এর মধ্যে ১০টিরই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই এবং অন্তত ২০ থেকে ৩০টির ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়নি। এছাড়া শতাধিক হাস্কিং মিলের অধিকাংশেরই কোনো অনুমোদন নেই। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মণ ধান ভাঙানো একটি অটো রাইস মিল থেকে গড়ে অন্তত ৬০ বস্তা ছাই তৈরি হয়, অথচ তা নিরাপদ সংরক্ষণে মিলগুলোর কোনো নিজস্ব ব্যবস্থা নেই।
পরিবেশ দূষণের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষি উৎপাদনেও। রাইস মিলের কালো পানি ও বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে জিকে ক্যানালে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি অটো রাইস মিলে বর্জ্য পরিশোধনের জন্য নিজস্ব পুকুর বা শোধনাগার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ মিলেই তা নেই।
ক্যানালের দূষিত পানি নিয়ে খাজানগরের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘ক্যানেলের পানি দিয়েই আমরা চাষাবাদ করি। কিন্তু এই পানিতে ছাই ও বর্জ্য মেশায় ধানের ফলন কমে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে জমিতে কীটনাশকও বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাইস মিল মালিকেরা। তাঁদের দাবি, শত্রুতাবশত মিলগুলোর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। মিলগুলো চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জিকে ক্যানাল দূষণের বিষয়ে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, ‘ক্যানালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট মিল মালিকদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইমদাদুল হক বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রতিটি অটো রাইস মিল সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে রাইস মিলগুলোর পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত নজরদারি বাড়িয়ে জিকে ক্যানালসহ আশপাশের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানান তাঁরা।



