শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার—এই বাস্তবতাকে সামনে এনে নতুন ইতিহাস গড়েছে রংপুর বিভাগ। প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, যা দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শুক্রবার সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় এসব শিক্ষার্থী অংশ নেন। টানা তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তারা জানান, জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এই পর্যায়ে পৌঁছানো তাদের জন্য গর্বের বিষয়। তারা বিশ্বাস করেন, শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সমাজে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারবেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক ৯টি কেন্দ্রে মোট ১ হাজার ১৩২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী, যারা রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এ কেন্দ্রে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫৯ জন।
পরীক্ষার্থী মোছাম্মৎ আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়, আমাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। আমরা দীর্ঘদিন সমাজে অবহেলার শিকার হয়েছি। এখন সুযোগ পেয়েছি—এটাই আমাদের বড় শক্তি। আমরা পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।’
অন্যান্য পরীক্ষার্থীরাও জানান, ‘সরকার আমাদের লেখাপড়ার সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা পরীক্ষা দিচ্ছি। পরীক্ষা ভালো হয়েছে, আশা করি ভালো ফলাফল করতে পারব।’
শিক্ষাবিদদের মতে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। ফলে তাদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তাদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির পথ প্রসারিত হয়েছে। এবারের এই অংশগ্রহণ সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলভিত্তিক এসএসসি প্রোগ্রামে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা চালু করা হয়েছে। তাদের কোর্স ফি’র ৬০ শতাংশ মওকুফ করা হয়েছে, যা শিক্ষার পথ সহজ করেছে। ফলে অনেকেই নতুন করে মূলধারার শিক্ষায় ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছেন।
সচেতন মহলের মতে, এই উদ্যোগ শুধু একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নয়—এটি সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। সুযোগ পেলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও অন্যদের মতোই সফল হতে পারেন। তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদরা মনে করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু নীতিমালা প্রণয়নই নয়, বাস্তবায়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, মানসিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
রংপুরে তৃতীয় লিঙ্গের ২৮ জন শিক্ষার্থীর সম্মিলিত অংশগ্রহণ শুধু একটি পরীক্ষার ঘটনা নয়; এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। সমতা, সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এটি একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. মাহেদুল আলম বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রে একসঙ্গে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। আমরা তাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি, যাতে তারা কোনো সংকোচ ছাড়াই পরীক্ষা দিতে পারেন।’
রংপুরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক আবু হাফিজ মো. ফজলে নিজামি বলেন, ‘আমরা সবসময় চেষ্টা করছি, তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীরা যেন কোনো বৈষম্যের শিকার না হন। তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। একসঙ্গে ২৮ জনের অংশগ্রহণ একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী। এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সমাজের মূলধারায় আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হতে পারবেন।’
এদিকে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ‘শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। কেউ যেন তার লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়—এটাই আমাদের লক্ষ্য। তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করা আমাদের দায়িত্ব। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের জন্য আরও সুযোগ বাড়ানো হবে।’



