বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত একুশে পদকপ্রাপ্ত চারুশিল্পীদের সংবর্ধনা, সংগঠনের অভিষেক এবং পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ইফতার মাহফিল মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের চারুশিল্প চর্চাকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করা, শিল্পীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা এবং জাতীয় শিল্প ঐতিহ্যের ধারাবাহিক বিকাশ নিশ্চিত করার লক্ষে এই আয়োজন করা হয়।
বুধবার (১১ মার্চ ২০২৬) বাংলাদেশী চারুশিল্পী সংসদ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি দেশের শিল্পীসমাজ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিল্পপ্রেমীদের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়। সংগঠনটি থেকে পাঠানো এক সংবদা বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, অনুষ্ঠানে দেশের প্রখ্যাত একুশে পদকে ভূষিত চিত্রশিল্পী ও প্রাচ্যশিল্পচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সাত্তার, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী অধ্যাপক রোকেয়া সুলতানা এবং ভাস্কর শিল্পী তেজষ হালদার জস এর সম্মানে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের চারুশিল্পে তাঁদের দীর্ঘ শিল্পসাধনা, সৃজনশীল অবদান এবং দেশীয় শিল্পচর্চাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম, প্রশাসক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশী চারুশিল্পী সংসদের সভাপতি শিল্পী সৈয়দ মোহাম্মদ আলী পাপ্পু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত–ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক ও বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন ও বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম শেখ।
অনুষ্ঠানের মূলবক্তা বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদের সাধারণ সম্পাদক শিল্পী মো. মিজানুর রহমান মিজান সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে চারুশিল্পের বিকাশে একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদ শিল্পীদের একটি সম্মিলিত ও সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তিনি সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, যা আগামী দিনে চারুশিল্পের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদ ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটি দেশের চারুশিল্পীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, জাতীয় শিল্প-ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশ এবং শিল্প-সংস্কৃতির ইতিবাচক ধারাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। চারুশিল্পের বিকাশ, শিল্পীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ প্রদান এবং জাতীয় শিল্প-ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদ একটি কার্যকর সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সৃজনশীল বিনিময় এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি শক্তিশালী বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।’
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদের সহসভাপতি গাজী মো. জহিরুল ইসলাম টিটো। তাঁর সাবলীল ও মার্জিত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে এক আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সংবর্ধিত শিল্পী এবং বাংলাদেশি চারুশিল্পী সংসদের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, একুশে পদকে ভূষিত দেশবরেণ্য শিল্পী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার তাঁর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বাংলাদেশের চারুশিল্পের ঐতিহ্য, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ পথচলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের চারুশিল্পের ঐতিহ্য হাজার বছরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই ঐতিহ্য শুধু আমাদের নান্দনিক চর্চার অংশ নয়, বরং এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। তাই এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে সমকালীন শিল্পচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করতে হলে শিল্পীদের মধ্যে সৃজনশীল সাধনা, গবেষণা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি মুক্ত ও সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করা, জাতীয় শিল্প-ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চারুশিল্পকে আরও দৃশ্যমান করে তোলা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশী চারুশিল্পী সংসদ সেই লক্ষ্যেই শিল্পীদের একটি সম্মিলিত ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
বাংলাদেশী চারুশিল্পী সংসদের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আলী পাপ্পু তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের চারুশিল্পের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সৃজনশীল ধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য সুদৃঢ় করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। দেশবরেণ্য শিল্পীদের সম্মাননা প্রদান আমাদের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।’



