বাংলা চলচ্চিত্রে যাঁদের হাত ধরে নবযুগের সূচনা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম নায়করাজ রাজ্জাক। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বাংলা-উর্দু মিলিয়ে তিনশ’র মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন। দর্শকদের উপহার দিয়েছেন বেশ কিছু ক্লাসিক ছবি।
আজ এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মবার্ষিকী। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। অভিনয়ের টানেই এক সময় তাঁর ঢাকায় আসা।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সিনেমার চেয়ে কম কিছু ছিল না রাজ্জাকের জীবন। বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয় তাঁকে। অচেনা ঢাকা শহরে যখন তিনি পা রেখেছিলেন, তখন চেনাজানা বলতে তেমন কেউ ছিল না। চিনতেন শুধু চলচ্চিত্র পরিচালক আব্দুল জব্বার খানকে। তাঁকে রাজ্জাকের ব্যাপারে চিঠি লিখে দিয়েছিলেন নির্মাতা পিযুষ বসু।

ঢাকায় এসে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সংগ্রামমুখর এক জীবনে পড়েন রাজ্জাক। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ঢাকায় ফুলবাড়িয়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেছি বড় ছেলেকে কোলে নিয়ে স্ত্রীর হাত ধরে। সেখান থেকে যাই মিরপুর। তখন আমাদের একমাত্র ছেলে বাপ্পার বয়স মাত্র ৮ মাস। সেও আমাদের স্ট্রাগলের সঙ্গী।’
শুরুর দিকে নির্মাতা কামাল আহমেদের চতুর্থ সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন রাজ্জাক। এ ছাড়া মজনু নামের একজন নাট্যকর্মী বন্ধুর সুবাদে মঞ্চেও কাজ করেন তিনি। অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নটা তখনও হাতছানি দিচ্ছে। অবশেষে বশীর হোসেনের পরিচালনায় ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’, কামাল আহমেদের ‘আখেরি স্টেশন’ নামক চলচ্চিত্রে ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর আবারও বেকার জীবন শুরু। কী করবেন, কী করবেন ভাবছেন! এমন সময় নির্মাতা জহির রায়হানের সঙ্গে পরিচয় হয়। নিজের ইচ্ছের কথা জানান রাজ্জাক। চলে যায় আরও বহুদিন। শেষমেশ জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। বাকিটা ইতিহাস!

দেশজুড়ে তুমুল সাড়া ফেলে এই ছবি। এরপর তাঁকে আর পেছন ফিরতে হয়নি। কিন্তু সেই বেহুলা ছবির প্রযোজকের পছন্দের তালিকাতেই নাকি ছিলেন না রাজ্জাক!
এক সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘‘‘বেহুলা’ নিয়ে আমি খুব টেনশনে ছিলাম। কারণ জহির রায়হান আমাকে নায়ক হিসেবে পছন্দ করলেও প্রডিউসার প্রথমে পছন্দ করেন নাই। ছবিটা ছিল স্টার গ্রুপের। তারা নায়ক হিসেবে চেয়েছিল শওকত আকবর, হাসান ইমামসহ তখনকার দিনের যেকোনো পরিচিত অভিনেতাকে। একেবারে নতুন আনকোরা একজন অভিনেতা হিসেবে আমাকে তাদের পছন্দ হয়নি। কিন্তু জহির রায়হান তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। আমাকে দিয়ে তিনি প্রথমে একটি গানের দৃশ্যের স্যুটিং করলেন, নাচে মন ধিনা ধিনা… ‘বেহুলায়’ অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ছিল এই গান।’’

আর সেটির দৃশ্যায়ন দেখেই প্রযোজকের মন পাল্টাতে শুরু করে। নায়করাজের ভাষ্য, ‘‘প্রডিউসারকে এই গানের চিত্রায়ন দেখানোর পর পরিবেশ, পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রডিউসার আমাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ‘বেহুলা’ রিলিজ হলো। সুপারহিট হলো। সারাদেশে হইচই পড়ে গেল ছবিটি নিয়ে। অভিনেতা হিসেবে আমার প্রতি আগ্রহ দেখা দিল সবার। বলা যায় জহির রায়হানের ‘বেহুলাই’ আমাকে ছবির জগতে টিকে থাকার শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।’’
এরপর অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে দেখা দিয়েছেন নায়করাজ রাজ্জাক। তাঁর অভিনীত ‘কাগজের নৌকা’, ‘রংবাজ’, ‘আমার জন্মভূমি’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘স্লোগান’, ‘ঝড়ের পাখি’, ‘ স্বরলিপি’, ‘আলোর মিছিল’, ‘বেঈমান’, ‘আবির্ভাব’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘অবুঝ মন’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘ছুটির ঘন্টা’, ‘আনার কলি’, ‘রজনীগন্ধা’, ‘বড় ভালো লোক ছিলো’, ‘চাপা ডাঙ্গার বউ’, ‘সন্ধি’ চলচ্চিত্রগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


নায়করাজের সম্বল ছিল একটি চিঠি
রাজ্জাকের ইচ্ছে ছিল বলিউডে ক্যারিয়ার তৈরি
নায়করাজ হয়ে ওঠার আগের গল্প
