
পরিচিত বা চিরচেনা—এই দুই শব্দে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এসবে চমকানোর কিছু থাকে না। চেনা পথের সুবিধা হলো, সহজে চলা যায়। অনুসন্ধান করতে হয় না কিছুই। তবে ওটিটি দুনিয়ার ওয়েব সিরিজ যদি এসব শব্দ অবলম্বন করে চলে, তবে বেজায় অসুবিধা। কারণ তাতে দর্শকদের পাওয়ার কিছুই থাকে না যে!
ঠিক এই অবস্থাটিই হয়েছে ‘প্রচলিত’ ওয়েব সিরিজের। এতে মোট ৫টি পর্ব। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম চরকিতে গত প্রায় ১ মাস ধরে এর একেকটি পর্ব প্রচারিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রচারিত হয়েছে শেষ পর্বটি। প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে নতুন গল্প মুক্তি দিয়েছে ‘প্রচলিত’। গল্পগুলোর নাম হলো—‘রিংটোন’, ‘বিলাই’, ‘বেওয়ারিশ’, ‘কলিংবেল’ ও ‘হাতবদল’। এর আগে রিংটোন নিয়ে একটি রিভিউ প্রকাশিত হয়েছিল ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ওয়েবপোর্টালে। চাইলে পড়ে নিতে পারেন।
চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক পুরো সিরিজের সামগ্রিক মূল্যায়ন।
‘রিংটোন’ ছিল মূলত একজন ছিনতাইকারীর গল্প। ছিনতাইকারী মজনুর চরিত্রে ছিলেন মোস্তফা মন্ওয়ার। তিনি একাই পুরো গল্প নিয়ে এগিয়েছেন। এ ধরনের গল্পের জন্য তিনি যথার্থ অভিনেতা। তাঁর দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে পর্দায় চরিত্র ফুটিয়ে তোলার সুযোগ আসলে সীমিত ছিল। সঠিকভাবে চরিত্রাভিনেতাকে ব্যবহার করলে হয়তো প্রথম গল্পটি দিয়েই বাজিমাত করা যেত।

এটি বলতেই হয় যে, প্রথমের তুলনায় দ্বিতীয় গল্পটি আরও দুর্বল। ‘বিলাই’ নামের ২৩ মিনিটের পর্বটিতে যে রহস্য ঘনীভূত করার চেষ্টা হয়েছে, তা শেষে গিয়ে ব্যর্থই হয়েছে বলা যায়। গল্পটি নিয়ে চরকি বলছে এ রকম—‘করোনা মহামারি চলাকালীন নিম্নবিত্ত মানুষ কীভাবে বিধিনিষেধের শৃঙ্খল থেকে উত্তরণ পেল, তা কল্পকাহিনির চেয়ে কম নয়। এটি উত্তম ও তার বিড়ালের বিধিনিষেধ চলাকালীন বেঁচে থাকার এবং মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।‘ এবং এর মধ্যে রহস্যও আনার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু প্রথম পর্বের মতোই দ্বিতীয়টিতেও রহস্য যেন জমাট বাঁধতেই পারল না। অথচ উত্তমের ভূমিকায় থাকা আবদুল্লাহ আল সেন্টু ছিলেন নিখুঁত বাছাই। তিনি ক্ষুধার্ত ও সংকটে থাকা নিম্নবিত্তের মানুষের সঠিক প্রতিনিধিত্বই করেছেন। যদিও তাঁদের মুখে এত পরিশুদ্ধ ও চোস্ত বাংলা বড্ড বেমানান, অবাস্তবও বটে। আরও সমস্যা হলো, রহস্যের কিনারা করতে গিয়ে ছোটবেলার সেই অতি পরিচিত মারমেইডের গল্প মনে পড়ে যায়। এ ধরনের ছাঁচে পরিণত দর্শকেরা এখনও আগ্রহী কি না—সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
পাঁচটি পর্বের মধ্যে কিছুটা রহস্য দেখাতে পেরেছে ‘বেওয়ারিশ’। খানিকটা শিহরণও জাগাতে পেরেছে। একটা বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে পুলিশের ইনফর্মার কালাম ও ভ্যানচালক সিদ্দিকের গ্রামের জনশূন্য রাস্তা দিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার গল্প এটি। গল্পের প্রয়োজনেই এসেছে বাঁশবাগান। এর আলো-আঁধারির খেলা এবং কালামের ভূমিকায় থাকা রফিউল কাদের রুবেলের অভিনয়গুণের কারণে কিছুটা ‘কী হয়, কী হয়’ ভাব জেগেছিল মনে। কিন্তু তা ২৬ মিনিটের গল্পের ১৫ মিনিট পর্যন্তই। এরপরই চলে আসে চিরচেনা ছক।

একই দোষে দুষ্ট শেষ গল্পটিও। ‘বেওয়ারিশ’ ও ‘হাতবদল’-এর ফর্মুলা একই। একই কৌশলের দুটি গল্প কেন পর্দায় আনার প্রয়োজন পড়ল, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। যদি একজন দর্শক একবারে পাঁচটি পর্ব দেখতে বসেন, তবে তিনি বিরক্ত হবেন নির্ঘাত। আর কেউ যদি ওই এক সপ্তাহের বিরতি মেনে নিয়ম করে দেখতে বসে থাকেন, তবে তাঁর মনে হতেই পারে কেন সময়টা নষ্ট করলেন! আর ইন্টারনেটের অপচয় তো আছেই।
অন্যদিকে ‘কলিংবেল’ সদ্য বিবাহিত দম্পতি অ্যানা ও রিচার্ডের অনুসন্ধানী মনকে এত দ্রুত জাগিয়ে দিল যে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য! তারা ভীত তো হলেনই না, বরং দক্ষ ঘোস্ট হান্টারদের মতো অনুসন্ধানে নেমে পড়লেন। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা যা পেলেন, তা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বর্ণনায় ‘অপ্রত্যাশিত সত্য’ হলেও, আদতে প্রচণ্ড ক্লিশে। এমন ‘সত্য’ দেখানো আরও অনেক মিস্ট্রি স্টোরি আমরা ছোট ও বড় পর্দায় এন্তার দেখেছি।
বলা হচ্ছে, ‘প্রচলিত’র গল্পগুলো হাঁটতে–চলতে কখনো মানুষের মুখে শোনা, কখনো পড়া, কিছু শৈশব থেকেই পাওয়া। সেসব ভাবনাকেই সমসাময়িকতার চাদরে জড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, মোড়ক বদলানোর চেষ্টা ছিল। কিন্তু মোড়ক বদলালে তা ভালোমতোই করা উচিত। তাতে রহস্যের রূপ দেখানোতেও সৃষ্টিশীল হওয়া প্রয়োজন। নইলে শুধু মোড়ক বদলালেই কি দর্শকের কাছে সমাদৃত হওয়া যাবে? ভেতরের বস্তুটিও তো চিত্তাকর্ষক হওয়া চাই, নাকি!
‘প্রচলিত’ সিরিজে ক্যামেরার কাজ মোটের ওপর ভালোই ছিল। আবহসংগীতও খারাপ না। এর পরিচালক মো. আবিদ মল্লিক। গল্প ও চিত্রনাট্যও তাঁর। এক কথায়, তিনি চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু গল্পের উপক্রমণিকা বা সংযোগকারী হিসেবে সবসময়ই যেমন ড্রোন ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য কাজে দেয় না, তেমনি চিত্রনাট্য যুৎসই না হলে পুরো গল্পই আসলে ঝুলে যায়। তবে চরিত্র হিসেবে কুকুর বা বিড়ালকে হাজির করা সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের কাজ কঠিন। ঝুঁকি নিয়ে তিনি সেই রাস্তায় হেঁটেছেন বলে অবশ্যই সাধুবাদ পেতে পারেন।
এক কথায়, ‘প্রচলিত’র শিল্পী নির্বাচন সঠিক হলেও, তাঁদের কাজে লাগানোর সুযোগ দেয়নি চিত্রনাট্য। মিস্ট্রি বলে দাবি করা হলেও, তা পর্দায় উঠে এসেছে খুবই চেনা ছকে। মিস্ট্রি হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো অননুমেয় অবস্থা। আর সেই জায়গাটিতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে ‘প্রচলিত’। ফলে রোমাঞ্চ বা শিহরণ শুধু দাবি হিসেবেই থেকে গেল, অনুভব আর করা গেল না!


নতুন সিরিজে শুভ, বিপরীতে কলকাতার সোহিনী
গুজবে কান না দিয়ে ভালোবেসে যাবেন: তানজিন তিশা
ফিলিস্তিনিদের পাশে সিয়াম, পোশাকেও প্রতিবাদী
