জন্মশতবর্ষে মহানায়ক উত্তম কুমার। আজ এ কিংবদন্তির জন্মদিন। অভিনয়ের জাদুতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হৃদয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন। তবে তাঁর নায়ক থেকে মহানায়ক হয়ে ওঠার পথ কখনও মসৃন ছিল না। প্রথম জীবনে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে কেরানির চাকরি করতে হয়েছিল তাঁকে। কারণ সংসারের দায়ভার তাঁর কাঁধেই এসে পড়েছিল। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে তিনি সেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন।
চাকরির পাশাপাশি ‘সুহৃদ সমাজ’ নামের একটি নাট্যদলে অভিনয়ও করতেন উত্তম। এটি ছিল তাঁদের পারিবারিক নাটকের দল। নীতিন বসু পরিচালিত ‘মায়াডোর’ নাটকে তিনি সেসময় সকলের নজর কেড়েছিলেন। এরপর তাঁরই পরিচালনায় ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মাধ্যমে রুপালি পর্দায় অভিষেক করেন তিনি। এতে নায়ক অসিতবরণের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তম। যেখানে টাইটেল কার্ডে তাঁর নামই ছিল না।
তবে দ্বিতীয় ছবি ‘কামনা’র (১৯৪৯) পর্দায় নায়ক হিসেবে দেখা যায় উত্তমকে। টাইটেল কার্ডে নাম ছিল ‘উত্তম চ্যাটার্জি’। কিন্তু ছবিটি চলল না। পরের ছবি ‘মর্যাদা’তে (১৯৫০) উত্তমের নাম হয় ‘অরূপ কুমার।’ সেই ক্ষেত্রেও ভাগ্য পরিবর্তন হলো না, মুখ থুবড়ে পড়ে ছবিটি। পরের ছবি ‘ওরে যাত্রী’তে (১৯৫১) আবারও ‘উত্তম চ্যাটার্জি’ হয়ে ফিরলেন। তারপর ‘সহযাত্রী’ (১৯৫১) ছবি থেকে তিনি হলেন উত্তম কুমার। কিন্তু সাফল্য আসতে সময় লেগেছিল আরও কিছুদিন।

নিজে ভালো গান করতেন। আর গানে ঠোঁট নাড়ানোর ব্যাপারে উত্তম কুমারের অনন্যতা যে কিংবদন্তিতুল্য, তা সকলেই জানেন। এই বিষয়ে প্রথম বলেছিলেন পরিচালক নির্মল দে। তাঁকে সিনেপর্দায় উত্তম কুমারের ‘জন্মদাতা’ বলা হয়। কারণ প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দৃষ্টিদান’ থেকে ‘সঞ্জীবনী’ (১৯৫২) পর্যন্ত পরপর ৭টি ছবি ফ্লপ করার পর উত্তম রীতিমতো অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথাই ভেবেছিলেন। ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমায় বিদ্রুপ আর টিপ্পনিতে বিপর্যস্ত তিনি। তখন সেই নির্মল দে পরিচালিত ‘বসু পরিবার’ (১৯৫২) মুক্তি পেল, আর ঘুরে দাঁড়ালেন উত্তম।
বাণিজ্যিকভাবে চূড়ান্ত অসফল একজন অভিনেতাকে কেন নিজের ছবিতে নিয়েছিলেন নির্মল দে, সেই গল্পে আসা যাক। তখন ‘সঞ্জীবনী’ ছবির কাজ চলছে। প্রযোজনায় এমপি প্রোডাকশন্স। উত্তম-নির্মল দু’জনেই তখন এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে ছিলেন। ‘সঞ্জীবনী’তে অনুপম ঘটকের সুরে শৈলেন রায়ের কথায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গান ছিল ‘চাঁদের বেণু বাজবে এবার…।’ একদিন স্টুডিওতে বসে আপনমনেই গানটা গাইছিলেন উত্তম। নির্মল দে কাছাকাছিই ছিলেন। তাঁর কানে এলো উত্তমের সুরেলা গলা আর চোখে পড়ল মুখের নাটকীয় অভিব্যক্তি ও আত্মমগ্নতার রূপ। ঠিক করলেন নিজের প্রথম পরিচালিত ছবি ‘বসু পরিবার’-এ বড়ভাই সুখেনের চরিত্রে কাস্ট করবেন উত্তমকে।

তবে এই সিদ্ধান্তে অনেকেই নাক সিঁটকেছিলেন। কিন্তু পরিচালক নির্মলের যুক্তি ছিল, ‘ও যখন গাইছিল, সুর, ছন্দ আর কথার সঙ্গে সঙ্গে ওর অভিব্যক্তি বদলাচ্ছিল। আমি সেটাই লক্ষ্য করছিলাম। যার অনুভুতি এত তীক্ষ্ণ, ভাব স্বতোৎসারী, তার পক্ষে সব চরিত্রই করা সম্ভব। ওকে আমি গ্রাম্য চরিত্র দেব। দেখবে ও তা-ও সুন্দর করবে।’ এমপি প্রোডাকশন্সের প্রবীণ কর্মী সলিল সেনকে নির্মল দে বলেছিলেন, ‘আমার কাজ ওকে অ্যাক্টিং শেখানো নয়, ওর এই ভাবটা যাতে ক্যামেরার সামনে ধরে রাখতে পারে সেটুকু শিখিয়ে দেওয়া। শেখানো ঠিক নয়, ওকে শুধু ধরিয়ে দেওয়া। ও অনেক কিছু জানে, কিন্তু দুমদাম করে জাহির করে না। আমি বলছি দেখো, হি উইল স্কোর। কাব্যের রসে যে সঞ্জীবীত হতে পারে, তার অভিনেতা হিসাবে ভয় কী? অবশ্য সঞ্জীবনীর গান না শুনলে আমিও এতটা বুঝতে পারতাম না।’
শুধু ‘বসু পরিবার’-ই নয়, নির্মল দে তাঁর পরের দুটি ছবিতেও নায়ক হিসেবে নিয়েছিলেন উত্তম কুমারকে। দুটিই উত্তমের অভিনয়জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩) ছবিতে প্রথম দেখা গেল উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে। পরে ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’ (১৯৫৪) ছবিতে গ্রাম্য যুবকের চরিত্রে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়টা করেন উত্তম। তারপরই মূলত উত্তম যুগের সূচনা, যা এখনও বাঙালি দর্শেকর মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে।


নেপালের বন্যার্তদের পাশে দেখা গেল সোনু সুদকে
