প্রতি বছর বিশ্বে ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ও দাবানলের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় অসংখ্য মানুষ। তবে এসবের বাইরে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে অনেক সময় বয়ে আনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। মানবসৃষ্ট এসব ভয়াবহ বিপর্যয়ে প্রাণ গেছে হাজার হাজার মানুষের। যার অসংখ্য উদাহরণও আছে ইতিহাসের পাতায়। তেমনই কয়েকটি মানবসৃষ্ট বিপর্যয় সম্পর্কে জানা যাক।
চেরনোবিল বিপর্যয়
১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ ইউক্রেনের চেরনোবিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি চুল্লিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে নিহত হয় অন্তত ৩১ জন এবং বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শক্তিশালী তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে। আর তাতে আক্রান্ত হয়ে পরবর্তীতে নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সবচেয়ে কাছের শহর প্রিপেটে পারমাণবিক বিকিরণের মাত্রা জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ স্তরে পৌছে যায়। কিন্তু ওই শহরের ৪০ হাজার মানুষকে তখন এসব জানানো হয় না। তারা শুধু জানতেন পারমাণবিক প্ল্যান্টে একটা অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এই শহরের বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হয় ৩৬ ঘণ্টা পরে। এর পরের এক সপ্তাহ ধরে পার্শ্ববর্তী শহর ও গ্রামগুলো থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় আরও ৩০ হাজার মানুষকে। তাদের মধ্যে কয়েকশ’ মানুষ মারা যান পরবর্তী তিন মাসের মধ্যেই।
বাতাসের প্রবাহের সঙ্গে তেজষ্ক্রিয় ধোঁয়া উত্তর ইউক্রেন এবং বেলারুশের দিকে চলে যায়। পরবর্তী মাসগুলোয় এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। প্রথমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চারদিকে দশ মাইল পর্যন্ত এলাকার মধ্যে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়। পর্যবেক্ষক দলের প্রধান কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সের্গেই মিরনেই চেরনোবিলে যান সে বছর জুলাই মাসে। পারমাণবিক চুল্লিটি থেকে তেজষ্ক্রিয় ধোঁয়া তখনও বাতাসে মিশছে। শুধু তাই নয়, তেজষ্ক্রিয় বস্তুকণা চুল্লিটির ভিত্তির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। এরপর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের মাটি খুড়ে তা তুলে গর্তে ফেলে আবার কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। যতটা আগে ভাবা গিয়েছিল দেখা যায় তেজষ্ক্রিয় দূষণ তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। মনিটরিং ইউনিটের প্রধান হিসেবে সের্গেই ৩০ কিলোমিটার এলাকার দূষণ সম্পর্কে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ ওই এলাকা ছেড়ে সবাইকে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। গ্রামবাসীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরই তাদের বাড়িঘর ভেঙে দিয়ে ইট–সুরকি পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। চেরনোবিলের চারদিকে ৩০ কিলোমিটর পর্যন্ত জায়গা এখনও নিষিদ্ধ এলাকা।
ভূপাল ট্র্যাজেডি
ভারতের ভূপালে ১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে মার্কিন মালিকানাধীন ইউনিয়ন কার্বাইড কীটনাশক কারখানার ভূর্গভস্থ মজুত ট্যাংক ফেটে গেলে সেখান থেকে বের হতে শুরু করে ৪০ টন পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস মিথাইল আইসোসায়ানেট। ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াই পি গোখেল জানিয়েছিলেন, অতিরিক্ত চাপের মুখে ট্যাংকের একটি ভাল্ব ভেঙে গেলে ভেতর থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। ৯ লক্ষাধিক বাসিন্দার ঘনবসতির শহর ভূপালের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ রাসয়নিক।
প্রায় ৫ লাখ মানুষ ওই গ্যাসের আওতায় পড়ে। প্রাণ হারায় কয়েক হাজার মানুষ। ভূপালের ইউনিয়ন কার্বাইড রাসায়নিকের প্ল্যান্টে ভয়াবহ বিষাক্ত গ্যাস লিক হওয়ার ঘটনায় প্রথম ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ৭২ ঘন্টায় ৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। এর পরের কয়েকমাসে আরও কয়েক হাজার প্রাণহানি হয়েছে। ভয়াবহ ফুসফুসের প্রদাহ থেকে শুরু করে আজীবন পঙ্গুত্বের মধ্যে রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ভারত সরকার দাবি করে, বিষাক্ত গ্যাসে মোট ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি।
এক্সন ভালদেজে তেল ছড়িয়ে পড়া
আমেরিকার আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম এবং এর আশপাশের অঞ্চলটি সামুদ্রিক মাছ, অগণিত প্রজাতির পাখি এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। এলাকাটি স্থানীয় জেলেদের আয়ের অন্যতম উৎস। তবে ১৯৮৯ সালের ২৪ মার্চের পর এখানকার জীবন-জীবিকা চিরতরে বদলে যায়। কারণ মানবসৃষ্ট এক ভয়ানক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে এলাকাটি। প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ডে এক্সন ভালদেজ তেলবাহী জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার সূত্রপাত হয় ২৪ মার্চ দুপুর ১২টা নাগাদ। এক্সন ভালদেজ আমেরিকান এক্সন শিপিং কোম্পানির মালিকানাধীন একটি সুপারট্যাঙ্কার লং বিচ শিপ। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ডের ব্লাইগ রিফকে আঘাত করে। ফলে তেলবাহী জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল ছড়িয়ে পড়ে। ৪১ মিলিয়ন লিটার বা ১১ মিলিয়ন গ্যালন তেল সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরে কয়েক দিনে ১০ দশমিক ৮ মিলিয়ন গ্যালন তেল ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে সমুদ্রের পানি বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হতে থাকে। হাজারো পাখি, শত শত সামুদ্রিক শিল এবং ঈগল এই বিপর্যয়ে মারা যায়।
হ্যালিফ্যাক্স জাহাজ বিস্ফোরণ
১৯১৭ সালের ডিসেম্বরের ৬ তারিখ, নোভা স্কটিয়ার হ্যালিফ্যাক্স বন্দরে বিপর্যয়ের ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল সেদিন। নরওয়েজিয়ান জাহাজ এস এস ইমো এবং ফরাসি বাষ্পচালিত জাহাজ এস এস মন্ট ব্লাঁর মধ্যকার সংঘর্ষের ফলে ইতিহাসের অন্যতম বড় এই অপারমাণবিক বিস্ফোরণটি ঘটে। যদিও এর আগে বিপদের আশঙ্কায় মাউন্ট ব্লাঁ জাহাজ থেকে হুঁশিয়ারি সংকেত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জাহাজ দুটি খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় সংঘর্ষ ঠেকানো যায়নি। মন্ট ব্লাঁ জাহাজটি ২ হাজার ৯৩৫ টন বিস্ফোরক বহন করছিল। সংঘর্ষের ফলে জাহাজে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়লে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠে বিশাল এক জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়ে তীরবর্তী বিস্তৃত অঞ্চলে আঘাত হানে। এতে হলিফ্যাক্সের সৈকত থেকে উত্তরে ৮০০ মিটার বিস্তৃত অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণে জাহাজ দুটি ধ্বংস হয়ে যায়। তীরবর্তী গাছপালা ভেঙে যায় এবং হ্যালিফ্যাক্স বন্দর ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়। সেদিন প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত এবং ৯ হাজার জন আহত হয়।
দ্য গ্রেট স্মগ
১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল যুক্তরাজ্যের লন্ডন। ভয়ংকর বায়ু দূষণের শিকার হয়ে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে মারা যায় হাজার হাজার মানুষ। দ্য গ্রেট স্মগ বা ভয়ংকর ধোঁয়াশা নামে পরিচিতি ওই বিপর্যয়। লন্ডনের আকাশে এমন অন্ধকার আর কখনও দেখা যায়নি। মনে হয়েছিল কেউ যেন ঘন কালো চাদরে ঢেকে দিয়েছিল পুরো নগরী। লন্ডন পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুকূপে। ব্রিটেনে তখন জ্বালানির প্রধান উৎস কয়লা। আর এই কয়লা পোড়ানো ধোঁয়ার সঙ্গে শীতের ঘন কুয়াশা মিশে সৃষ্টি হয়েছিল এমন পরিস্থির। দূষিত বায়ুতে ঢাকা পড়ে পুরো নগরী। স্মরণকালের ইতিহাসে এরকম ভয়ংকর স্মগ বা ধোঁয়াশা মানুষ আর দেখেনি।
ড. ব্রায়ান কমিন্স তখন একজন কেমিস্ট হিসেবে কাজ করেন। দেশটিতে বায়ু দূষণ গবেষণার অগ্রদূত বলে মনে করা হয় তাঁকে। তিনি জানান, লন্ডনে এই দূষণের কারণে অন্তত ১ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন যে ধরনের শিল্প দূষণ হতো, তার কারণে অনেক মানুষ ব্রংকাইটিস বা শ্বাসনালীর প্রদাহে ভুগছিল। তাছাড়া ধূমপান করাও একটা কারণ ছিল। আর এই অসুস্থ মানুষগুলোর জন্য এরকম দূষিত বাতাস ভয়ংকর হয়ে ওঠে। যাদের এ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট ছিল বা যারা হৃদরোগে আক্রান্ত, তারাও এর ফলে খুব কষ্ট পাচ্ছিল। শিশু আর বয়স্ক মানুষেরাও এই দূষণের কারণে ভুগছিল। যেসব মানুষ তখন অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছিল, তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছিল হার্ট ফেইলিওর বা একিউট ব্রংকাইটস। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানতেন, সে সময়ের লন্ডনের দূষিত বাতাসই আসলে এই মৃত্যুর কারণ। অন্তত ১০ হাজার মানুষ সেবছর এই ধোঁয়াশার কারণে মারা যায় বলে দাবি ব্রায়ান কমিন্সের।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, ব্রিটানিকা, ডিসকভার ম্যাগাজিন


