আটলান্টিক মহাসাগরে সবেমাত্র শুরু হয়েছে ঘূর্ণিঝড় বা হারিকেনের মরশুম। জুন থেকে নভেম্বর—এই ছয় মাস আমেরিকার উপকূল আর ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষের কাটে আতঙ্কে। কিন্তু এবারের সমীকরণটা একটু ভিন্ন। জাতিসংঘ এবং বিশ্বের আবহাওয়াবিদেরা একটি বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এ বছরই ধেয়ে আসছে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী আবহাওয়া পরিস্থিতি, যাকে বলা হচ্ছে 'সুপার এল নিনো'। আমেরিকার আবহাওয়া সংস্থা নোয়া বলছে, এবার আটলান্টিকে ঝড়ের দাপট সাধারণ সময়ের চেয়ে কম হতে পারে। কিন্তু কেন? এই এল নিনো আসলে কী? এটি কীভাবে দুনিয়ার এক প্রান্তের ঝড় থামিয়ে অন্য প্রান্তে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়? চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
এল নিনো কী?
আবহাওয়ার ভাষায় একে বলা হয় ‘এনসো’ বা এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন। এর তিনটি রূপের কথা জানা যায়।
স্বাভাবিক সময়ে কী হয়? প্রশান্ত মহাসাগরে ট্রেড উইন্ডস বা আয়ন বায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিমে, অর্থাৎ আমেরিকার উপকূল থেকে এশিয়ার দিকে বয়ে যায়। ফলে সাগরের সব গরম পানি এশিয়ার দিকে চলে আসে। আর আমেরিকার উপকূলে নিচ থেকে উঠে আসে ঠান্ডা পানি। কিন্তু এল নিনোর সময়ে এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। কখনো কখনো উল্টো দিকেও বইতে শুরু করে। ব্যস! এশিয়ার দিকে জমে থাকা বিশাল গরম পানির স্রোত ব্যাক গিয়ার মেরে আবার আমেরিকার দিকে ফিরে আসে। আর এতে প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।
যখন এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি বাড়ে, তখন তাকে আমরা এল নিনো বলি। কিন্তু তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়? তখনই জন্ম নেয় সুপার এল নিনো! বিজ্ঞানীরা সাগরের কয়েক শ মিটার গভীরে স্যাটেলাইট পাঠিয়ে দেখেছেন, এবার তাপমাত্রা কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি! যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের জলবায়ু বিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যাডাম স্কাইফ বলেছেন, "আমরা নিশ্চিত বিশাল কিছু হতে যাচ্ছে। এটি আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।"
ঝড়-তুফানের ওপর এল নিনোর প্রভাব
এবার আসা যাক আমাদের আসল প্রশ্নে—এল নিনো বিশ্বজুড়ে ট্রপিক্যাল স্টর্ম বা ঝড়গুলোকে কীভাবে বদলে দেবে? প্রথমেই দেখা যাক উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর।
এই অঞ্চলে এল নিনো একপ্রকার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এল নিনোর কারণে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর তীব্র বাতাস তৈরি হয়, যা নতুন কোনো ঘূর্ণিঝড় বা হারিকেন তৈরি হতে বাধা দেয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, এল নিনোর বছরে আটলান্টিকে হারিকেনের তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়। এই কারণেই মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা নোয়া ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, এবার আটলান্টিকে স্বাভাবিকের চেয়ে কম ঝড় হওয়ার সম্ভাবনা ৫৫ শতাংশ।
তবে নোয়ার পরিচালক কেন গ্রাহাম একটি জরুরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "এল নিনো ঝড় কমাতে পারে, কিন্তু মরশুমের মাত্র একটি শক্তিশালী ঝড়ই পুরো এলাকা ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।" মনে রাখবেন, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু আমেরিকাতেই হারিকেনে ৭ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। ক্যাটরিনা বা গত বছরের হেলেনের মতো ঝড়গুলোর ক্ষত এখনো শুকায়নি। তবে আটলান্টিকে ঝড় কমলেও প্রশান্ত মহাসাগরের চিত্রটা পুরো উল্টো। এল নিনোর কারণে আমেরিকার কাছাকাছি এবং হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে ঝড়ের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।
এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ওপর প্রভাব
এবার চলুন একটু অন্যদিকে যাই—অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে কী হবে? এল নিনোর সময়ে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ঝড়ের সংখ্যা কমে যায়। তবে ঝড়গুলো পুরোপুরি গায়েব হয় না। ঝড়ের কেন্দ্রগুলো একটু পূর্ব দিকে, অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ডেটলাইনের কাছাকাছি সরে যায়। একই ঘটনা ঘটে আমাদের এশিয়া মহাদেশে।
উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে টাইফুনের মোট সংখ্যা হয়তো একই থাকে, কিন্তু সেগুলো তৈরির জায়গা বদলে যায়। এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি টাইফুন কম তৈরি হয়ে, সেগুলো তৈরি হয় আরও পূর্ব দিকে, গভীর সাগরে। তবে এশিয়ার জন্য বড় ভয়ের কারণ অন্য জায়গায়। এল নিনো ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দেয়। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র খরা, তাপদাহ এবং দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে দেখা দেয় ভারী বৃষ্টি আর বন্যা।
আমরা কখনো বলছি হারিকেন, কখনো সাইক্লোন, আবার কখনো টাইফুন। এই তিনটির মধ্যে আসলে পার্থক্য কী? সহজ উত্তর, এদের মধ্যে শক্তির কোনো পার্থক্য নেই। সবগুলোরই বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় অন্তত ১১৯ কিলোমিটার। পার্থক্য শুধু এদের এলাকায়। যেমন: উত্তর আটলান্টিক এবং উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে, অর্থাৎ আমেরিকার দিকে হলে তা হারিকেন। আমাদের বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর বা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে হলে তা সাইক্লোন। আর উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে, অর্থাৎ জাপান বা ফিলিপাইনের দিকে হলে তা টাইফুন।
এদের নাম কীভাবে দেওয়া হয় জানেন? বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অঞ্চলের জন্য আলাদা নামের তালিকা তৈরি করে। যেমন আটলান্টিকের জন্য ৬টি তালিকা আছে, যা প্রতি ৬ বছর পর পর ঘুরেফিরে আসে। তবে ক্যাটরিনা, স্যান্ডি বা মারিয়ার মতো কোনো ঝড় যদি মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তবে সেই নামটিকে তালিকা থেকে চিরতরে অবসর দেওয়া হয়!
ভবিষ্যতের জন্য শঙ্কা
একটা বড় সত্য আমাদের জানতেই হবে। অতীতেও বহুবার এল নিনো এসেছে। কিন্তু এবারের এল নিনো কেন বিজ্ঞানীদের ঘুম নষ্ট করছে? কারণ, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের পৃথিবী এখন ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত অবস্থায় আছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, "এল নিনো পরিস্থিতি ফুটন্ত পৃথিবীর আগুনে আরও ঘি ঢালবে।" এল নিনোর কারণে সাময়িকভাবে তাপমাত্রা ০.২ ডিগ্রি বাড়লেও, বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা—আগামী ২০২৭ সাল হতে যাচ্ছে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গরম বছর। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আমাদের এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।



