সাধারণত প্রথম পরিচয়ে এ আপনার বোঝার কথা না। কারণ এ ধরনের মানুষ বর্ণচোরা। এদের ব্যক্তিত্বের বা পার্সোনালিটি ট্রেইট বুঝতে সময় লাগে। কিন্তু শরীরে বসন্ত রোগ হলে যেমন গোপন থাকে না, তেমনি চোখ, কান খোলা রাখলে এদের মিথ্যাবাদী চেহারাটা আপনার চোখের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। এরা নানাভাবে আপনার সঙ্গে গেম খেলবে। মনে রাখবেন, কেউ যখন আপনার সঙ্গে কোনো কারণে ভালো আচরণ করছেন। এই ভালো আচরণের পরিবর্তে তারা যদি আপনার কাছ থেকে বারবার প্রশংসা বাক্য তথা স্বীকৃতি চান, তবে তারা কমিউনাল নার্সিসিস্ট। কারণ তাদের নিজের ইগোর বেলুনের মতো ফুলে–ফেঁপে ওঠার জন্য অন্যের স্বীকৃতি প্রয়োজন। ফলে কাউকে যদি আপনি দেখেন, তিনি জনসমক্ষে ভালো মানুষের তকমা নিয়ে ঘুরছেন কিন্তু দরজার পেছনে অন্য একটি চেহারা, তবে তিনি অবশ্যই কমিউনাল নার্সিসিস্ট।
আমাদের মধ্যে দুটো আমি সত্তা থাকে, একটি বাইরের আমি যেটা খুব চৌকস, সুন্দর মুখোশ পড়ে থাকি, অন্যটি ভেতরে আমি। এই দুই আমির মধ্যে যত বেশি ফারাক, তত বেশি আমরা জনসমক্ষে নিজস্ব গোপনীয়তা বজায় রাখতে সচেষ্ট হই। সেই সঙ্গে পাছে লোকে কি কিছু বলে নিয়ে তটস্থ হই।
কেন একজন কমিউনাল নার্সিসিস্ট জীবনসঙ্গী বা সহকর্মী হিসেবে ক্ষতিকর?
কারণ এ ধরনের মানুষ তীব্র নেতিবাচকভাবে অন্যের উপরে প্রভাব বিস্তার করে। বাইরে থেকে মিষ্টি কথার আড়ালে অনেকটা সুগার কোটেড কুইনাইন ট্যাবলেটের মতন এরা কাজ করে। এদের প্রত্যেকটি কাজের উদ্দেশ্য থাকে আত্মপ্রশংসা এবং অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি। ফলে অন্যের আস্থা অর্জনের জন্য তারা যে কোনো কিছু করতে পারে। এর ফলে বৃহত্তর সামাজিক পরিমণ্ডলে তারা একজনের সঙ্গে অন্যজনের অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করে। যা প্রকৃতপক্ষে তাদের কাজের পরিবেশকে বিনষ্ট করে। যে একবার তাদের এই গোলকধাঁধায় পা দিয়েছেন, তিনি এই চক্করে ঘুরে মরবেন। বৃহত্তর সমাজে মানুষের দ্বন্দ্ব তৈরি করে তারা কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট করেন, সংগঠনে এ ধরনের মানুষ উপস্থিত থাকলে সেই সংগঠনের পতন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু মুশকিল টা হলো জীবনসঙ্গীর সামনে এই খেলাটা দীর্ঘদিন চলে না।
কেন একজন মানুষ কমিউনাল নার্সিসিস্ট হিসেবে গড়ে ওঠেন?
এক্ষেত্রে পুরোটাই তার ব্যক্তিত্বের সমস্যা বলা যায় না। এর সঙ্গে তাঁর শৈশবের বেড়ে ওঠার সম্পর্ক আছে। তাদের নিজেদের জীবনেও এই নার্সিসিজমের কারণে ভোগান্তি আছে। প্রাক শৈশবে তাদের অনেক মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণ হয়নি এবং সেগুলো অবচেতন মনে কীভাবে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ডালপালা বিস্তার করেছে, সেগুলো উদঘাটনের জন্য পেশাদার সাইকোথেরাপি প্রয়োজন। কিন্তু মুশকিল হল কমিউনাল নার্সিসিস্টরা প্রায়ই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে মাইন্ড গেম খেলেন। শৈশবের অ্যাবিউজ, পরিত্যক্ত অনুভব করা বা বিভিন্ন ধরনের মনোসামাজিক ক্ষত পরবর্তী জীবনে একজন মানুষকে কমিউনাল নার্সিসিস্ট হিসেবে তৈরি করতে পারে। কিন্তু মুশকিল হলো, এ ধরনের ব্যক্তি যার নিজের মধ্যে এরকমের সমস্যা আছে, সে সম্পর্কে তিনি সচেতন নন। তাই তিনি তার নার্সিসিস্টিক কার্যক্রম জারি রাখেন। এবং যিনি এই কথা তাকে বলতে আসেন, তিনি তার প্রতি বিরক্ত হয়ে যান।
ক্ষেত্রবিশেষে প্রকাশ্যে বা গোপনে তার বিরুদ্ধে ঘোট পাকান। এদের শুধরানোর সম্ভাবনা খুবই কম, অন্তত যতদিন তারা নিজে থেকে না বুঝছে ততদিন এদের পাল্টানোর সম্ভাবনা নেই। কাজেই এদের কাছে সততা আশা করে মনে কষ্ট পাওয়া বোকামির নামান্তর।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার
আরও পড়ুন:



