প্রতিদিন চাকরিজীবীদের একটি বিশাল সময় কাটে কর্মস্থলে। এটাই তাদের রুটি-রুজির জায়গা। কিন্তু কর্মস্থলে সবাই যে খুব ভালো বা কোয়ালিটি টাইম কাটাতে পারেন, তা নয়। তবুও চাকরিটা করে যেতেই হয়। কারণ, ওই চাকরির বেতনেই যে চলে জীবনের চাকা।
কোনো কোনো কর্মস্থলে কর্তৃপক্ষই কর্মীদের ভালো থাকার বা ভালো বোধ করার ব্যবস্থা করে দেয়। কোথাও আবার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ কম থাকে কিছুটা। তখন আসলে ব্যক্তিগত পর্যায়েই উদ্যোগী হতে হয়।
কর্মস্থলে ভালো থাকার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আপনি কী কী করতে পারেন, তা নিয়েই এবারের লেখা। এখানে মূলত কিছু পদক্ষেপ বা অভ্যাসের বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, যার মাধ্যমে আপনি কর্মস্থলে নিজেই নিজের যত্ন নিতে পারবেন। আর এসব কার্যক্রম যে সুফল দেয়, তা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত। ফলে সাফল্য পাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত।
আসুন, তবে জেনে নেওয়া যাক এমনই কিছু ছোট ছোট অভ্যাসের কথা।
১. নিজের খোঁজ নিন
শুনতে কি অদ্ভুত লাগছে? যত অবাকই হন না কেন, মনে রাখতে হবে– নিজের খোঁজ আসলে নিজেকেই রাখতে হয়। এ জন্য নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘আছ কেমন? ভালো আছো তো?’ আর এটা করতে হবে প্রতিটি দিনই। যাপিত জীবনে আমরা নিজের সঙ্গে কথা বলার ফুরসতই যেন পাই না। আর এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা নিজেরই হয়। এমন নয় যে, নিজেকে করা প্রশ্নের উত্তরেই সব সমাধান মিলবে। তবে নিজ সত্তার সঙ্গে আলোচনাটা অন্তত শুরু হবে। হবে সেলফ কাউন্সেলিংয়ের কাজটিও। এতে নিজের অবস্থা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে।
২০২১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘Emotional intelligence: predictor of employees’ wellbeing, quality of patient care, and psychological empowerment’ শীর্ষক একটি গবেষণা। তাতে দেখা গেছে, যেসব মানুষ আবেগীয় সচেতনতার বিষয়টি সব সময় অভ্যাসের মধ্যে রাখেন, তাঁরা মানসিকভাবে ভালো থাকেন তুলনামূলকভাবে। নিজের নেতিবাচক অনুভূতিগুলোর ব্যাপারে সচেতন থাকতে পারলে, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলানো সহজ হয়। আর কর্মস্থলের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও বেশি সুফলদায়ী।
২. প্রয়োজন নিয়মিত বিরতি
কর্মস্থলে কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত হারে বিরতি নেওয়া প্রয়োজন। এই বিরতিতে কাজের ভারে নুইয়ে পড়া নিজেকে আবার চনমনে করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিরতির সময়টা আপনি সঠিকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন কিনা, অফিসের কাজ থেকে নিজেকে আসলেই বিযুক্ত করতে পারছেন কিনা, সেটি নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। মনে রাখবেন, অফিসের কাজ বাদ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘোরাঘুরি বা খবরের কাগজ পড়া আদতে বিরতি নেওয়ার সুবিধা দেয় না।
এ ব্যাপারে বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট একটি বিশাল গবেষণা করেছে। তাতে দেখা গেছে, কর্মস্থলে প্রতি ৯০ থেকে ১২০ মিনিট পরপরই মানুষের বিরতির প্রয়োজন হয়। নইলে কাজের মান নেমে যায়। আর অফিসের বিভিন্ন মিটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে ৫ থেকে ১০ মিনিটের বিরতি কমিয়ে দেয় মানসিক চাপ। এতে করে মিটিংয়ের ফলও ভালো হয়। কর্মীদের মনযোগও বাড়ে। বাড়ে কাজ করার অনুপ্রেরণাও।
৩. চাপে পড়লে কী করবেন?
প্রথম কথা, কর্মস্থলে কাজের চাপ থাকবেই। সেই চাপকে সহজভাবে গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কতটুকু আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, আর কী কী নিয়ন্ত্রণে নেই– সেই হিসাবটি মনে মনে করে ফেলতে হবে। যতটা নিয়ন্ত্রণে আছে, ততটুকু নিয়েই আপনি চিন্তা করবেন, কর্মকৌশল সাজাবেন। অফিসের যেসব বিষয় আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, সেসব নিয়ে মাথা ঘামালে ক্ষতি ছাড়া লাভ কিছু নেই। এতে করে মানসিক চাপের তোড়ে আপনাকে নুয়ে পড়তে হবে। বরং যে কাজগুলো আপনি করতে পারেন সহজে, সেগুলোতেও লাগবে ঝামেলা।
তাই প্রথমে, বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে স্পষ্টভাবে। দ্বিতীয়ত, একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নির্ধারণ করতে হবে যে, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কম আয়াসে আপনি কীভাবে আরেকটু এগিয়ে যেতে পারেন। সেই ছোট ছোট এগোনোতেই কিন্তু হয়ে যাবে কেল্লা ফতে! মানসিক চাপও কমে আসবে ধীরে ধীরে।
৪. সহকর্মীদের সঙ্গে হৃদ্যতা বাড়ান
যারা চাকরি করেন, তাঁরা কর্মস্থলেই দিনের একটা বড় সময় কাটান। সে ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গেই কাটে একটা লম্বা সময়। তাই কাজের পাশাপাশি সহকর্মীদের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকাটা জরুরি। নইলে কর্মস্থলের কাজের চাপের পাশাপাশি একাকীত্বও আপনাকে গিলে খাবে। তখন কর্মস্থলে কাটানো সময়টুকু আপনার জন্য বিষাদময় হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে ২০১৫ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। এর শিরোনাম ছিল, ‘The Connection Prescription: Using the Power of Social Interactions and the Deep Desire for Connectedness to Empower Health and Wellness’। এই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উপযুক্ত সামাজিক সমর্থন ও আশপাশের মানুষের সঙ্গে সংযুক্তি যেকোনো ব্যক্তির মানসিক চাপ কমায় এবং প্রতিকূল পরিবেশ সামাল দিতে শক্তি জোগায়। এতে কমে উদ্বেগও। ফলে কর্মস্থলে আরও ভালোভাবে কাজ করা সম্ভব হয়।
৫. নেতিবাচকতাকে না
মানুষ হলে তার মাথায় ইতিবাচক ও নেতিবাচক– দুই মনোভাবই থাকবে। কিন্তু মানুষের মনে নেতিবাচকতা যেভাবে কুপ্রভাব ফেলে, তাতে কখনো কখনো পুরো কর্মপ্রক্রিয়াই থমকে যায়। তাই নিজের কাজের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধও থাকতে হবে। সব সময়ই যদি নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে থাকেন, তবে কাজে অগ্রগতি আসবে না। তাই নেতিবাচকতাকে মেনে নিয়েই ইতিবাচক বিষয়ের প্রতি মনযোগী হতে হবে। তবেই আসবে সাফল্য। আর মনটাও থাকবে ভালো।
৬. কাজ শেষ মানে শেষই
কর্মস্থল থেকে যখন বের হবেন, তখন অফিসকে মাথায় নিয়ে বাসায় ফেরা যাবে না। অফিসটা বরং অফিসেই থাক। অফিসকে যখন বাসাতেও টেনে আনবেন, তখন পারিবারিক ঝামেলার পাশাপাশি আপনার পেশাগত সমস্যাও পুরোপুরি মিটবে না। কারণ একজন মানুষ, সে যত যোগ্যই হোক না কেন, ২৪ ঘণ্টা শুধু কাজই করে যেতে পারে না। তাই অফিস থেকে বের হওয়ার পর থেকে একেবারেই কাজ থেকে বিযুক্ত হতে হবে। অবকাশ যাপন করতে হবে পুরোপুরি, নিতে হবে বিশ্রাম।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কাজ থেকে পুরোপুরি বিযুক্ত হতে বিভিন্ন শখের কাজ করা এবং বন্ধু ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটানো সবচেয়ে ভালো উপায়। এতে করে পরবর্তী কর্মদিবসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাও সহজ হয়ে উঠবে। নইলে সব সময় মনে হতে থাকবে যে, আপনি বোধহয় শুধু অফিসই করে যাচ্ছেন! তাতে আসলে অফিস বা আপনার– কারোরই লাভ হবে না মোটেও।
তথ্যসূত্র: রিসার্চগেট ডট নেট, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন, হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ, বিএমসি সাইকোলজি ও মাইক্রোসফট ডটকম



