খুদের মুখে বানানো গল্প, একটু বাড়িয়ে বলা কিংবা স্পষ্ট মিথ্যা, এমন অভিজ্ঞতা অনেক বাবা-মায়েরই পরিচিত। খেলতে খেলতে ভাঙা খেলনাকে ‘আমি ছুঁইনি’ বলা, পড়া না শিখেও ‘সব পারি’ দাবি, এগুলো শুনে রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট বয়সে মিথ্যা বলা সব সময় খারাপ অভ্যাসের লক্ষণ নয়। বরং অনেক সময় এটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেরই একটি ধাপ।
কেন ছোটরা মিথ্যা বলে
দুই থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের কল্পনাশক্তি খুব সক্রিয় থাকে। তারা বাস্তব আর কল্পনার পার্থক্য পুরোপুরি বোঝে না। অনেক সময় গল্প বানিয়ে বলার মধ্য দিয়েই তারা ভাষা ও ভাব প্রকাশের চর্চা করে। আবার ভয়, শাস্তি এড়ানোর চেষ্টা কিংবা বাবা-মায়ের মন জয়ের চেষ্টাও মিথ্যা বলার কারণ হতে পারে। তাই এই বয়সে মিথ্যা মানেই যে সন্তান নৈতিকভাবে ভুল পথে যাচ্ছে, তা ঠিক নয়।
বয়সের সঙ্গে নজরদারি জরুরি
বয়সের সাথে সাথে এই শিশুর এই মিথ্যা বা বানিয়ে কথা বলা প্রবণতা কমে আছে। তবে যদি উল্টো হয়, অর্থাৎ মিথ্যে বলার প্রবণতা কমার বদলে বাড়তে থাকে, তখন সতর্ক হওয়া দরকার। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে শিশু ধীরে ধীরে ঠিক, ভুলের ধারণা পেতে শুরু করে। এই সময় তারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য আড়াল করতে শেখে, তাহলে সেটি ভবিষ্যতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই লক্ষ্য রাখুন, মিথ্যাগুলো কি নিছক গল্প, নাকি নিজের ক্ষতি ঢাকার চেষ্টা?
মারধর নয়, কথায় বোঝান
মিথ্যা কথা শুনে রেগে গিয়ে বকা বা মারধর অনেকেই করেন। কিন্তু এতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। বরং ভয় পেয়ে শিশু আরও বেশি মিথ্যা বলতে শেখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্ত মাথায় কথা বলাই সবচেয়ে কার্যকর। শিশুকে বোঝান, মিথ্যা বললে বিশ্বাস নষ্ট হয়, বন্ধুত্বে সমস্যা হয়, বড়রাও আর ভরসা করতে পারে না। ভয় দেখানো নয়, বাস্তব ফলটা সহজ ভাষায় তুলে ধরুন।
সত্য বলার পরিবেশ তৈরি করুন
শিশু যেন সত্য বললে নিরাপদ বোধ করে, সে পরিবেশ তৈরি করা খুব জরুরি। কোনো ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠিন শাস্তি দিলে সে ভবিষ্যতে সত্য লুকাবে। বরং বলুন, ‘ভুল করলে বললে আমরা ঠিক করতে পারব।’ সত্য বলার জন্য প্রশংসা করুন। এতে শিশু বুঝবে, সত্য বলা মানেই বিপদ নয়।
প্রশ্রয় দেবেন না, আবার উপেক্ষাও নয়
খুব ছোটদের কিছু বানানো গল্প হালকাভাবে এড়িয়ে যেতেই পারেন। কিন্তু পাঁচ-ছয় বছর বয়সে মিথ্যা বলাকে একেবারে তুচ্ছ ভাবলে চলবে না। আবার অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে নাটক করাও ঠিক নয়। মাঝামাঝি অবস্থানটাই সঠিক। ভুলটা ধরিয়ে দিন, সীমা বুঝিয়ে দিন, প্রয়োজনে হালকা শাসন করুন।
নিজে উদাহরণ হন
শিশু সবচেয়ে বেশি শেখে বাবা-মাকে দেখে। আপনি নিজেই যদি ছোট ছোট বিষয়ে মিথ্যা বলেন, ফোনে ‘আমি বাইরে’ বলা, কারও কাছে সত্য গোপন করা, তাহলে শিশুও সেটাকেই স্বাভাবিক ভাববে। তাই সন্তানের কাছে সত্যবাদিতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে হবে আপনাকেই।
সব মিলিয়ে, খুদের মিথ্যা কথার ফুলঝুড়ি থামাতে ধৈর্যই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বকা বা ভয় নয়, বরং বোঝানো, বিশ্বাস আর ভালোবাসার মধ্য দিয়েই এই অভ্যাস ধীরে ধীরে বদলানো সম্ভব।



