‘অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ। কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না। যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাতো না।’ সুনীর গঙ্গোপাধ্যায় ‘পাহাড় চূড়ায়’ এই কবিতাটিতে যেন আমার মনের কথা যেন বলে দিয়েছে। দেশের ৬৪ জেলা ঘোরাঘুরি শেষ করে নিজেকে একজন পাহাড়প্রেমী পরিচয় দিতে একটু বেশি ভালো লাগে। কারণ পাহাড়ের নাম শুনলেই আমি হারিয়ে যায় অন্য জগতে। তাই এবারের গন্তব্য কেওক্রাডং, সেই সঙ্গে দেখা হবে বগালেক।
মারমা শব্দ কেওক্রাডং। কেও অর্থ ‘পাথর’, কাড়া বলতে বুঝায় ‘পাহাড়’ আর ডং মানে ‘সবচেয়ে উঁচু’। অর্থাৎ কেওক্রাডং বলতে বুঝায় ‘সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়’। সরকারি হিসেবে কেওক্রাডং দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এটি বান্দরবন জেলার রুমা উপজেলায় অবস্থিত।

অনেকদিনের ধরেই পরিকল্পনা পর অবশেষে এলো সুদিন। আর ঘোরার সঙ্গী হলো পাঁচজন। ঢাকার সায়দাবাদ থেকে রাত সাড়ে এগারোটার বাসে করে রওনা দিলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। বাস বান্দরবান পৌঁছে যায় পরের দিন ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে। নতুন এক শহর, নতুন এক সকাল। কিছু সময় তাই ঘোরাঘুরি করলাম শহরের এদিক-ওদিক। উপভোগ করতে থাকলাম চারপাশের পরিবেশ। সকাল সাড়ে সাতটার আগেই রুমা বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। তারপর ওখানের ছোট্ট ছোট্ট দোকানে সকালের নাস্তা শেষ করে ৮ টার বাসের টিকিট কেটে রওনা শুরু করলাম।
টানা তিনঘন্টা এমন একটি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন কোন এক শিল্পী তার মনের মাধুরি দিয়ে রাস্তাটা একেঁছেন। বাসের অধিকাংশ যাত্রী স্থানীয় আদিবাসি থাকায় জার্নিটা আরো আনন্দদায়ক মনে হচ্ছিলো। আঁকাবাঁকা পথে যখন বাস চলছিল, তখন মনেহচ্ছিলো যেন বাসটা আকাশের বুক চিড়ে একবার আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। পরক্ষণেই আবার জমিনের ঢুকে যাচ্ছিলো। জার্ণিটা ছিল রোলারকোস্টার রাইডের মতো।

রুমা পৌঁছানোর আগে পথিমধ্যেই সেনাবাহিনীর নিকট একবার হাজিরা দিতে হলো। তারপর সোজা রুমা বাজার। এখান থেকে চান্দের গাড়িতে করে যেতে হবে বগালেক। কিন্তু আমাদের আগে থেকে গাইড বা চান্দের গাড়ি কোনো কিছুই ঠিক করা ছিল না। তাই একজন গাইড নিলাম। তারপর আমরা পুলিশের নিকট প্রয়োজনীয় সকল ফর্মালিটিস শেষ করলাম। ওদিকে গাইড আমাদের জন্য একটা চান্দের গাড়ি ঠিক করে ফেললেন। সেই গাড়িতে করেই আমাদের এবারের গন্তব্য বগালেক। এটি দেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির একটি হ্রদ। দুপুর একটায় রওনা দিয়ে আনুমানিক সাড়ে দুইটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বগালেক।
বগালেক পৌঁছে সেনাবাহিনীর নিকট সকল ফর্মালিটিস সম্পন্ন করে হোটেলে চলে গেলাম। কারণ আজ আমরা বগালেকেই থাকব। জামা-কাপড় ছেড়ে বগালেকে গোছল করলাম। আহ্ কি সেই শান্তি! শরীরের প্রশান্তির চেয়েও মনের প্রশান্তিটাই বেশি ছিল তখন। গোসল শেষে এক হোটেলে পেট পূজা করলাম। কি যে স্বাদ সেই খাবারের, ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল। তারপর সারা বিকেল এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করলাম, ছবি তুললাম।
সন্ধ্যার পর বগালেকের পাড়ের গানের আড্ডাটা আজীবন মনে মাঝে গেঁথে থাকবে। তারপর রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব ভোরে উঠে পড়লাম বগালেকের সকালের সৌন্দর্য্য দেখার জন্য। বগালেকের সৌন্দর্যে আমি এখনও বিমোহিত। অতঃপর সকালের খাওয়া-দাওয়া এবং সেনাবাহিনীর নিকট সকল ফর্মালিটিস সম্পন্ন করে সকাল ৯ টার সময় স্বপ্নের কেওক্রাডংয়ের উদ্দেশ্য ট্রেকিং শুরু করলাম।

ট্রেকিং শুরু করার কিছুক্ষণ পরই পথে পড়ল চিংড়ি ঝর্ণা। কী বিশাল আর কী মায়াবী ঝর্না! সেখানে কিছুক্ষণ জিড়িয়ে নিলাম। কারণ চারদিক আসছিল আসছিল নির্মল বাতাস। রেস্ট শেষে আবার হাটাঁ শুরু করলাম। পথের মাঝখানে পড়ল পাহাড়ি লোকজনের দোকান, শতশত জুমঘর এবং নাম না জানা কতগুলো পাড়া। এভাবেই দীর্ঘ প্রায় ৪ ঘন্টা ট্রেকিংয়ের পর দুপুর ১ টার দিকে পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের কেওক্রাডং। গিয়েই সেনাবাহিনীর নিকট সকল ফর্মালিটিস পূরণ করে নিলাম। তারপর ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। গাইড পূর্ব থেকে আমাদের চাহিদামত খাবার ও হোটেল ঠিক করে রেখেছিল।
খাওয়া-দাওয়া শেষে কটেজে গিয়ে কিছুটা রেস্ট নিয়ে, বেড়িয়ে পড়লাম কেওক্রাডংয়ের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। সেই সৌন্দর্য্য আমার লেখনীতে প্রকাশ সম্ভব নয়। শুধুই মানসপটে একেঁ রেখেছি তাকে। বিকেলে কেওক্রাডংয়ের সামিট পয়েন্টে আড্ডা ও হেলিপ্যাডে গানের আসর এখনও চোখে ভাসে। এভাবেই সন্ধ্যা নেমে এলো চারদিকে।
সন্ধ্যার পর কেওক্রাডংয়ের মালিকের সাথে চা ও মুড়ি পার্টির আড্ডা দিলাম রাত ১০টা পর্যন্ত। অতঃপর কটেজে গিয়ে রাত প্রায় ১ টা পর্যন্ত আড্ডা দিলাম এবং মজা-মাস্তি করলাম। এরপর এক ঘুমে ভোর ৫টা। সবাই তখন উঠে সকালের সূর্যোদয় ও মেঘের আনাগোনা দেখলাম। এই সুন্দর ও বিমোহিত সকাল জীবনে বারবার আসেনা বললেই চলে। সকালের খাবার খেয়ে সকাল ৮ টার সময় এক আশ্চর্যজনক, বিস্ময়কর, অদ্ভুত, চমৎকার তৃপ্তি নিয়ে রওনা দিলাম যান্ত্রিকতার শহরে। আর এভাবেই শেষ হলো আমার স্বপ্নের কেওক্রাডং ভ্রমণ।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে করে বান্দরবান। বাসস্ট্যান্ড নেমে অটোতে করে রুমা বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে বাস বা চান্দের গাড়িতে যেতে হবে রুমা। তারপর চান্দের গাড়ি করে বগালেক। সেখান থেকে হেঁটে বা চান্দের গাড়ি করে কেওক্রাডং।


দেশের ৬৪ জেলা ঘুরেছেন আয়াতুল্লাহ, এবার লক্ষ্য বিশ্ব দেখা
