সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’। সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত এই আইনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে গুমের শিকার ব্যক্তির স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। তবে কয়েকটি ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে তাদের। বিশেষ করে, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত করাকে ‘স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনা করছে সংগঠনটি।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) এক বিবৃতিতে মায়ের ডাক বলে, ‘গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, সম্পত্তি ব্যবহার, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সমাধান এবং সাক্ষী সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই আইন একটি শক্তিশালী প্রতিকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় প্রকাশ করে। তবে আমরা মনে করি, আইনটির কার্যকারিতা মূলত একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—তদন্তব্যবস্থার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা।’
যোগ করে বলা হয়, বর্তমান খসড়া অনুযায়ী, ‘গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অথচ একই আইনে পুলিশকে সম্ভাব্য অভিযুক্ত বাহিনীগুলোর একটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে পুলিশকেই নিজের বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হবে; অন্য বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলেও তদন্ত একই আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি একজন সাধারণ তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষে সামরিক বা গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা ও বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।’
বলা হয়, ‘এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আইনে প্রদত্ত অধিকাংশ অধিকারও কার্যকর হবে না। কারণ গুমের শিকার ব্যক্তি হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ, সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সমাধান—সবকিছুই কার্যকর তদন্তের ওপর নির্ভরশীল। তদন্ত ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগী পরিবার এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।’
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনটির ২১নং ধারা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে মায়ের ডাক। প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ ছাড়া ২১ ধারায় মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের জন্য অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা অভিযোগ থেকে কর্মকর্তাদের সুরক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কোনো অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—সেই সিদ্ধান্ত যদি স্বাধীন তদন্তের পরিবর্তে সম্ভাব্য অভিযুক্ত বাহিনীগুলোর প্রতিষ্ঠানিক পরিসরের মধ্যেই পরিচালিত তদন্তের ওপর নির্ভর করে, তাহলে অনেক পরিবার অভিযোগ দাখিল করতেই ভয় পেতে পারে।’
মায়ের ডাক মনে করে, পুরো আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। আইনটির মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই ১৪ ধারা সংশোধনের মাধ্যমে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব এমন একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সক্ষম সংস্থার হাতে দেওয়া উচিত, যা সম্ভাব্য অভিযুক্ত কোনো বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সব বাহিনীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য ও সহযোগিতা আদায়ের কার্যকর আইনগত ক্ষমতা রাখে।
তদন্তব্যবস্থার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে সংগঠনটি। তাদের মতে, ‘স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে আইনে প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও অন্যান্য প্রতিকার বাস্তবে কার্যকর হবে; প্রকৃত অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হবে; নির্দোষ কর্মকর্তারাও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অযথা সন্দেহ থেকে সুরক্ষা পাবেন। একইসঙ্গে দেশ-বিদেশে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে যে, বাংলাদেশে আর কোনো বাহিনী নিজের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের তদন্ত নিজেই নিয়ন্ত্রণ করবে না।’
মায়েদের ডাক বিশ্বাস করে, এই সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের মাধ্যমে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ গুমের সংস্কৃতির অবসান, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
গত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত এই আইনে গুমের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।



