মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিলে ঘাটতি রয়ে গেছে: টিআইবি

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এ কয়েকটি ইতিবাচক সংশোধনের প্রস্তাব করা হলেও গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত তদন্তের ক্ষেত্রে মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতা না থাকাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সংস্থাটি। কার্যকর মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতার আলোকে বিল দুটি চূড়ান্তভাবে পাসের আগে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের অর্থবহ আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

বৃহস্পতিবার টিআইবির গণমাধ্যম যোগাযোগ পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলে আদিবাসী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতা, ঋণখেলাপি ব্যক্তিকে কমিশনার হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা এবং সামরিক ছাড়া অন্য আটককেন্দ্র পরিদর্শনে পূর্বানুমোদনের শর্ত বাদ দেওয়ার মতো কয়েকটি সুপারিশকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করছে টিআইবি।

তবে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না—এমন সুস্পষ্ট বিধান না রাখা, চাকরিরত সরকারি কর্মচারীকে প্রেষণ, লিয়েন বা অবৈতনিক ছুটিতে কমিশনার হওয়ার সুযোগ এবং বাছাই কমিটিতে স্পিকার, দুই মন্ত্রী, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখার ফলে নির্বাহী বিভাগ ও ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র প্রভাবের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারী প্রেষণে নিয়োগ এবং ব্যয় ও বরাদ্দ ব্যবহারে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বাধীনতার সুরক্ষা না থাকায় স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের প্রত্যাশা অধরাই থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ, কমিশন গঠন হলেও সেটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের কর্তৃত্ব কার্যত অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের হাতেই থেকে যাচ্ছে। জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিটের নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়া পরিদর্শনযোগ্য স্থানের তালিকা থেকে সামরিক আটককেন্দ্র বাদ দেওয়াও উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার পক্ষে আইনি সহায়তা, মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলের সঙ্গে আইনের সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং মানবাধিকার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজের মতো কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলিও প্রস্তাবিত বিলে সংকুচিত করা হয়েছে।’

অন্যদিকে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ধারা ৪-এর ভাষা পুনর্বিন্যাস ছাড়া স্বাধীন তদন্ত, জবাবদিহি বা ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটি কার্যত কোনো মৌলিক সংশোধনের সুপারিশ করেনি বলে দাবি করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, জবাবদিহির মূল কাঠামোর ক্ষেত্রে কমিটির সংশোধনী সুপারিশ অনেকটাই ‘কসমেটিক’।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের ধারা ১৯-এ শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন নিজে সরাসরি অনুসন্ধান ও তদন্ত না করে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইবে—এই মূল ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার সংকুচিত করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদননির্ভর করার ফলে এই বিধান ২০০৯ সালের আইনের তুলনায়ও দুর্বল এবং প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘একই ধরনের সংকট গুম প্রতিরোধ বিলেও রয়েছে। ধারা ১৪(৩)-এ অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত থেকে বিরত রাখা হলেও অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ অতীতে অধিকাংশ গুমের ঘটনায় বিভিন্ন শৃঙ্খলা, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।’

‘ফলে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানটি সেই একই প্রাতিষ্ঠানিক বলয় থেকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে দুর্বল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত শুধু ন্যায়বিচার ব্যাহত করবে না; এর ফলে ভুক্তভোগী গুমের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ এবং তার পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহার ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন,’ বলেন তিনি।

গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (আইসিপিপিইডি)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমের সংজ্ঞা আরও পূর্ণাঙ্গ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি কর্মচারী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও সংজ্ঞায় সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

তিনি বলেন, ‘ধারা ১৫-এ অধস্তন তদন্তকারীর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ বাস্তবে কতটা প্রভাবমুক্ত থাকবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এতে অভিযুক্তদের ঢালাও দায়মুক্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

এ ছাড়া ধারা ১৬-এ গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া বা তার পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা এবং পরিবারকে নিয়মিত অগ্রগতি জানানোর ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সুরক্ষা রাখা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

টিআইবি বলছে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় গুমসংক্রান্ত অপরাধের সাজাও কমানো হয়েছে। গুমের অপরাধের ন্যূনতম সাজা তিন বছর হলেও ‘মিথ্যা বা হয়রানিমূলক’ অভিযোগের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তদন্ত ব্যবস্থাই যখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে প্রকৃত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার দায় উল্টো অভিযোগকারী পরিবারের ওপর বর্তানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমন বিধান ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানানো ও ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের খসড়া প্রণয়ন পর্যায় থেকেই টিআইবির পর্যবেক্ষণ এবং মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে ২৫ দফা ও গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে ১৭ দফা সুপারিশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা ছিল বিল দুটির মৌলিক দুর্বলতা সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও অংশীজনদের তুলে ধরা মূল কৌশলগত উদ্বেগগুলো বহাল রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি, বিল দুটি তড়িঘড়ি কণ্ঠভোটে পাস না করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ধারা ও প্রস্তাবিত সংশোধনীর ওপর সংসদের সব সদস্যের অর্থবহ আলোচনা হবে। দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে।’

প্যারিস নীতিমালা, আইসিপিপিইডিসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, ভুক্তভোগীদের অধিকার এবং অংশীজনদের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রতিফলিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর বিল দুটি পাস না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ দেশে মানবাধিকার সুরক্ষায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার জন্য দায়ী থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিশোধ নয়, এখন প্রতিকারের সময় বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। আজ রোববার রাজধানীতে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ...
দুই কার্যদিবসের মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত নতুন আইন সংসদে উত্থাপন হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। রোববার সকালে ঝিনাইদহ শহরের কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে...
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশে সংঘটিত প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে গুম বা এনফোর্সড...
গুমের শিকার হয়েছেন এমন প্রতিটি ব্যক্তি বিচার পাবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, সরকার এমন আইন করছে যেখানে গুমের শিকার প্রতিটি ভিকটিম বিচার পাবে। আজ শনিবার...
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানত ফেরতের কার্যক্রম
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গেল দুই দিনে সাড়ে ৩৭ হাজারের বেশি গ্রাহক টাকা তোলার আবেদন করেছেন। এর বিপরীতে উত্তোলন করতে চাওয়া অর্থের পরিমান ২ হাজার ৩১৬ কোটি...
২০২২-২৩ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর ২০২২-২৩ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে ৪টি আপত্তি। এর মধ্যে দুটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম। এনজিও নিবন্ধন ও নবায়ন ফি থেকে উৎসে কর না কাটা এবং কম...
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস বিদেশে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে প্রথমবারের মতো সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। সংসদে দেওয়া বক্তব্যের এক...
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আর নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে সাধারণ মানুষের জীবন। গ্রাহকদের দ্বিগুণ বিদ্যুতের বিল হওয়ায় চুরি ও অনিয়মের অভিযোগ ভোক্তা অধিকার সংগঠন- ক্যাবের। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে নিজ...
লোডিং...

এলাকার খবর