‘পুকুর চুরি’ শব্দবন্ধটি বাংলা ভাষাতে বহুল প্রচলিত। পুকুর চুরি দিয়ে মূলত বড় ধরনের চুরি বা আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়টি বোঝানো হয়ে থাকে। এ বঙ্গে এমন ধরনের চুরিও হয়, যা অনেক সময় পুকুর চুরি দিয়েও সব সময় বোঝানো যায় না। তখন ‘সাগর চুরি’, ‘মহাসাগর চুরি’ প্রভৃতি শব্দবন্ধ তৈরি করতে হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, এ দেশে এক ফোঁটা শিশিরও এখন চুরি হয়ে যায়। আর তা কখনো কখনো সাধারণেরাই করে থাকেন। কীভাবে? চলুন, সেই আলোচনাতেই ঢোকা যাক।
কয়েকদিন আগের ঘটনা। এক জোড়া চপ্পল কিনতে ঢুকতে হয়েছিল একটি বহুজাতিক জুতার কোম্পানির শো-রুমে। সাইজ মেলানোর পর ফিক্সড প্রাইসের দোকানে এলো মূল্য চোকানোর পালা। আসল মূল্য ও তার ওপর ভ্যাট মিলিয়ে বিল হলো ৪৯৯ টাকা। ১ হাজার টাকার একটা নোট দেওয়া হলো সেলস পারসনের হাতে। তিনি এর বদলে পণ্য এবং পণ্য কেনার রসিদ হাতে ধরিয়ে দিলেন। এ বাদে ভাংতি টাকাও দিলেন, ৫০০ টাকা। আর কিছুই তিনি দিলেন না। অথচ সেলস পারসনের ফেরত দেওয়ার কথা ছিল ৫০১ টাকা। রশিদে তার উল্লেখও আছে। কিন্তু ১ টাকার নাম-গন্ধও তিনি উচ্চারণ করলেন না। ভাবটা এমন, ওই ১ টাকা তো দেওয়ারই কথা নয়!
নিজের অভিজ্ঞতার বাইরেও এমন ঘটনা অহরহ ঘটে এখন। আরও আগে থেকেই ঘটে আসছে। বিশেষ করে বিভিন্ন নামী কোম্পানির শো-রুম, রকমারি সুপারস্টোর বা অভিজাত এলাকার ফুড কোর্টে এ ধরনের তেলেসমাতি নিয়মিত ঘটনা। কখনো ১ টাকা ভাংতি থাকে না, কখনো থাকে না ২ বা ৫ টাকা। এবং তারপরই বেমালুম টাকা গুমের বিষয়টি ঘটে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও এ ধরনের ঘটনার অনেক উদাহরণ মেলে। মিলবে পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললেও। হয়তো ১, ২ বা ৫ টাকার বিষয় বলে অনেকেই এসব ঘটনা নিজেদের সঙ্গে ঘটলেও, কিছুটা এড়িয়ে যান। হাজার হোক, যারা নামী কোম্পানির শো-রুম, রকমারি সুপারস্টোর বা অভিজাত এলাকার ফুড কোর্টে যান, তারা আর্থিকভাবে সক্ষম তো বটেই। ফলে খুচরো টাকা মার যাওয়ার ঘটনা হয়তো কেউ কেউ চুপিসারে এক অর্থে মেনেই নেন। কিন্তু যারা ১ টাকাও মেরে দেন, তারা আসলে কেমন মানুষ?
এ দেশে দুর্নীতি হয়– এটি সর্বজনগ্রাহ্য একটি বিষয়। একসময় সারা পৃথিবীর মধ্যে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। তাও একবার নয়, একাধিকবার। দুর্নামে শীর্ষস্থানে বসে থাকার সেই দিন অবশ্য খাতা-কলমে এখন আর নেই। তবে দুর্নীতি নানা আকারে-প্রকারে এ দেশে রয়েই গেছে। একেবারে নির্মূল করাও কঠিন অবশ্য। এখন আমরা আলাপ করি মূলত পুকুর চুরি বা সাগর চুরি নিয়ে। এসবের খবরই আমরা আলোচনায় তুলে আনি। কিন্তু এর বাইরে কত কত চুরি যে নানান ফরম্যাটে এতদঞ্চলে চলছে, তার খবর আর কয়জন রাখে!
সমস্যা হলো, সেই সবের হিসাব কষতে বসলে পাগলপারা দশা হয়। বড় বড় চুরি-ডাকাতির খবরে নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিকে যথেচ্ছ গালিগালাজ করা যায়। তাতে মনের জ্বালাও জুড়ায়। কিন্তু চোর যখন চারপাশে, এবং সংখ্যায় অগণিত তখন দোষ কাকে দেবেন, আর কাকে দেবেন না?
বিভিন্ন নামী কোম্পানির শো-রুম, রকমারি সুপারস্টোর বা অভিজাত এলাকার ফুড কোর্টে উপরোল্লিখিত যে ভাংতি টাকা মেরে দেওয়া হয়, সেসব ঘটনার একটু বিশ্লেষণে যাওয়া যাক। ধরুন, জুতা কেনার পর যে ১ টাকাটা সেলস পারসন দিলেন না, সেটি কোথায় গেল? কোম্পানির খাতায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ কোম্পানির ডিজিটালি প্রিন্টেড রশিদই খদ্দেরদের দেওয়া হয় বেশির ভাগ সময়। ফলে কোম্পানি ওই টাকার হিসাবই রাখে না, নেওয়া দূরের কথা। দিনের সব বেচা-কেনার হিসাব করে মোট টাকাই কোম্পানিকে বুঝিয়ে দেওয়াটা স্বাভাবিক। এর বেশি দেওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, বাড়তি টাকা মূলত কোম্পানির সেলস পারসনদের কাছেই থাকছে। যা কোনোভাবেই নিয়মের মধ্যে পড়ে না।
এই একই তরিকায় কয়েক বছর আগে থেকে পাড়ার মুদি দোকানিরাও আমাদের ১/২ টাকার ভাংতি দেওয়ার বদলে কয়েক পয়সার লজেন্স হাতে ধরিয়ে দেওয়া শুরু করেছেন। এসবের মূল উদ্দেশ্য আসলে মানুষকে ঠকিয়ে কিছু বাড়তি লাভ করা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, এ আর কত টাকা? হ্যাঁ, টাকার হিসাবে হয়তো দিনে ৫০০ বা ১ হাজারই হবে। এবং এই খুচরো ১/২ টাকাই জমতে জমতে দিন-সপ্তাহ-মাস-বছরে কোটি কোটি টাকায় পরিণত হয়। কিন্তু প্রশ্নটা উঠছে, এটা অধিকার, না দাবি। কোনোটাই আসলে না। এটা একেবারেই টাকা মারার ফন্দি। সেজন্য মূল আপত্তিটা আদতে নীতির জায়গায়। আমরা যখন ছোট ছোট দুর্নীতিও আটকাতে পারব না, তখন বড় বড় দুর্নীতির করেও রাঘব বোয়ালেরাও দায়মুক্তি পেয়ে যায় সহজেই। তাদের কথা, এই সমাজের কে দুর্নীতি করে না? কে ঠকায় না? আর আমরা করলেই দোষ?’
এভাবেই এ দেশের সব চোর-ডাকাতেরাই দিন শেষে দায়মুক্তি পায়। কারণ ছোটরা বড়কে দেখিয়ে বলে, হাজার কোটির কাছে ১/২ টাকা আর এমন কী? আবার ছোটদের দেখিয়ে বড়রা বলে, সুযোগ পেলে সবাই করে! দুই পক্ষের মধ্যে চলে তখন ‘হয়ে ওঠা’র হম্বিতম্বি দেখানোর প্রতিযোগিতা, যার মূল বক্তব্যই হলো– ‘আগে তুমি সৎ হয়ে দেখাও!’
দিন শেষে আমাদের কারোরই তাই আর পূর্ণ সৎ হওয়া হয় না। এ দেশে ১ টাকা থেকে হাজার কোটি টাকা সবই মেরে দেওয়া যায় অবলীলায়। সে কারণেই এ বঙ্গে হয়ত গৌরী সেনদের জন্ম হয়। দয়া করে গৌরী সেনদের চিনতে কোনো ধরনের শ্রমক্ষয় করতে যাবেন না। আয়নায় মুখ দেখলেই চলবে!
অর্ণব সান্যাল: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



