ভারতে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস যে ধরাশায়ী হয়েছে, এ নিয়ে কেউ দ্বিমত করবেন বলে মনে হয় না। মিজোরামের মতো উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্যকে বাদ দিলে বাকি চার রাজ্যে বিজেপি ৩-১ কংগ্রেস। এরপর দিনই এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একজন কংগ্রেস সমর্থক লিখেছেন, এত দিন পরে তেলেঙ্গানায় কংগ্রেস জিতল অথচ দলের সভাপতি মলিকার্জুন খাড়গে বা রাহুল গান্ধী বা অন্য কোনো নেতা রাজ্যবাসীকে অভিনন্দন জানানোর সৌজন্যটুকুও দেখালেন না। তিনি আরও লিখেছেন, কর্ণাটকে বিজেপির বিপুল পরাজয়ের দিনে উত্তর প্রদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে খুব ভালো ফল করেছিল বিজেপি। এজন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু শীর্ষ পর্যায়ের দলীয় নেতারা তাঁদের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অভিনন্দন জানাতে ভোলেননি। এটাই হলো বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে পার্থক্য।
কংগ্রেসের ওই সমর্থক নিশ্চয় গভীর দুঃখবোধ থেকে সামাজিক মাধ্যমে এই কথাটা লিখেছেন। তাঁর কথার মধ্যে এক বিন্দুও ভুল নেই। এখন দেখুন, হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যে (মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়) জয় পাওয়ার পর কীভাবে বিজেপির শীর্ষ পর্যায় থেকে উদ্যাপন করা হচ্ছে। ফল প্রকাশের দিন (৩ ডিসেম্বর) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং দিল্লিতে দলীয় কার্যালয়ে এসে ‘হ্যাটট্রিক’ জয়ের জন্য সবাইকে বাধাই (অভিনন্দন) জানানোর পাশাপাশি তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি ২০২৪-এ হ্যাটট্রিক করতে চলেছে বলে জানিয়ে গেছেন। অর্থাৎ ২০২৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনে জিতে বিজেপি আবার ক্ষমতায় আসতে চলেছে এবং নরেন্দ্র মোদি হবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দেবেন। যেমনটা কিনা শচীন তেন্ডুলকারের নিজের মাঠে তাঁর ৪৯ তম সেঞ্চুরির (ওয়ান ডে ক্রিকেটে) রেকর্ড ভেঙে দিলেন বিরাট কোহলি।
বিজেপির এই হ্যাটট্রিক দাবি এখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষ থেকে বিশেষজ্ঞ ও বর্ষীয়ান সাংবাদিকেরা পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করছেন যে, ২০২৪-এ নরেন্দ্র মোদিকে সরানো কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া জোটের কম্ম নয়। এই আপত বিশ্বাসযোগ্য তীব্র প্রচারের দাপটে একটু উল্টো দিকে আলো ফেলেছেন সাবেক ভোট বিশ্লেষক বা সেফোলজিস্ট যোগেন্দ্র যাদব। তিনি এক ভিডিও বার্তায় মধ্যপ্রদেশ রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও তেলেঙ্গানা রাজ্যের ভোটের ফলাফলকে ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে রাজনীতির চাদর গায়ে চড়ালেও ভোটের ফলকে নানাভাবে দেখার অভ্যাস এখনো তিনি ত্যাগ করতে পারেননি।
যোগেন্দ্র প্রথমে ভোটের পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিয়েছেন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেছেন, রাজস্থানে বিজেপি ৪১.৭% ও কংগ্রেস ৩৯.৬% ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ মাত্র দুই শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে বিজেপি ওই রাজ্যে বাজিমাত করে বেরিয়ে গেছে। এই রাজ্যে সিপিআইএম ও বিএপির (ভারতীয় আদিবাসী পার্টি) ভোট কংগ্রেস তার সাথে যুক্ত করতে পারলে বিজেপি নিচে চলে যায়। কংগ্রেসের ব্যর্থতা এই জায়গায়।
একইভাবে ছত্তিশগড়ে বিজেপি ৪৬.৩% ও কংগ্রেস ৪২.২%; মধ্যপ্রদেশে বিজেপি ৪৮.৬% ও কংগ্রেস ৪০% এবং তেলেঙ্গানায় বিজেপি ১৩.৯%, আইআরএস ৩৭.৪% ও কংগ্রেস ৩৯.৪% ভোট পেয়েছে। এই চার রাজ্যের মধ্যে বিজেপি তিনটিতে জিতেছে ঠিকই। কিন্তু চার রাজ্যে বিজেপি মোট ভোট পেয়েছে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬৩। আর কংগ্রেস পেয়েছে ৪ কোটি ৯০ লাখ ৭৭ হাজার ৯০৭। যারা বিজেপির জয়ে আনন্দে ডুগডুগি বাজাচ্ছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন তিন রাজ্যে হেরেও কংগ্রেস বিজেপির চেয়ে সাড়ে নয় লাখ ভোট বেশি পেয়েছে। গণতন্ত্রের রূঢ় বাস্তবতা এটাই যে, অনেক সময় বেশি ভোট পেয়েও হারতে হয়।
যোগেন্দ্র বলছেন, নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির সবাই যেভাবে ২০২৪-এ হ্যাটট্রিক হ্যাটট্রিক বলে আগেই বাজিমাত করতে চাইছেন সাইকোলিজক্যাল ওয়্যারফেয়ার বা মনোবৈজ্ঞানিক লড়াই হিসেবে তা খারাপ না। কিন্তু তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন ২০০৩ সালে হিন্দিভাষী তিন রাজ্যে (মধ্যপ্রদেশ রাজস্থান, ছত্তিশগড়) বিজেপি জিতেছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের লোকসভায় জেতে কংগ্রেস। ঠিক একইভাবে ২০১৮ সালে এই তিন রাজ্যে জয়ী হয় কংগ্রেস, কিন্তু ২০১৯-এর ফল সবাই জানে। বিপুল আসনে জিতে একক গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপিকে প্রথমবারের মতো দিল্লির মসনদে আসীন করেন নরেন্দ্র মোদি।
এর আরও একটি দিক হলো, এই চার রাজ্যে লোকসভার আসন সংখ্যা ৮২। ২০১৯-এ মোদি ঝড়ের সময় বিজেপি ও তার সাথীরা ৮২টি আসনের মধ্যে পেয়েছিল ৬৫টি। আর কংগ্রেসের জুটেছিল মাত্র ৬টি। ২০২৩-এর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চার রাজ্যে প্রাপ্ত ভোট যদি কংগ্রেস ধরে রাখতে পারে তাহলে বিজেপি পাবে ৪৬টি এবং কংগ্রেস পেতে পারে ২৮টি আসন। আসলে হ্যাটট্রিকের প্রচারের তোড়ে ভোটের এই দিকগুলো একেবারেই হারিয়ে গেছে। আর জনস্মৃতি এতই দুর্বল যে সেখানে কোনো কিছু একবার ঠেসে ঢুকিয়ে দিতে পারলে আর কথাই নেই।
অ-হিন্দিভাষী দক্ষিণ ভারতে বিজেপি যে কোথাও সুবিধা করে উঠতে পারেনি এখনো এটা বাস্তব। তবে চেষ্টার খামতি নেই মোদি সরকারের। কিন্তু হিন্দিভাষী অঞ্চলে এখনো নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদি একচ্ছত্র। তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো নেতা কংগ্রেস বা অন্য কোনো বিজেপি-বিরোধী দলে নেই। এটা মাথায় রাখার পরেও বিজেপি জানে ২০২৪-এ ফের ভারতে ক্ষমতায় যেতে হলে তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও আসাম। এখানে আধিপত্য ধরে রাখতেই হবে। এই ছয় রাজ্যে বিজেপি ও আরএসএসের সংগঠন বিরাট শক্তিশালী। বিজেপির জয়ের পেছনে নরেন্দ্র মোদির যেমন ভূমিকা আছে, ঠিক ততটাই ভূমিকা আছে সংগঠন হিসেবে আরএসএসের। এই ছয় রাজ্যে লোকসভার আসন সংখ্যা ১৮৫। গত ২০১৯-এর নির্বাচনে এর মধ্যে ১৬২টি অর্থাৎ ৮৭.৫% আসনে জিতেছে বিজেপি। ফলে এটা ধরে রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এর বাইরে ইন্ডিয়া জোটের নজরে থাকা রাজ্যগুলো হলো বিহার, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু ও ঝাড়খণ্ড। এই আট রাজ্যে মোট আসন সংখ্যা ২৪৭। ২০১৯-এ বিজেপি পেয়েছিল ৯৯টি আসন। এই আট রাজ্যের মধ্যে সাতটিতে ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলো ক্ষমতায়। একমাত্র মহারাষ্ট্রে শিবসেনার ভেঙে যাওয়া অংশের সাথে মিলে বিজেপি সরকার তৈরি করে ক্ষমতায় আছে। সেখানে এনসিপি, কংগ্রেস ও শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) জোট বেশ শক্তিশালী। ফলে ইন্ডিয়া জোট একত্রে লড়লে ভালো করার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।
এর বাইরে অন্ধ্রপ্রদেশ (২৫) ও ওডিশায় (২১) লোকসভার ৪৬টি আসন আছে। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জগনমোহন রেড্ডি। তাঁর বাবা প্রয়াত ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি ওই রাজ্যের কংগ্রেসের একজন শীর্ষ নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বাবার অকাল মৃত্যুর পর জগনমোহন বাবার জায়গা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধী পরিবার সে উদারতা দেখাতে পারেনি। ফলে বাবার নামের সাথে মিল রেখে দলের নামকরণ (ওয়াইএসআর কংগ্রেস) করে জগনমোহন শুধু রাজ্যে ক্ষমতায়ই যাননি, কংগ্রেসকে মুছে দিয়েছেন রাজ্য থেকে। কংগ্রেস অতীতের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে জগনমোহনকে ইন্ডিয়া জোটে ডাকতে পারে। আন্তরিকতা থাকলে জগনমোহন সাড়া দেবেন না, এটা ভাবা ঠিক না। কারণ অতীত ভুলে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস, শারদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) তো কংগ্রেসের সাথে ইন্ডিয়া জোটে গেছে। ১৯৯০ থেকে এ পর্যন্ত কংগ্রেস দল ৩৯ বার ভেঙেছে। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিও কিন্তু কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সুভাষবাদী কংগ্রেস নামে নতুন দল করেছিলেন। আর এই এত ভাঙার পেছনে একটা বড় কারণ অবশ্যই কংগ্রেসের লাটাই হাতে রাখা গান্ধী পরিবার ও তাদের বন্ধু-স্তবকেরা।
ওডিশার বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়েক একজন প্রগতিশীল মানুষ ও নেতা বলে পরিচিত। ২০০০ সাল থেকে টানা ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রী। পাল্টে দিয়েছেন ভারতের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া রাজ্যের খোলনলচে। এখন কেউ তাঁর রাজ্যের মানুষকে কেউ ‘উড়ে’ বলে ডেকে নাক সিঁটকাতে পারে না। তিনি আছেন রাজ্য নিয়ে। রাজ্যের উন্নয়নে যে সাহায্য করবে, তার সাথে যেতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। আর ইন্ডিয়া জোটে কংগ্রেস বাদে অধিকাংশ দলই তো আঞ্চলিক দল হিসেবে পরিচিত। ফলে আন্তরিকতা থাকলে নবীনকে নিয়ে সমস্যা হওয়ার কথা না। বরং বিজেপির একক ক্ষমতা দখলের বিরোধী ভারতের অধিকাংশ আঞ্চলিক দল।
দিল্লি (৭) ও পাঞ্জাবে (১৩) আম আদমি পার্টি ক্ষমতায়। তারা ইন্ডিয়া জোটে আছে। কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টি যদি ঠিক মতো জোট গড়তে পারে তাহলে এই দুই রাজ্যে ২০টির মধ্যে একটি আসনও অন্যদের পাওয়ার কথা না। ফলে সাধারণ গণিতের হিসাব বলছে, ৩১৩টি আসনে ইন্ডিয়া জোটের ভালো করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
এই ভালো করার সম্ভাবনা তখনই থাকবে যখন কংগ্রেস দল হিসেবে মনে রাখবে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ১৯২টি আসনে কংগ্রেস ও বিজেপি সরাসরি লড়েছিল। এতে কংগ্রেসের ঝুলিতে পড়েছিল মাত্র ১৬টি আসন। গত নভেম্বরে চার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মিত্র দলগুলোকে পাত্তা না দেওয়ার প্রবণতা প্রবলভাবে ছিল কংগ্রস নেতৃত্বের ভেতরে। সেই পথ থেকে সরে এসে ইন্ডিয়া জোটের মিত্রদের সাথে অন্তর থেকে মিত্রতা করলে কে বলতে পারে ২০২৪-এ ২০০৪ বা ২০১৯-এর পুনরাবৃত্তি হবে না?
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


ভারত: ভোটের ফল থেকে কংগ্রেস কি কোনো শিক্ষা নেবে
