আজ সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণের মাধ্যমে শুরু হলো ২০২৪ সালের নির্বাচন পরিক্রমা। আর শুরুটা হলো বাংলাদেশকে দিয়েই। এ বছরে অন্তত ৫৭টি দেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নির্বাচন হবে। এই তালিকায় আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, পাকিস্তানসহ আরও অনেক দেশ আছে। এর বাইরে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অন্যতম প্রধান বড় দল বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বয়কট করেছে। সাথে আছে আন্তর্জাতিক, বিশেষ করে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নজরদারি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে – এমন একটা প্রচার জোরেশোরে চলছে। চলছে বিএনপি ও অন্যান্য দলের ডাকে নির্বাচন বর্জন ও হরতাল। ফলে সুষ্ঠুভাবে ভোট শেষ করাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশনের জন্য।
সিইসি কাজী হাবিবুল আওয়াল কিন্তু গতকাল (৬ জানুয়ারি, ২০২৪) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে কমিশনের ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচন ‘কাঙ্ক্ষিত অংশগ্রহণমূলক’ হচ্ছে না। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে। তাঁর জন্য এ কথা বলাই যৌক্তিক। কারণ নিবন্ধিত ১৬টি দল না আসলেও, বাকি ২৮টি দল তো এসেছে। সুতরাং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তিনি এর চেয়ে আর বেশি কিছু বলতে পারতেন না। তবে কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে ভোট সুষ্ঠু করার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন। ভোট শুরুর দু ঘণ্টার মধ্যে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে নরসিংদীর একটি কেন্দ্রে ভোট বাতিল করে কমিশন কিন্তু সে কথা রেখেছে।
সিইসির বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য না থাকা। এটাই বাস্তব। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দাবি জনসমক্ষে আনলেও কোনো ধরনের আলোচনায় বসেনি। দেশটা যদি রাজনীতিবিদেরা চালান, গণতন্ত্রে সেটাই দস্তুর তাহলে তাঁদের নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসতেই হবে। সেটা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে যেভাবেই হোক। এমনকি কারও মধ্যস্থতায়ও হতে পারে। আর এ নিয়ে যে মল্লযুদ্ধ আমরা শুরু করেছি, তাতে একজনকে কুপোকাত করা সম্ভব, কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলতে পারে না। এ বিষয়ে আলোচনার টেবিলে চায়ের সাথে টা নিয়ে যুক্তির লড়াইয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। এখানে জয়-পরাজয় বলে কিছু নেই, যা থাকবে সেটা মতৈক্য। কোনো বিষয়ে মতৈক্য না থাকার দুরারোগ্য ব্যাধি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সারাতে পারেনি। যেটা কখনোই কাঙ্ক্ষিত না।
অনেক সংবাদমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞ এই ভোটকে গ্রহণযোগ্য ধরার মাপকাঠি মনে করছেন ভোটারের উপস্থিতিকে। নিশ্চয় সেটা একটা মাপকাঠি। নির্বাচন কমিশন বা শাসক দলের পক্ষ থেকে ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে সাধারণ ভোটাররা কতটা আশ্বস্ত হবেন বলা কঠিন। কারণ ভোটের আগে যে সহিংসতা বা নাশকতা তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাতে নিজেদের নিরাপদ না ভাবলে তাদের দোষ দেওয়া যাবে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে যে খবর, তাতে ভোটার সংখ্যা বাড়ছে। তাহলে কী ৫০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পড়লে তা গ্রহণযোগ্য হবে, আর না পড়লে হবে না?
একটু দেখা যাক অন্য দেশের নির্বাচনে ভোট পড়ার হার কেমন হয়। হিসাব বলছে, আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রমুখো হন না। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত বা নেপালেও একই অবস্থা। সেখানে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ ভোটের পরেও এই অবস্থা। ভোটারদের এই কম উপস্থিতি কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারও একটা বড় দুর্বলতা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বা আপনার হাতের স্মার্টফোনের মাধ্যমে আপনি বিশ্বজয় করে ফেলতে পারেন, অথচ ভোট দিতে গেলে আপনাকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ দেখিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। এতে অনেকে উৎসাহী না-ও হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশে। সম্প্রতি আমেরিকায় এক জরিপে তরুণদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা রাজনীতি-বিমুখ কেন? তাদের সোজাসাপ্টা জবাব, রাজনীতিবিদরা আমাদের নিয়ে ভাবেন না; আমরাও তাদের নিয়ে ভাবি না।
কী বলবেন আপনি? এই ভুবনগ্রামে আপনার সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ সন্তান যদি তার মার্কিন বন্ধুর মতো একই মনোভাব পোষণ করে তাহলে আপনার জবাব কী হবে? ফলে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে ভোটের সংখ্যা আসলে কত হবে, এ নিয়ে কোনো পরিমাপক এখনো ঠিক হয়নি। গণতন্ত্রের আরেকটি সমস্যা হলো, অতিরিক্ত কম ভোট যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি খুব বেশি ভোট পড়াটাও সন্দেহজনক। এই দুইয়ের দোলাচলে সঠিক প্রয়োগ বিন্দুটা কোথায় হবে, তা হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলতে পারেন।
আজ বাংলাদেশকে দিয়ে নির্বাচনের যে খাতা খুললো, তাতে কিন্তু বছরভর নানা তথ্য-উপাত্ত লেখা হতে থাকবে। আর এই লেখার মধ্যে দিয়ে ঠিক হবে আপনার-আমার-বিশ্বের ভবিষ্যৎ। সেই লেখায় আছে হাজারো অনিশ্চয়তা। জরিপে জনপ্রিয়তার নিরিখে এগিয়ে থাকা ট্রাম্প কী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন? জেলনস্কির কী হবে? তাঁকে কী পশ্চিমা বন্ধুরা আবার গদিতে ফিরিয়ে আনবে? নরেন্দ্র মোদি কি টানা তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন? নির্বাচনের পরে তাইওয়ানকে কী একইভাবে টিকতে দেবে চীন? প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই। এজন্য অপেক্ষার পালা থাকবে বছরজুড়ে। আর এর সবকটির ওপর নির্ভর করবে আমাদের ভালো থাকা-মন্দ থাকা। বাংলাদেশ সেখানে সিন্ধুতে বিন্দুসম।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



