ঘুড়ি বাতাসের বিপক্ষেই ওড়ে, পক্ষে নয়—রাজনীতিতে বিরোধী দল সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এ কথা বলেছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন এস চার্চিল। চার্চিল একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক শুধু নন, সুবক্তা ও জনপ্রিয় লেখক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই চরম দুঃসময়ে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভায় তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসানো হয়েছিল ‘গ্রেট ব্রিটেন’–কে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য, রক্ষার জন্য। সে প্রয়াস বিফলে যায়নি। ফলে তাঁর কথা ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার জো নেই।
আরেকটি বিষয়, ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কী ছিল? কে সরকার গড়তে চলেছে? বা কারা মন্ত্রী হতে চলেছেন? না, এ বিষয়গুলো নিয়ে আগ্রহের কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু বিরোধী দল কারা হবে, কে হচ্ছেন বিরোধী দলীয় নেতা—এ নিয়ে আলোচনার কমতি ছিল না। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই নির্বাচনে ৬২টি আসন পাওয়ায় প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। কারণ ‘গৃহপালিত’ হওয়ার দায়ে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টি মাত্র ১১টি আসন পেয়ে নিজ যোগ্যতায় বিরোধী দল হওয়ার অধিকার হারায়।
আর জাতীয় পার্টিকে নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই ভালো। ২০১৪ সাল থেকে প্রয়াত এইচ এম এরশাদ বা তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ যেভাবে বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকা পালন করেছেন, তাতে আর যাই থাক ‘বিরোধী দল’ শব্দবন্ধটির অস্তিত্ব নেই। সরকারি ভাষ্যের এমন সুন্দর উপস্থাপনা দেখলে চার্চিলও হয়তো তাঁর বক্তব্য পাল্টে ফেলতেন। এবার সেই দায়িত্ব পালন করছেন এরশাদ সাহেবের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের। দেখা যাক, তিনি কত দূর পর্যন্ত যেতে পারেন। সংসদের বাইরে তিনি যে ধরনের সরকার-বিরোধী জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন, তার প্রয়োগ যথোপযুক্ত জায়গায় হয় কিনা, তা দেখার জন্য দেশবাসী নিশ্চয় অপেক্ষায় থাকবে।
ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলীয় নেতার গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁকে ছায়া মন্ত্রিসভার (শ্যাডো ক্যাবিনেট) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি বিরোধী দলীয় নেতাকে অবহিত করেন। এমনকি দেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পার্লামেন্টে বা জনসমক্ষে আনার আগে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিরোধী দলীয় নেতার সাথে আলাপ করার রেওয়াজও আছে। দেশের জন্য বিরোধী দলকে আস্থায় নেওয়াটা সরকার পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অবিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। আর এর লিখিত-পঠিত কোনো নিয়মও কেউ বানিয়ে রাখেনি। এটা প্রথা। এর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে গণতান্ত্রিক কাঠামো। এমনকি রাষ্ট্রপতি-কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায়ও একই প্রথা লক্ষ্য করা যায়। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সব সময় কংগ্রেসের স্পিকারের সাথে কথা বলেন। স্পিকার বিরোধী দলের হলেও। এটা করা হয় জাতীয় স্বার্থে, যাতে সব দল একমত থাকে।
ওপরের বর্ণনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, বিরোধী দল হওয়া মানে অন্ধ সরকার বিরোধিতা না। অনেক দেশেই নির্বাচনের পরে একাধিক দলের, এমনকি সর্বদলীয় সরকার গঠনের নজির রয়েছে। বর্ণবাদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৯৪ সাল থেকে বহুদিন দক্ষিণ আফ্রিকায় সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থা চলেছে। এমন বাঁক নেওয়ার সময় এই ব্যবস্থার কোনো বিকল্প ছিল না। দেশটির সৌভাগ্য এই যে, বিরলপ্রজ নেতা হিসেবে নেলসন ম্যান্ডেলা এই কাজটি করতে পেরেছিলেন। ক্ষুদ্রতা ও সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এই অবস্থানে নিজেকে নিয়ে যাওয়াটা খুব একটা সহজ না। আজ বিশ্বের অনেক দেশে এমন সরকার দরকার। কিন্তু সর্বত্রই একজন নেলসন ম্যান্ডেলার বড় অভাব।
থাক সে কথা। ফিরে আসি সংসদীয় ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থায় অন্ধ সরকার বিরোধিতাও যেমন প্রকৃত বিরোধী দলের জন্য কাম্য নয়, তেমনি বোবা-কালার ভূমিকায়ও তাদের দেখতে চায় না দেশের মানুষ। বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে কাঠগড়ায় তুলবে, সংসদে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে—এটাই তাদের কাজ। মানুষ তাদের কাছে ভিন্নমত, যৌক্তিক পরামর্শ, কঠোর সমালোচনা শুনতে আগ্রহী।
গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর যে সংসদ গঠিত হয়েছে, সেখানে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি অনুপস্থিত। নেই নির্বাচন বয়কটে শামিল হওয়া আরও কিছু দল। ফলে একটা শূন্যস্থান যে তৈরি হয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। বলা হচ্ছে, এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। যদিও তাঁদের ৫৯ জনই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদমর্যাদার নেতা। শুধু তিনজন আওয়ামী লীগের বাইরে। সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন আসন্ন। ৫০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীতরা পাচ্ছেন ৪৮টি, বাকি দুটি বিরোধী দল জাতীয় পার্টির।
অর্থাৎ, ৩৫০ আসনের সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ১৩ জন, স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ নন) ৩ জন সদস্য আছেন। তাহলে এই সংসদে স্বতন্ত্র, নারী ও নৌকা প্রতীক মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক দাঁড়ায় ৩৩৪। এই সংখ্যার মারপ্যাঁচই দ্বাদশ জাতীয় সংসদকে প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য বাধা হতে পারে।
এই বাধা কাটিয়ে তোলার দায়িত্ব আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের। ইতিমধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। স্বতন্ত্রদের মধ্যে ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন, মুজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী), এ কে আজাদ প্রমুখ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। মুখ খুলেছেন জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক (চুন্নু)। তাঁদের বক্তব্যকে সরকার বা সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা কীভাবে দেখেন, তার ওপর নির্ভর করছে এই সংসদ সদস্যদের আগামী পাঁচ বছরের সক্রিয়তা। এই সংসদে আওয়ামী লীগের হারানোর কিছু নেই। বরং কিছু যুক্ত করার বা অর্জনের সুযোগ আছে। সেই সুযোগটা কি তারা নেবে?
দেশে আর কিছুদিন পর বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক নৌকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে নির্দলীয় চরিত্র পাওয়ার সুযোগ যেমন আছে, তেমনি বহুমুখী প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর আগে বিএনপি ও আরও কিছু দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিয়েছিল দলটি। এতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের যোগ্যতা ভোটের কষ্ঠিপাথরে যাচাই হওয়ার সুযোগ মিলেছে। আর এর ফলই হলো ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ।
এখন এই ব্যবস্থা জাতীয় সংসদের জন্যও করবে কিনা আওয়ামী লীগ, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সংসদ সদস্যরা ভোট ব্যতিরেকে যদি যেকোনো বিষয়ে খোলামেলা বক্তব্য বা মতামত রাখতে পারেন, তাহলে সংখ্যাধিক্যের দাপট ঢাকা পড়ে একটা প্রাণবন্ত জাতীয় সংসদ তৈরি হওয়ার সুযোগ হতে পারে। পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব, তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



