মাঠজুড়ে সবুজ থেকে সোনালি রঙে রূপ নেওয়া ধান এখন কৃষকের ঘামে ভেজা স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেসে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার স্রোতে–ধান উঠবে, কিন্তু তার ন্যায্য দাম মিলবে তো? সরকার ঘোষিত নতুন সংগ্রহমূল্যেও কৃষকের মুখে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না, বরং কৃষকের মনে ভর করছে শঙ্কার মেঘ।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ২৪ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান, চাল ও গম সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে। যদিও, সরকারি সংগ্রহ বাড়েনি, বরং কমেছে লক্ষ্যমাত্রা। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধারাবাহিকভাবে কমানো হচ্ছে, বিপরীতে চাল সংগ্রহে স্থিতিশীলতা রক্ষা করা হচ্ছে। ২০২৩ অর্থবছরে যেখানে সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ টন, সেখানে ২০২৪ অর্থবছরে তা প্রায় অর্ধেকে কমিয়ে আনা হয়েছে–মাত্র ৩.৫ লাখ টনে। অপরদিকে, একই সময়কালে সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা স্থির রয়েছে–১৪ লাখ টন। ধানের মূল্য প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৬ টাকা করা হলেও, চালের মূল্য কেজিতে ৪৫ টাকা থেকে ৪৯ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলোই প্রমাণ করে, সরকার সরাসরি কৃষকের ধান না কিনে চালকল মালিকদের প্রক্রিয়াজাত চাল কিনতেই বেশি আগ্রহী। এর ফলে কৃষককে বাধ্য হয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে, যারা কমদামে ধান কিনে সরকারের কাছে বেশি দামে চাল বিক্রি করে। কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, অথচ মিলারদের মুনাফার পথ প্রসারিত হচ্ছে।
এভাবে রাষ্ট্রীয় খাদ্য সংগ্রহ নীতির ভারসাম্যহীনতা কৃষকদের দুর্দশা বাড়িয়ে তুলছে এবং কৃষিকে আরও অনুৎসাহিত করছে। ধান উৎপাদক কৃষকের ঘামে ভেজা শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে, এই ধারাবাহিক অবহেলা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকেও এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশে বোরো মৌসুমে প্রায় ৩ কোটি টন ধান উৎপাদিত হয়। সেখানে মাত্র ৩.৫ লাখ টন ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে, অর্থাৎ মোট উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম! প্রশ্ন হলো, এই সামান্য সংগ্রহ দিয়ে কীভাবে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে?
সরকার যখন সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান না কিনে মিলারদের কাছ থেকে চাল কিনতে বেশি আগ্রহী হয়, তখন বাস্তবে লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগী মিল মালিকেরা। তারা বাজারে সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে ফেলে, কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে পরে সরকারের কাছে বেশি দামে চাল বিক্রি করে। এতে কৃষক ঠকেন দুইভাবে–একদিকে তিনি বাজারে ন্যায্য দাম পান না, অন্যদিকে সরকারি সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।
স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশে এখন স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা চালু হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। কিন্তু এই উচ্চ প্রযুক্তির বিপরীতে কৃষিখাতের মৌলিক অবকাঠামো আজও রয়ে গেছে আশংকাজনকভাবে পিছিয়ে। যেখানে কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতির উন্নয়ন প্রয়োজন ছিল দীর্ঘদিন ধরেই, সেখানে তা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। খাদ্যগুদাম মজুদ সক্ষমতা ২১ লাখ টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; নতুন গুদাম নির্মাণ বা সংরক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। কোল্ড স্টোরেজের অভাব, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতির অভাব এবং সেচের জন্য বিদ্যুৎ কিংবা পানি সহজলভ্য করার মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ঘাটতি সবসময় চোখে পড়ে। ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হলে বড় পরিসরে সংগ্রহ প্রয়োজন, যার জন্য আধুনিক ও বড় গুদাম অপরিহার্য। কিন্তু কৃষিখাতের এই মৌলিক সমস্যাগুলোর বিষয়ে আগে সরকারের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও উদাসীন মনে হচ্ছে, তেমনি গণমাধ্যম ও মূলধারার আলোচনাতেও এসব নিয়ে তেমন কিছু নেই।
বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ এখনো কৃষি খাতে যুক্ত, অথচ জাতীয় বাজেটে কৃষির জন্য বরাদ্দ মাত্র ৩ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ। আড়াই কোটিরও বেশি কৃষক প্রতিদিন এই দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘাম ঝরাচ্ছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য, বরং প্রতিনিয়ত ঠকছেন বাজারে এবং বঞ্চিত হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় নীতির সুবিধা থেকে। একদিকে তাদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে খাদ্য সরবরাহের জাতীয় দায়িত্ব, অন্যদিকে সরকার নিজেই ধান না কিনে মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহে গুরুত্ব দিচ্ছে–ফলে কৃষক পড়ে যাচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। উৎপাদন খরচ বেড়ে চলেছে, কিন্তু ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে নেই কার্যকর পদক্ষেপ। কৃষকের এই দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়ন ও উপেক্ষা কেবল তার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়–এটি সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য।
এই মুহূর্তে দরকার একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কৃষকবান্ধব সংগ্রহনীতি। কৃষককে প্রান্তিক করে, মধ্যস্বত্বভোগীদের শক্তিশালী করে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নয়, বরং অসাম্যবাদী বাংলাদেশ গড়ে উঠছে।
লেখক: প্রোগ্রাম ম্যানেজার, এএলআরডি
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



