কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর প্রায় ১১ বছর পর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরা। আজ সেই একুশে ফেব্রুয়ারি। লেখাটির শিরোনামের মধ্যে এক ধরনের আশাবাদ ও শঙ্কা ধ্বনিত হচ্ছে, যা হয়তো কেউ কেউ শুনতে পাচ্ছেন। কিন্তু করার কী, এটা জানা নেই। আমাদের একটাই গর্ব, একটাই আনন্দ, একটাই সুখবোধ যে, সালাম-বরকত-রফিক-জব্বরের আত্মদান বৃথা যায়নি। তাঁদের সবার আত্মদানে, আত্মত্যাগে শুধু বাংলা ভাষাই মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়নি, বিশ্বের সকল মাতৃভাষা আজ স্বমহিমায় ভাস্বর।
যে পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাঙালির এই অবদান, হয়তো অন্যসব অবদানকে ছাপিয়ে গেছে। মানুষের মুখের ভাষা রক্ষার লড়াইয়ের স্বীকৃতি গোটা বিশ্ব বাঙালিকে দিয়েছে। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে’ আর পারবে না। যদি আমরা নিজেরাই তা ছেড়ে না দিই।
প্রথমে রবীন্দ্রনাথের কথা বলেছিলাম। কারণ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘… সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে বাংলার যত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ থাক তবু বাংলার স্বাতন্ত্র্য যে সংস্কৃত ব্যাকরণের তলায় চাপা পড়বার নয়, আমি জানি এ মতটি শাস্ত্রী মহাশয়ের। এ কথা শুনতে যত সহজ আসলে তা নয়। ভাষায় বাইরের দিক থেকে চোখে পড়ে শব্দের উপাদান।’ বাংলা যে শুধু সংস্কৃত ভাষার চাপে পড়েছিল, তা তো নয়। ১৯৪৭–পরবর্তী সময়ে এ দেশে উর্দু হরফে বাংলা লেখাসহ নানা অপচেষ্টা কম হয়নি। এমনকি বাংলা শব্দের ব্যবহারে সম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ঢুকিয়ে একে ধর্মীয় আবরণে ঢাকার অন্যায় চেষ্টাও হয়েছে। যা আজ অপসৃত—এমন দাবি বোধকরি কেউ করবেন না। জল-পানির বিভেদ বাঙালি আর কতকাল লালন করবে বলা কঠিন। এর চেয়ে ভাষার প্রতি যদি একটু ভালোবাসা, মমত্ববোধ দেখাতে পারতাম, তাহলে ভাষা শহীদদের প্রতি তা হতো আমাদের সেরা তর্পণ।
সব প্রাণীর মতো ভাষাও বোধহয় নির্দিষ্ট জন্মকাল নিয়ে জন্মায়। না হলে প্রতি দু সপ্তাহে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাবে কেন? ইউনেসকোর হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ছয় হাজারের বেশি ভাষায় কথা বলি আমরা। এর অর্ধেকই আজ বিপন্ন। গত এক শ বছরে হারিয়ে গেছে দু শর বেশি ভাষা। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকার ভাষা নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এথনোলগের ২০২৪ সালের হিসাব বলছে, বিশ্বে এই মুহূর্তে সক্রিয় ভাষার সংখ্যা ৭,১৬৪টি। এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি ভাষা বিপন্ন বা হারিয়ে যাওয়ার পথে। যে পৃথিবী ভবিষ্যতে বসবাসের জন্য মঙ্গল, বুধ বা শুক্র গ্রহের কথা চিন্তা করছে, যারা অমরত্বের সন্ধানে ব্যস্ত—তারা এখানকার বাসিন্দাদের মুখের ভাষা কেন রক্ষা করতে পারে না? তাহলে গলদটা কোথায়?
আসলে একটি ভাষা কখন হারিয়ে গেছে বলা যায়? যদি ওই ভাষায় কথা বলা শেষ লোকটি মারা যায়। অথবা কোনো ভাষিক গোষ্ঠী স্বেচ্ছায় নিজ ভাষা ছেড়ে অন্য ভাষাকে গ্রহণ করে। এটা গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির ব্যাপারেও হতে পারে। জিনগতভাবে মানুষ অভিযোজী ও পরিযায়ী জীব। সে বিশ্বনাগরিক। গত ৭০ হাজার বছরের ইতিহাস বলছে, সে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিত্য ছুটে চলেছে। ফলে নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে তাকে প্রথম যে কাজটি করতে হয়, তা হচ্ছে সেখানকার ভাষা শেখা। প্রতিদিনকার প্রয়োজনের কারণেই তার এতদিনের মাতৃভাষা, ব্যবহারের অভাবে ভুলতে বসাটা খুবই স্বাভাবিক। আর পরের প্রজন্মের তো কথাই নেই। তাদের কাছে স্থানীয় ভাষাই মাতৃভাষা হয়ে যায়। আমাদের দেশ থেকে যাঁরা অভিবাসী হয়েছেন, তাঁদের এ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
প্রশ্ন হলো—কোনো দেশের নিজ ভাষা তার মর্যাদা বা কৌলীন্য হারায় কেন? কারণ, ভাষা তার অর্থকরী দিক হারিয়ে ফেলে। এই অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শাসকের ভাষা হিসেবে ‘জাতে উঠতে’ ইংরেজি ভাষাটা রপ্ত করার চেষ্টা আমাদের সমাজে বহুকাল ধরে চলেছে। আজও চলছে। কেউ কেউ ফরাসি বা স্প্যানিশ শিখেছেন নিজের চেষ্টায়। কিন্তু লক্ষ্য করেছেন, বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে আরবি ও ম্যান্ডারিন (চীনা ভাষা) শেখার উৎসাহ বেড়েছে। কারণ আর কিছুই না, এই ভাষা যেসব দেশে চলে, তাদের আর্থিক সক্ষমতা।
মানুষ যেসব ভাষায় কথা বলে, তাদের মধ্যে সংখ্যাধিক্যে এগিয়ে আছে ইংরেজি (১৫০ কোটি), ম্যান্ডারিন (১১০ কোটি), হিন্দি (৬১ কোটি), স্প্যানিশ (৪৯ কোটি), ফরাসি (৩০ কোটি), আরবি (২৭ কোটি) ও বাংলা (২৭ কোটি)। এটা এথনোলগের হিসাব। কিন্তু কোনো ভাষায় বেশিসংখ্যক লোক কথা বললেই সেই ভাষা শক্তিশালী—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আরবি ভাষা বিশ্বের ৩০টি দেশের সরকারি ভাষা। এর মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আর আমিরাতসহ একাধিক দেশ আর্থিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। এ কারণে ব্রিটিশদের ভবিষ্যৎ ভাষা শিক্ষার আগ্রহের তালিকায় চার নম্বরে আছে আরবি। ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপই এ কথা বলছে। দুই নম্বর অবস্থানে আছে ম্যান্ডারিন। এটা এমনি এমনি না। গত তিন দশকে চীন ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তিসহ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে যে, পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ ভাগ্যান্বেষীরা এই ভাষা শিখতে আগ্রহী হবে—এটাই স্বাভাবিক।
এই দুটি ভাষার পাশে যদি বাংলাকে রাখি, তাহলে চিত্রটা বড়ই বিবর্ণ ও পীড়াদায়ক। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে বাঙালিরা। আছে বাঙালি প্রবাসীরা। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বাঙালিদের কাছে বাংলা ভাষাটা দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষায় পরিণত হয়েছে। কারণ, কঠিন বাস্তবতা। বাংলাদেশেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইংরেজির কাছে অপমানিত হচ্ছে বাংলা। আর পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি ও ইংরেজির দাপটে বাংলা এতটাই কোণঠাসা যে, কলকাতা শহরে বাংলা মিডিয়ামের অনেক নামি স্কুলে শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়াই দায় হয়ে উঠেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো প্রত্যন্ত গ্রামে গজিয়ে উঠছে ইংরেজি মাধ্যমের ‘কিন্ডারগার্টেন’। আমাদের মফস্বল শহরগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর জন্য অনেকে ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও ঢাকায় থাকছেন। কেউ কেউ তাঁর কাছেপিঠের শহরে। এদের সবার লক্ষ্য একটাই।
১৯৫২ সালের পর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা পালন করে আসছি। সেই সময়ের চেয়ে এখন জাঁকজমক অনেক বেড়েছে। দিনটি স্মরণের চেয়ে রূপ নিয়েছে উৎসবে। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের ব্যাপকতা ধীরে ধীরে বেড়েছে। ১৯৯০-এর দশকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ আরও অনেকের উদ্যোগে কলকাতায় খুব ছোট পরিসরে একুশে পালিত হতো। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান, এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগেও একুশকে স্মরণ করা হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, ভাষা হিসেবে বাংলা যত বিপন্ন হচ্ছে, বাঙালি তত একুশকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এ-ও বড় শুভ লক্ষণ। বাঙালি যদি তার এই অস্মিতাটুকু ত্যাগ করে, তাহলে সে বাঁচবে কী নিয়ে?
‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে/ ভাগ হয়নিকো নজরুল’—বহু বিভক্তির বাঙালিকে ভাষাটা এখনো কাছে টেনে রেখেছে। রাখবেও। যে ভাষায় বিশ্বের ২৭ কোটি মানুষ কথা বলে, তা সহজে হারিয়ে যাওয়ার নয়। আর বাংলার কৃষক-শ্রমিক-জেলে-কুমোর-কামার-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত যত দিন থাকবে, ততদিন বাংলা থাকবে। বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারির সুর ভেসে বেড়াবে বাংলার বাতাসে। কিন্তু যে শক্তি নিয়ে এই ভাষার বেঁচে থাকার কথা ছিল বা সামর্থ্য আছে, সেটা আমরা কীভাবে কাজে লাগাব?
চীনারা, জাপানিরা হাজার চেষ্টা করেও দেশের মানুষকে ইংরেজি শেখাতে পারেনি। আমরাও পারব না। আমরা যেটা পারি, তা হলো বাংলাকে ‘উন্নত মম শির’ করে রাখতে। সে জন্য সবার আগে আমাদের কূপমণ্ডূকতা ত্যাগ করে বিশ্বনাগরিক হতে হবে। একুশের বিশ্বায়ন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



