বেইলি রোডের আগুন: মৃত্যুপুরির দিকে চলমান সিঁড়ি

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:৪০ পিএম

সিঁড়ি তো শুধু উঁচুতে উঠতেই সহায়তা করে না। নামতেও লাগে। সিঁড়ি হলো উভমুখী বিক্রিয়ার সেই মধ্যবর্তী চিহ্নের মতো, দুদিকেই যার অবাধ যাতায়াত। পৃথিবী এক ভারসাম্যের নাম। এই সিঁড়ি দিয়ে কেউ যদি ওপরে ওঠে, তো আরেকটা দিয়ে নেমে যেতে হয় তরতর করে। কিন্তু কতটা? একেবারে মৃত্যুপুরিতে?

রাজধানীর বেইলি রোডে তো তা-ই হলো গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে। পুরো বিভীষিকার সারমর্ম হয়ে জ্বলজ্বল করছে সেই সিঁড়িটি। গ্রিন কোজি কটেজ নামের সেই ভবনের সিঁড়িটিই যেন চোখের সামনে পুরো রাষ্ট্র ও এর মানুষের প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে।

পুরাণমতে, লোক তিনটি– স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল। এর মধ্যে মর্ত্যবাসী তো আমরা, মানে যারা জ্যান্ত। আর স্বর্গবাসী? হ্যাঁ এই মর্ত্যে থেকেও কেউ কেউ স্বর্গের স্বাদ পায় বা পেতে চায়। সে মূলত ঊর্ধ্বলোকে থাকে। আর পাতাল? পাতাল তো এক ঘুটঘুটে অন্ধকার জগৎ, যেখানে মৃতদের থাকাটাই নিয়ম। তবে জীবন্মৃতরাও থাকতে পারে অনায়াসে।

এ জগৎ সিঁড়িময়। মর্ত্যবাসী বরাবরই সিঁড়ি খোঁজে। কিন্তু বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বর্গের সিঁড়িটি খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ ভুল করে, কেউ-বা কপাল দোষেই পাতালের সিঁড়িটি ধরে ফেলে। ফলে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি বা আরও আগের এফআর টাওয়ার বা তারও আগের চুড়িহাট্টা কিংবা সেই বিএম ডিপো সবখানে এমন অগণিতকে পাওয়া যায়, যাদের তরতর করে বাধ্য হয়েই পাতালে নামতে হয়, স্বর্গের সিঁড়িতে জায়গা করে নেওয়াদের দায়শোধ করতে।

বেইলি রোডে গতকাল যে ভবনে আগুন লাগল, সেখানেও ছিল এমন এক সিঁড়ি। বিত্তের বিনিময়ে মর্ত্যেই স্বর্গবাসের আকাঙ্ক্ষায় যে সিঁড়িকে তার নির্মাতারা যথেষ্ট সরু করতে পেরেছিলেন। যে সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি দুজনের বেশি ওঠানামা করাটা কঠিন। শুধু তাই নয়, বিত্তের আকাঙ্ক্ষা যে বড় তীব্র ও তার টান যে অলঙ্ঘনীয়, তার প্রমাণ রাখতে সেই সিঁড়িতেই তারা সারে সারে রেখেছিলেন গ্যাস সিলিন্ডার।

এটা হয়তো তাদের কৃপাও। কারণ, সিঁড়িতে গ্যাস সিলিন্ডারের উপস্থিতি না থাকলে এত সহজে ৪৬ জন মরতো কীভাবে! কেমন করে হতো তাদের পাতালপ্রবেশ? এসব সিলিন্ডার না থাকলে ফায়ার সার্ভিস হয়তো দ্রুতই ঢুকে পড়তে পারত ভবনটিতে। গ্রিন কোজিকে আগুনে পুড়ে ধূসর হতে হতো না।

ফলে সকল ব্যবস্থা একেবারে পাকা হয়েই ছিল। পুরো প্রক্রিয়াকে একেবারে নির্ভুল করতে বহুতল ভবনটিতে রাখা হয়নি কোনো অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থাও। রাখা হয়নি কোনো জরুরি বহির্গমন পথ। ফলে সেই সিঁড়িই একমাত্র ভাগ্যলিখন হয়ে সামনে ছিল, যা লোভ ও অতল চাহিদার চাপে ছিল যথাযথভাবে সরু, সাথে নিয়ে সারে সারে গ্যাস সিলিন্ডার। যেন তারা পাহারাদার সেই দৃশ্যের, যা লিপ ইয়ারের আনন্দে অগ্নিতিলক পরিয়ে দেবে সযত্নে, যা পরে হয়ে উঠবে এক স্মরণীয় মৃত্যুদৃশ্য।

স্মরণীয়? কিন্তু এই লিপ ইয়ারে যারা মৃত্যুপুরিতে প্রবেশ করলেন, তাদের স্মরণ কি একটু কঠিন হবে না? সেই দুই সন্তানসহ মরে যাওয়া মা, সেই দুই বুয়েট শিক্ষার্থী, সেই শিক্ষক ও তাঁর মেয়ে–এমন কত কত ব্যক্তি, জোড়, সংঘের মানুষেরা গতকাল গিয়েছিলেন গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়, যেখানে চলছিল লিপ ইয়ারের বিশেষ অফার। এই দেশের মানুষ তো ভুলোমনাও বটে। এক মৃত্যুদৃশ্য দারুণ দক্ষতায় ঢেকে দিতে থাকে আরেক অনায়াস মৃত্যুদৃশ্যকে। ফলে বর্ষপূর্তিতেই মুখগুলো ঝাপসা হয়ে যায়। এ তো লিপইয়ারের দিন, যা ফিরবে চার বছর পর। আমাদের নিউরন কি চার বছরে এতটা তাজা থাকবে?

আহা সিঁড়ি। সিঁড়িই শেষতক সত্য এ জগতে। ওপরে উঠতে এবং নিচে নামতেও। রাজউকের বিল্ডিং কোড না মানা, কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা জরুরি বহির্গমণ ব্যবস্থা না রাখা, অগ্নি নিরাপত্তা সম্পর্কিত ন্যুনতম বিধি না মানা এবং এমন আরও অনেক 'না' মানার মধ্য দিয়েই এখানকার ওপরে ওঠার সিঁড়ি তৈরি হয়। এ সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে ওপরে উঠে যায় তদারককারী সংস্থা, সরকারি–বেসরকারি সংস্থার কত কত ঊর্ধ্বতন, অনিয়ম না দেখার মুনশিয়ানায় কতজন চিনে ফেলেন এই স্বর্গের সিঁড়ি। আর এর ইট–সুরকি হিসেবে গা পেতে দিতে হয় কত কত নিচুতলার মানুষকে। তারপর? না, তাও থামে না এই স্বর্গসিঁড়ির ঊর্ধ্বগমন। আরও আরও উঁচুতে উঠতে এ ক্রমেই ভাড়াটে, ভোক্তা এমন নানা পরিচয়ের নিম্ন বা মধ্যবিত্ত শ্রেণিগুলোর হাড়–পাঁজর, কঙ্কালকে ব্যবহার করে। তবেই না চমক ছোটে এসব সিঁড়িতে, এসব সিঁড়িঅলা ভবনে।

চুড়িহাট্টার অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম, এফআর টাওয়ারের জরুরি বহির্গমনহীনতা, আর এই গ্রিন কোজির সিঁড়িতে থাকা সিলিন্ডার সেই একই বাস্তবতা তৈরি করে, যা দিয়ে ৪৬, ১০০ ইত্যাদি নানা সংখ্যা ঘুরে আমরা হাজারে হাজার হয়ে কাতারে কাতারে ঢুকে পড়ি, বা ঢুকে পড়তে বাধ্য হই মৃত্যুপুরিতে। আমাদের একমাত্র সান্ত্বনা ‘তদন্ত কমিটি’, যার প্রতিবেদন অন্ধকারে থাকতে থাকতে কদাচিৎ আলোর মুখ দেখে। আবার তা দেখলেও শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই হয় না। ওপরওয়ালারা ওপরেই বসে থাকে বেশ। অজস্র গ্রিন কোজি কটেজ দাঁড়িয়ে থাকে এই শহরে, এই দেশে। তাতে কারও কিচ্ছু আসে–যায় না পরবর্তী আগুন লাগার আগ পর্যন্ত।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

আমাদের ছেলে সূর্য সময় বিশ্বাস, দোতলার গ্রিল কাটা হলে বের হয়ে এসে সান শেডে অপেক্ষা করছে বন্ধুদের নিয়ে, সাদা শার্ট পরিহিত। সকল বন্ধুদের বের করে দিয়ে সবার শেষে সূর্য নিচে নামে। সূর্য নিজে আহত হয়েছে,...
অনেক বিশ্বনেতা পাকিস্তান ও ভারতকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে পরামর্শ দিচ্ছেন। যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু করেনি। ভারত পানি আগ্রাসন দিয়ে শুরু করে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার...
ভারত যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেবে, সেটি এক অর্থে অনুমিতই ছিল। অন্তত ভারত ও পাকিস্তানের গত ১০ বছরের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে যারা একটু-আধটু খোঁজখবর রাখেন, তারা এই...
ক’দিন আগের কথা। সপ্তাহের অফিস খোলা কর্মদিবস। স্বাভাবিকভাবেই রাস্তায় চাপ আছে মানুষের, যানেরও। তবে সকাল ১০টার পর সেই চাপ একটু হলেও কমে আসে। তেমনই এক সময়ে রাজধানীর একটি ব্যস্ততম রাস্তা পার হতে হচ্ছিল।...
বাংলাদেশে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে ফিলিপাইনের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।...
ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের মধ্যেই ভারতে দিল্লি অভিমুখে কৃষকদের পদযাত্রা ঠেকাতে শম্ভু ও খানৌরি সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে...
ভারতে এই প্রথম ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাপানি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাকেদা বায়োফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকাটি বাজারজাতকরণের আনুষ্ঠানিক অনুমতি...
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর