সিয়েরালিয়ন থেকে আমি গত ১৮ তারিখে এসেছি। ম্যালেরিয়া থেকে সবে উঠেছি। খুবই দুর্বল শরীর। আমাদের ড্রাইভার ছুটিতে। তাই আমিই ছেলেকে আনতে যাই। আমাদের ছেলে সূর্য সময় বিশ্বাস, দোতলার গ্রিল কাটা হলে বের হয়ে এসে সান শেডে অপেক্ষা করছে বন্ধুদের নিয়ে, সাদা শার্ট পরিহিত। সকল বন্ধুদের বের করে দিয়ে সবার শেষে সূর্য নিচে নামে। সূর্য নিজে আহত হয়েছে, ওর ডান হাত কিছুটা আগুনে ঝলসে গেছে, ফোসকা পড়েছে, পাঁচ বন্ধু আগুনে পুড়ে মারা গেছে, তবে চার বন্ধুকে সে নিরাপদে বের করতে পেরেছে–এজন্য তার কিছুটা সান্ত্বনা।
ছেলেকে আনতে গিয়ে আমিও আহত হয়েছি। বিমান যেখানে বিধ্বস্ত হয়েছে, আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বারান্দায় গেটে ছাত্র শিক্ষক বেষ্টিত আমি এক শিক্ষকের সাথে কথা বলছিলাম। দুপুর ১টায় ছুটি হয়েছে। ছাত্ররা নিচে নামবে বলে ওই শিক্ষক আমাকে নিচে যেতে বললেন। আমি বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখি বিমান আমার দিকে ধেয়ে আসছে। মনে হলো বিমানের একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। মাঝখানে একটা ফুটবলের মাঠ। আমি মুহূর্তের মধ্যে বারান্দার সিঁড়ি থেকে লাফ দিয়ে বাম দিকে পড়ে যাই। বিমান আমার ডান দিকে আছড়ে পড়ে। মাটি-বালির মধ্যে পড়ে কোনোমতে উঠে আবার দৌড় দিই। এসবই ঘটেছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। পেছনে তাকিয়ে দেখি আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আমার ছেলের ক্লাসরুম ছিল ঠিক আগুনের উপরে। আমার মনে হচ্ছিল আমি আমার ছেলেকে আগুনে পুড়তে দেখছি; অথচ আমার কিছুই করার নেই। আমার স্ত্রী শারমিন ইসলাম সাথী মাইলস্টোন কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক; অন্য বিল্ডিংয়ে ছিল। পরে দু‑তিন মিনিটের মধ্যে আমরা একসাথে হয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আমার বুকের বাম পাশ দিয়ে রক্ত ঝরছে, খেয়াল করি নাই। সাথী প্রথম খেয়াল করে আমি আহত।
আগুনে জ্বলছে নিচতলা এবং দোতলা। এদিকে দোতলার গ্রিল কেটে দুই পাশে উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা একপাশে ছিলাম। সবাই একে একে বের হলেও আমার ছেলে আর বের হলো না। আমি হতাশ হয়ে বসে আছি, এমন সময় অপরিচিত এক নম্বর থেকে সাথীর মোবাইলে কল আসে, সূর্য কথা বলছে। সূর্যদের উদ্ধার করে বাংলা মিডিয়ামের বিল্ডিংয়ে আনা হয়েছে। আমি দাঁড়াতে পারছি না, সাথী গিয়ে ছেলেকে আনল। আমরা আমাদের ছেলেকে পেয়ে কাঁদতে লাগলাম। তারপর কোনোমতে হেঁটে গোল চত্তরে এসে একটা রিকশা নিয়ে হাসপাতালে যাই। এরপর আমার নিজের ওপর আর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমার বুকে সেলাই করা হয়েছে। ডাক্তারের পরামর্শে আমরা বাসায় এসেছি। অনেক অজানা বাবা‑মায়ের সন্তান হারানোর কষ্ট, আগুনে পুড়ে যাওয়া আহতদের কষ্ট অনুভব করছি। আবাসিক এলাকায় যুদ্ধবিমান ট্রেনিংয়ের সরকারি ভুল সিদ্ধান্তের কথা ভাবছি। সূর্য জানত আমি ওর জন্য গেটে অপেক্ষায় ছিলাম। সে মুক্ত হয়েই কাঁদতে থাকে, বাবা সম্ভবত বেঁচে নেই! ও আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, ‘বাবা আমি ভেবেছি তুমি বেঁচে নেই! আমি তো অনেক কেঁদেছি তোমার জন্য। আমার পাশে অপরিচিত একজনের মোবাইল থেকে মাকে কল করেছিলাম।’
এখনো মাঝে‑মধ্যে সূর্য ঘুমের মধ্যে বলে, ‘মা, বাবা ঠিক আছে তো?’ আমি জানি না সূর্যের এই ট্রমা কতদিনে ঠিক হবে!
লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



