৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি উপলক্ষে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালের মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে আবাসিক আইন উপদেষ্টা ক্রিস হাওয়ার্ড। আমেরিকার বিচার বিভাগের অংশ হিসেবে তিনি ঢাকায় কাজ করছেন। তাঁর সাক্ষাৎকারটি ঈষৎ সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে তুলে ধরা হলো।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: ক্রিস, প্রথমে জানতে চাই বাংলাদেশে কেমন লাগছে আপনার।
ক্রিস হাওয়ার্ড: বাংলাদেশে থাকাটা ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে আমার জন্য একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের মানুষ দারুণভাবে আমাকে ও আমার পরিবারকে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশের তদন্তকারী, আইনজীবী ও বিচারকদের অনেকেই আমার বন্ধু ও অংশীজন, যাঁরা বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি মানুষজনকে বলি, বাংলাদেশে থাকাটা দারুণ এক অভিজ্ঞতা। এখানকার খাবার খুবই মজাদার।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: আমেরিকা একটি বিশাল দেশ; আপনি সেখানে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। আপনি কি বাংলাদেশের সাথে কোনো মিল খুঁজে পান?
ক্রিস: এটি একটি বড় দেশ, কিন্তু আমি এসেছি একটি ছোট শহর থেকে। এটা ইন্ডিয়ানার একটি ছোট শহর, যার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মাঝামাঝি। সেখানে প্রচুর কৃষিজমি ও পরিশ্রমী মানুষ আছে। দুই জনপদের মধ্যে এ ব্যাপারে মিল আছে। আমি সামাজিকভাবে একত্রে বাস করে বড় হয়েছি। এটি নিরাপদ। বাংলাদেশের মানুষও তেমনটিই করে। উভয় ক্ষেত্রেই তাঁরা তাঁদের সন্তানদের বেড়ে ওঠার বিষয়ে যত্নশীল। তাঁরা শিশুদের জন্য আরও ভালো সুযোগ করে দিতে চান। উভয় ক্ষেত্রেই আমি দেখছি, প্রতিবেশীরা একত্র হয়ে এবং একসঙ্গে কাজ করছে, বিশেষ করে কঠিন সময়ে।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: ক্রিস, আমরা যত দূর জানি, আপনি ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি, সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে স্নাতক হয়েছেন। আর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে স্কুল অব ল-এ পড়েছেন। আপনি আমেরিকার একজন ফেডারেল অ্যাটর্নিও। এখন বাংলাদেশে আপনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আইনজীবী ও তদন্তকারীদের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন। এতে কী ধরনের পদ্ধতিগত উন্নতি দেখছেন আপনি?
ক্রিস: আমি যুক্তরাষ্ট্রের একজন ফেডারেল প্রসিকিউটর। মার্কিন বিচার বিভাগের অংশ হিসেবে আমি বিচার পদ্ধতির উন্নতি, সহায়তা ও প্রশিক্ষণের তত্ত্বাবধানের জন্য বাংলাদেশে আছি। এটি কখনো কখনো OPDAT হিসেবে পরিচিত। মার্কিন বিচার বিভাগে আমার মতো ৬০ জন আইনজীবী আছেন, যাঁরা বিশ্বব্যাপী ৪০টিরও বেশি দেশে এই সহায়তা দিচ্ছেন।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: তৃতীয় বিশ্বের দেশ নাকি পশ্চিমা...
ক্রিস: এগুলো এমন দেশ যারা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি রয়েছে। আমরা যা করছি, তা হলো সক্ষমতা বৃদ্ধি। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য দেশেও।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: কিছু নাম বলবেন…
ক্রিস: এখানে বাংলাদেশে আমাদের কাজের মধ্যে দুর্নীতি, লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতা, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যকলাপ, মাদক, মানব পাচারসহ সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। আমরা বিচারকদের সাথেও কাজ করি। মূল বিষয় হলো আমরা যে দেশগুলোর সাথে কাজ করি, তাদের কখনো বলি না যে, কী করা উচিত বা কীভাবে করতে হবে। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসি এবং কীভাবে করা যেতে পারে, তা তুলে ধরি। আমরা তদন্তকারী, আইনজীবী ও বিচারকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের চেষ্টা করছি, যাতে তাঁরা আরও কার্যকরভাবে বিচারকাজ সম্পাদনে সক্ষম হন। আপনাকে কিছু উদাহরণ দিই। বিশেষ করে তদন্তকারীদের জন্য আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি, যেখানে কার্যকর জিজ্ঞাসাবাদের কৌশলগুলো শেখানো হয়। তদন্তের সময় একজন সাক্ষী বা ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার ভালোভাবে নিতে হয়।
আমরা ডিজিটাল প্রমাণ উপস্থাপন, শনাক্ত ইত্যাদি বিষয়েও প্রশিক্ষণও দিই, যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রে হয়। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক প্রমাণাদি সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আর্থিক অপরাধ তদন্ত পরিচালনার ব্যাপারেও উদ্যোগ নিয়েছি। ধাপে ধাপে এগোচ্ছি আমরা, যাতে অভিযুক্ত বা অপরাধমূলক কাজের নেপথ্য সংগঠকদের ধরা যায়। এ জন্য তদন্তকারীদের সাথে আমাদের অংশীদারত্ব আছে। আমরা আইনজীবীদের সাথেও কাজ করি। আমি মনে করি, এটা বেশ শক্তিশালী একটি কার্যক্রম।
অংশীদার হিসেবে আমরা বাংলাদেশে আইনজীবীদের সওয়াল-জবাবের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ দিই। আমরা চাই, আদালতে ও সহিংস অপরাধের ভিকটিমদের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে তাঁরা কার্যকর আইনজীবী হয়ে উঠুন।
এখন আমরা বিচারকদের সাথেও কাজ করি। বিচারকদের জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকার, আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাথে একটা মডেল অর্ডারের খসড়া নিয়ে কাজ করছি, যেটা বিচারকেরা তাঁদের আদালত কক্ষে ব্যবহার করতে পারেন। আমরা এখানে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জন্য কিছু নির্দেশিকা তৈরির জন্যও কাজ করছি। আমরা বেঞ্চ বইও তৈরির কাজ করছি, যাতে তা বিচারকেরা তাঁদের বেঞ্চে ব্যবহার করতে পারেন। এটা অর্থপাচার বা লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে বাস্তবানুগ ও দরকারি আধার হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং এটি একটি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন সম্পর্কিত কাজ।

ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: আপনি জানেন, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আপনি কি মনে করেন যে, একজন বাংলাদেশি নারী কোনো বিষয়ে আমেরিকান নারীর চেয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে বা এগিয়ে আছেন? অথবা তাঁরা একই জায়গায় অবস্থান করছেন?
ক্রিস: আন্তর্জাতিক নারী দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস, যা শুধু এর মাধ্যমে হওয়া অগ্রগতির জন্যই স্মরণীয় নয়। আরও অনেক অগ্রগতি এখনো বাকি। এটা আমেরিকার জন্যও সত্য, বাংলাদেশের জন্যও তাই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতা রোধকে তাঁর প্রশাসনের জন্য একটি অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুই মেয়ের বাবা হিসেবে আমিও বিষয়টি পুরোপুরি বুঝি। বিশ্বব্যাপী কিশোরী বা তরুণীদের সুরক্ষায়, তা তার নাম সুমাইয়া হোক বা সামান্থা–মার্কিন বিচার বিভাগ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে এ নিয়ে অংশীদারত্বে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে এ সুযোগটা করে দিতে হবে। কারণ তাদের প্রতি তেমন কিছু না ঘটা পৃথিবীর জন্যই ভালো।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: বাংলাদেশে লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? এর নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ক্রিস: এটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন আমি এমনটা মনে করি? এটা তিনটি পির (P) ওপর নির্ভর করে। আপনাকে এটি প্রতিরোধ করতে হবে, বেঁচে থাকা এবং এগিয়ে যাওয়ার সাহস আছে-এমন ব্যক্তিদের রক্ষা করতে হবে এবং সেই দোষীদের বিচার করতে হবে। সুতরাং এটি হলো প্রতিরোধ (প্রিভেনশন), সুরক্ষা (প্রোটেকশন) এবং ন্যায়বিচার (প্রসিকিউশন)। তবে প্রথম পদক্ষেপটি হলো লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতার গুরুত্ব এবং এটি কতটা গুরুতর, তা অনুধাবন। সারা বিশ্বে প্রতি ১১ মিনিটে একজন নারী তাঁর সঙ্গীর দ্বারা খুন হন। এটা উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। এটা অগ্রহণযোগ্য। ২০১৫ সালে জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশেরও বেশি পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অতি সম্প্রতি অনলাইনে যতই আমাদের উপস্থিতি বাড়ছে, ততই অনেক বাংলাদেশি তরুণী ও কিশোরী বুঝতে পারছে যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাদের জন্য নিরাপদ স্থান নয়। বাংলাদেশে ২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের ৭০ শতাংশেরও বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। সুতরাং প্রথম পদক্ষেপটি সত্যিই লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে হতে হবে, যাতে এটি কতটা গুরুতর সমস্যা, তা চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু এটা এখানেই থামবে না। সত্য তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যারা এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস দেখায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ইন্টারনেটে যারা হেনস্তা করছে, তারা হয় প্রেমিক নয়তো স্বামী। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী ও নিপীড়ন থেকে বেঁচে ফেরা নারীরা নির্যাতনকারীর ওপরই আর্থিকভাবে নির্ভরশীল। সুতরাং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি কেউ সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তাহলে আমাদের তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
সারা দেশে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার আছে। বেঁচে যাওয়াদের সুরক্ষা দিতে প্রয়োজনের চেয়ে এখনো ছোটই জায়গাটা। ঢাকায় আমরা ডিএমপির নারী সহায়তা তদন্ত বিভাগের সাথে কাজ করি। এটি নারীদের নেতৃত্বে একটি নারী ইউনিট। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মানসিক পরামর্শ দেওয়ার সুবিধা রয়েছে সেখানে। লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতার ভুক্তভোগী ও বেঁচে ফেরাদের জন্য আরও অনেক কিছু করা দরকার। এবং অবশ্যই সেখানেই থামলে চলবে না।
একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে প্রমাণ সংগ্রহই শুধু কাউকে গ্রেপ্তার করার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা এমন প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি নিয়েছি, যা অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে আস্থায় নেওয়ার দিকে চালিত করে। এর মানে এই যে, ভুক্তভোগীর কাছ থেকে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা মন দিয়ে শুনে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করা। এই প্রমাণ ডিজিটাল হতে পারে, ইলেকট্রনিক হতে পারে, এটি শারীরিক প্রমাণও হতে পারে। অন্যান্য সাক্ষীও হতে পারে। প্রায়শই লৈঙ্গিকভিত্তিক সহিংসতার পর টিকে থাকা এই ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে প্রথম অভিযোগ করার আগে তাদের বন্ধু, প্রতিবেশী, পরিবারের সদস্যদের জানায়। তদন্তের সময় এই সাক্ষীদের কাছে পৌঁছানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একবার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত সম্পন্ন হলে আইনজীবীর কাজটা হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দিনশেষে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সফলভাবে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করুন। যখন অভিযুক্তরা প্রাপ্য পরিণতির মুখোমুখি হয়, তখন সবার মধ্যে পরিণতির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ধারণা জন্মে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সমাজের মধ্যে একটা আস্থা গড়ে ওঠে। এই অগ্রগতি খুবই কঠিন। এটি একটি কঠিন সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সাথে অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমরা এমন পদক্ষেপগুলোই নিচ্ছি।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, বিশেষ করে নারীদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কীভাবে ভিকটিম ও সাক্ষীরা আইনজীবী, বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা তদন্তকারীদের কাছ থেকে সুরক্ষা পেতে পারেন? আপনার মতামত কী?
ক্রিস: আমরা যখন ভিকটিম ও সাক্ষীদের সুরক্ষার কথা বলি, তার মানে হলো, তারা যেন তদন্ত বা বিচারকাজ চলাকালে আবার আঘাত (রিট্রমাটাইজেশন) না পান, তা নিশ্চিত করা। তদন্তকারী ও আইনজীবীদের প্রশিক্ষণকালে আমরা ওই বিষয়ের ওপর মনোযোগ দিই, যাতে তাঁরা ভিকটিমের ট্রমা বা আতঙ্কের কথা মাথায় রেখে কাজ করেন। একটি উদাহরণ দিই, যখন আপনি একজন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নেন বা সাক্ষ্য নেন তখন আপনি কীভাবে এই প্রশ্নগুলো করছেন? তাঁরা সেগুলো বিশ্বাস করছেন কি না? আপনি কি তাঁদের সাথে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাগুলোর জন্য তাঁদের দোষারোপ করছেন? নাকি যা ঘটেছে, তার জন্য আপনি তাঁদের বিচার করছেন? এখন চিন্তা করুন, যে ভিকটিম সাহস দেখিয়ে এগিয়ে এসেছেন এবং তিনি যদি দেখেন তদন্তকারীর কাছে যা বলছেন তা তাঁরা বিশ্বাস করেন না, তাহলে সেই ভিকটিম কীভাবে আদালতে হাজিরা দেবেন?
বাংলাদেশে আদালতের কার্যক্রম কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী তদন্তকাজে কতটা সহযোগিতা করছেন তার ওপর নির্ভর করে এর অগ্রগতি। যখন আমরা সফল তদন্ত ও বিচারের কথা ভাবছি, তখন এই দুটি বিষয় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আবার একজন আইনজীবী হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি …আইনজীবীর কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং সে কথা মাথায় রেখেই আমরা প্রশিক্ষণ দিই। আমরা আইনজীবীদের সাথে কথা বলে, তাদের সাথে যুক্ত হয়ে আদালতের জন্য একজন সাক্ষীকে প্রস্তুত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাই। আপনি যখন আদালতে যান, তখন আপনি সবার সামনে আদালত কক্ষে সাক্ষ্য দেন। এটি সব সময়ই মানসিক চাপের ও উদ্বেগজনক মুহূর্ত। এখন আপনি যখন প্রস্তুতি নেবেন, সওয়াল-জবাবের আগেই আইনজীবীর সাথে কথা বলে নেবেন, তখন আপনার জন্য চাপ ও উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হবে। কারণ দিনশেষে কোনো ভিকটিম যেন এটা মনে না করেন যে, তিনি নিঃসঙ্গ, একা।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: বাংলাদেশে আপনি বিভিন্ন মামলা পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে আপনি কী সীমাবদ্ধতা দেখেছেন? আপনার কি কোনো পরামর্শ আছে?
ক্রিস: আমার ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় আদালতের কক্ষেই কেটেছে। বাংলাদেশের আইনজীবী ও বিচারকদের দেখে আমার মনে হয়েছে, তাঁরা মামলার বোঝায় অবিশ্বাস্যভাবে ন্যুব্জ। কত মামলার দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে? এমন নয় যে, তাঁরা শুধু বিচার বিভাগের জন্যই কাজ করেন। তাঁদেরকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। আমরা তাঁদের জন্য কাজ করছি। বিচারকদের জন্য কৌশল ঠিক করছি আমরা, যাতে কেস ডকেটগুলোর ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হয়, নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করা যায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ও স্বচ্ছভাবে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য তাঁরা পদক্ষেপ নিতে পারেন।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? আমেরিকার সাথে পার্থক্য কোথায়?
ক্রিস: একটা হলো, মার্কিন বিচার বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি বিষয়ে ওকালতি করেছে এবং তা হলো—ক্যারিয়ার প্রসিকিউশন সার্ভিস। আমি যুক্তরাষ্ট্রের একজন ফেডারেল প্রসিকিউটর। আমি শুধু ফৌজদারি মামলা করি। আমার একজনই ক্লায়েন্ট, যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে এটা একটু আলাদা। এখানে আইনজীবীরা প্রাইভেট অ্যাটর্নি। তাঁরা আইনি কাজ করতে চুক্তিবদ্ধ হন। পাশাপাশি তাঁরা সম্পূরক আয় হিসেবে ব্যক্তিগতভাবেও মামলা পরিচালনা করেন। আমি আশাবাদী যে, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে একটি পেশা হিসেবে ক্যারিয়ার প্রসিকিউশনকে দেখতে পাব।
পাশাপাশি অন্যান্য পার্থক্যও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের বেশির ভাগ ফৌজদারি মামলায় জুরিরা জড়িত থাকেন। এদের দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ঠিক করা হয়। তাঁরা আদালতে আসেন, সাক্ষ্য শোনেন ও প্রমাণ দেখেন এবং সিদ্ধান্ত নেন। আর বাংলাদেশে একজন বিচারক এই সিদ্ধান্ত নেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল আদালতে কাজের অনুশীলনে আমাদের ৯০ শতাংশ মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিটে যায়। এই ফলাফলগুলোর বেশির ভাগই প্রাক-চুক্তি।
এখানে বাংলাদেশেও প্রাক-চুক্তি ব্যবহার করা হয়। সেক্ষেত্রে আরও কিছু পার্থক্য আছে। তবে পার্থক্যের চেয়ে বেশি মিল রয়েছে। আরও বিষয় রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করে। আরও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে যা আমি যুক্তরাষ্ট্রে ও বাংলাদেশে দেখতে পাই। এর মধ্যে সমাজে বসবাসকারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি এবং সাক্ষী ও ভিকটিমদের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো আছে। একই সাথে বিচারকাজ সম্পন্নের পাশাপাশি অভিযুক্তের অধিকার রক্ষাও দায়িত্ব। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় এগুলো আমেরিকা, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের জন্যই চ্যালেঞ্জ।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: ক্রিস, আপনি কি আমাদের কোনো ভালো কাজের স্মৃতি শেয়ার করতে পারেন?
ক্রিস: অনেক ভালো স্মৃতি আছে। আমি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আছি। এবং সত্যিই অংশীদারত্ব ও মানুষের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ ‘কোর্ট রুম কমপিটিশন’ নামে একটি প্রতিযোগিতার স্পনসর। বাংলাদেশের আইনের শিক্ষার্থীরা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তারপর প্রতিযোগিতার শীর্ষ দল ওয়াশিংটন ডিসিতে যায়, সারা বিশ্ব থেকে আসা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের সাথে অংশ নিতে। আইনের শিক্ষার্থীদের দেখে আমি আপ্লুত হয়েছি। তাঁদের প্রতিভা ও বলার ভঙ্গিমা দারুণ। আমি লক্ষ করেছি, বাংলাদেশ থেকে সাধারণত এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন একজন নারী শিক্ষার্থী। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ এবং এর আইনি ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমি যখন দেখি বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েদের, যারা ভবিষ্যৎ আইনজীবী বা নেতা, তাদের অসামান্য মেধা, যোগ্যতা আছে, তখন এ বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: আপনি ইতিমধ্যে বলেছেন, আপনি বাংলাদেশে এক বছরের বেশি সময় ধরে আছেন। আমার শেষ প্রশ্ন, আপনি কি কোনো বাংলা শব্দ শিখেছেন?
ক্রিস: জি, আমি প্রায় ১২টি বাংলা শব্দ জানি। আমার মেয়েরা বাংলা ক্লাসে যায়, তারা বেশি জানে। কিছু মূল শব্দ আছে যেমন ধন্যবাদ, ঠিক আছে, আচ্ছা। কিছু বাংলা শব্দ আমি জানি।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল: ধন্যবাদ ক্রিস।
ক্রিস: আপনাদেরও ধন্যবাদ।



