‘রাশিয়া যদি ইউক্রেনে আগ্রাসন বন্ধ করে, তাহলে যুদ্ধ শেষ হবে।’ উক্তিটি কার, জানতে চাইলে পাঠক সবাই একবাক্যে নামটা বলে দেবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিষয়টি এমন দাঁড়াল না যে, ন’মণ তেল যদি পোড়ে, তবে রাধা নাচবে! রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মানতেই নারাজ, ইউক্রেনের কোনো আলাদা অস্তিত্ব আছে। তিনি মনে করেন, ইউক্রেন রাশিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়াল, ন’মণ তেলও পুড়ছে না; অতএব রাধাও নাচবে না।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নাটকে সারা বিশ্বের মানুষকে যে পরিমাণ শুল্ক দিতে হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে; তার হিসাব কি কেউ বের করেছে? করেনি। কারণ, দায়টা যেদিকে যাবে, তারাই তো এর উত্তর জানে। সে ক্ষেত্রে না বলাই দস্তুর। একদিকে ইউক্রেন, অন্যদিকে ফিলিস্তিন–লাশের সারির ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে কাফফারা দিচ্ছে দুনিয়ার সাধারণ মানুষ।
এরই মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে–কেন করোনা অতিমারির প্রভাব থেকে মানুষকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ না দিয়েই বাধানো হলো এ লড়াই? হিসাব অনেক দূরবর্তী ও গভীর–সন্দেহ নেই। একটা সহজ হিসাব তো সবাই জানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যে বৈশ্বিক ধারা চলে আসছে, সেখানে একটা পরিবর্তনের তীব্র তাড়না আমেরিকা ও তার মিত্ররা অনুভব করছে অনেক দিন ধরেই। নতুন সেই দীর্ঘ সমীকরণে কে কোথায় কীভাবে আছে, কেউ জানে না। এ মনও জানে না। এখন যদি কেউ বলে, ইউক্রেন যুদ্ধ বাধানো এবং তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করার প্রধান কারণ রাশিয়াকে দুর্বল করা নয়–টুকরো টুকরো করা। জানি, অনেকে বিশ্বাস করার বদলে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবেন। কয়েক সংখ্যা আগে ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রবন্ধে এ ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছিল। সেখানে লেখক নিজেই বলেছেন, রাশিয়া ভাঙার কাজটা ঠিক হবে না। ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ধারক হিসেবে ফরেন পলিসির কথা একেবারে ফেলনা নয়।
বিষয়টি পুতিন বা রাশিয়া জানে না এমন নয়; কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার অভিজ্ঞতা আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সাহস দুর্মর করে তুলেছে। পরে কী হবে ভাবার সময় কোথায়। আরেকটি বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচিত যে, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের জয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার (যা ব্রেক্সিট নামে অধিক পরিচিত) সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটিশ নাগরিকের সম্মতির পেছনে রাশিয়া তথা পুতিনের হাত ছিল। অতএব যায় কোথায়? বিচারে দোষ প্রমাণের আগেই মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয়ে গেছে। তারই প্রক্রিয়া চলেছে দুই বছর ধরে।
মহামতি বাইডেন সাহেব ধরেই নিয়েছিলেন, এই সময়কালের মধ্যে তিনি পুরোটাই শেষ করতে পারবেন। এবং বিজয়ী বীরের বেশে বিশ্বের পরিত্রাতা সেজে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হবেন। হা হতোস্মি। কী ভাবলেন, আর কী হলো! যে ট্রাম্পের জন্য এত কিছু, সে-ই কিনা ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছেন। এখন পর্যন্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যমের পণ্ডিতদের যে হিসাব, তাতে বড় কোনো অঘটন না ঘটলে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসির সাদা বাড়িটাই ব্লন্ড চুলের ট্রাম্প সাহেবের চার বছরের ঠিকানা হবে।
ইউক্রেন নিয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তাঁর প্রশাসন আসলেই কী ভেবেছিলেন? এক এক করে তা একটু দেখা যাক। বাইডেন ও তাঁর পরামর্শকেরা ভেবেছিলেন, আগ্রাসনের অজুহাত টেনে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পুতিনের সব তেজ কর্পূরের মতো উবে যাবে। সুড়সুড় করে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে আমেরিকার পায়ে এসে পড়বেন। বাস্তবে দেখা গেল, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মস্কোকে নতুন পথ সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং সেই পথে চলে সাফল্য পেয়েছে; বরং এর কারণে অন্য শক্তিশালী দেশগুলোর আমেরিকার ওপর অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। তার প্রমাণ চীন-রাশিয়া-ভারতের নেতৃত্বে ব্রিকসের বড় হওয়া। এত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাশিয়ান অর্থনীতি জি-৭ এর অনেক দেশকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে অবস্থাপন্ন সদস্য জার্মানি সস্তায় রাশিয়ার গ্যাস কিনতে না পেরে বিপর্যস্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঘুরে দাঁড়ানো জার্মান অর্থনীতি এবারই মন্দার মুখে পড়েছে। আর এ জন্য দায়ী বাইডেনের যুদ্ধনীতি। যে নীতি পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো না চাইলেও মানতে বাধ্য হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে ট্রাম্প এলে কী হবে–এটা তাদের কাছে আরও বড় আতঙ্কের নাম।
দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে রাশিয়া যুদ্ধ সরঞ্জামের সরবরাহ লাইন ঠিক করে ফেলেছে। চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়ার পাশাপাশি নিজ দেশে যুদ্ধাস্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। অথচ পশ্চিমা মিডিয়ার পণ্ডিতদের হিসাবে রাশিয়ার পতন ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। অন্যদিকে ইউক্রেনের পাশাপাশি ইসরায়েলকেও সমানতালে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করতে গিয়ে আমেরিকার নিজের ভাঁড়ারে টান পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক, আফগানিস্তান বা সিরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর যে শিক্ষা হয়েছে, ইউক্রেনে এখনো সে অবস্থা রাশিয়ার হয়নি; বরং আরও অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। বাইডেনের নীতি রুশ সেনাদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছে বলে খোদ আমেরিকাতে অভিযোগ উঠেছে।
এই যুদ্ধের কারণে পুতিন তাঁর বন্ধুদের হারাননি। অর্থাৎ কূটনৈতিক ক্ষেত্রে পুতিনকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। বরং ভারত-চীনের মতো দুই শক্তিশালী দেশকে পাশে পেয়ে তাঁর এখন পোয়া বারো। আফ্রিকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন পুতিন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অধিকাংশই ইউক্রেন নিয়ে মার্কিন নীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলি নরসংহার শুরুর পরে বাইডেন প্রশাসনের অন্ধ সমর্থন সেই সংখ্যাকে আরও বাড়িয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশও রাশিয়াকে কাছে টেনে নিয়েছে। বাইডেনের পরামর্শকেরা কোনো ক্ষেত্রেই কেরামতি দেখাতে পারেননি; বরং রাশিয়ার প্রতিবেশী ও নতুন করে ন্যাটোয় যোগ দেওয়া নরডিক দেশগুলোর মধ্যে কাঁপন শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকার কথায় নেচে এখন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
সবাই জানে, প্রতিটি দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ জমা রাখে মার্কিন ডলারে। কিছুদিন আগে রাশিয়ার ৩০০ বিলিয়ন ডলার জব্দ করে সেই অর্থের বিনিময়ে ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নিয়েছে আমেরিকা, যা পুরোপুরি উল্টো ফল বয়ে এনেছে। এতে বিশ্বের সব দেশের মধ্যে এই ভয় ঢুকেছে যে, পছন্দ না হলে আমেরিকা শুধু আমার মজুত অর্থই আটকে দেবে না, সেই টাকায় অস্ত্র কিনে আমার ওপরই প্রয়োগ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশগুলো মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। একে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা, তার ওপর মজুত অর্থ জব্দ এবং অবশেষে অস্ত্র হয়ে ফিরে আসার আশঙ্কা– এ তো মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের চেয়ে শতগুণ কঠোর।
সাবেক ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ডমিনিক ডি ভিলেপিন গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছেন, যা বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, আমরা অনেক বেশি জনবিচ্ছিন্ন। দুর্ভাগ্যবশত, রাশিয়ার চেয়েও আরও বেশি জনবিচ্ছিন্ন।’ একই কথা হয়তো পশ্চিম ইউরোপের অনেক নেতার মনে রয়েছে। কিন্তু মুখে বলতে পারছেন না। কারণ, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চিত্রনাট্য যাঁরা লিখছেন, তাঁরা এই সব দেশের কথা মাথায় রাখেননি। এ ছাড়া ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া থেকে হয়তো কোনো শিক্ষাও নেননি তাঁরা।
প্রিয় পাঠক, লেখা শুরুর প্রথম বাক্যে ব্যবহৃত উক্তিটি মহামতি বাইডেনের। এবার বুঝুন কেরামতি।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



