পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট মেনে নিয়েছেন যে, সে দেশের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)-র প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ন্যায়বিচার পাননি এবং বিচারের প্রক্রিয়াও যথাযথ ছিল না। মনে রাখা দরকার, এই বিচারপ্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন বিচারপতিদের কাছ থেকে এসেছিল। ৬ মার্চ এই রায় ঘোষণার সময় পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি কাজী ফায়েজ ইসার কি মনে হচ্ছিল, ৪৪ বছর আগে তাঁরই পূর্বসূরিদের ভুল বিচারের জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো একজন রাজনীতিককে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছিল? যে মামলায় ভুট্টোর প্রাণদণ্ড হয়, সেই মামলা প্রাথমিক অবস্থায় নাকচ হয়ে গিয়েছিল। একজন ম্যাজিস্ট্রেট ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভুট্টোর কোনো যোগ খুঁজে না পেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিলেন।
তবে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে এই ভুলের দায় স্বীকার করেননি। ভুট্টোর জামাতা আসিফ আলী জারদারি ২০১১ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট থাকার সময় সুপ্রিম কোর্টের কাছে একটা রেফারেন্স পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, জুলফিকার আলী ভুট্টোর বিচারে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। ১২-১৩ বছর পরে এই রায় যখন এলো, তত দিনে সিন্ধু নদ দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। রাজনীতির মারপ্যাঁচে জারদারি আবার প্রেসিডেন্টের তখতে। রায়টা এলো এই সময়ে। এটা কাকতালমাত্র হতেও পারে! কে জানে।
রাজনীতিক জুলফিকার আলী ভুট্টো নিয়ে নানা কথা বলা যেতে পারে। সিন্ধুর লারকানা এলাকার এক সামন্ত পরিবারের সন্তান। বাবা মুসলমান। মা ভারতের গুজরাটের হিন্দু পরিবারের মেয়ে। ফলে তাঁর মানসিক গঠন তেমনভাবেই গড়ে উঠেছিল। প্রাথমিক পড়াশোনা মুম্বাইয়ে। এরপর অক্সফোর্ড ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-তে। পরের ভুট্টোকে বুঝতে তাঁর এই বেড়ে ওঠার কাহিনি সাহায্য করবে।
পাকিস্তানের বহু মানুষ ১৯৭১-এ দেশ ভাঙার জন্য ভুট্টোর একগুঁয়েমিকে দায়ী করেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বিখ্যাত ভাষণেও পাওয়া যায় তার প্রমাণ, ‘…তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা’। কিন্তু রাজনীতিক ভুট্টো একাত্তরের দেশভাগের দায় সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে সারা দেশে নিজেকে হিরো প্রমাণ করলেন। মানুষ মেনে নিল। ১৯৭৩-এ নতুন সংবিধান চালু করলেন। সেখানে অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের জন্য মৃত্যুদণ্ড বরাদ্দ হলো, যাতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাপ্রধানদের নাক গলানো বন্ধ করা যায়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ৯৫ হাজার যুদ্ধবন্দি সেনাসদস্যকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করলেন। একাত্তরের অভিজ্ঞতা থেকে আমেরিকার পাশাপাশি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথেও সম্পর্ক ভালো করার ওপর জোর দিলেন। ১৯৭৪ সালে ভারত পোখরানে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালালে ভুট্টো ঘোষণা দেন, ঘাস খেয়ে হলেও অর্থাৎ কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে তাঁর দেশ পারমাণবিক শক্তিধর হবে। আজ যে পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী, তাঁর পেছনে অবশ্যই ভুট্টোর কৃতিত্ব আছে।
তবে ক্ষমতায় বসে অন্যদের মতো ভুট্টোও যে ভুলটা করেছিলেন, তা হলো ফেডারেল সিকিউরিটি ফোর্স (এফএসএফ) নামে নতুন একটি বাহিনী গঠন। তিনি ভেবেছিলেন, এই আধা সামরিক বাহিনী সেনাবাহিনীর বিপক্ষে তাঁর বর্ম হয়ে উঠবে। কিন্তু এফএসএফ নামের এই অথর্ব বাহিনীর একমাত্র কাজ ছিল বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন এবং তাদের সব সময় সন্ত্রস্ত রাখা। আর নির্বাচন এলে পিপিপির কর্মীদের সঙ্গে একযোগে দলীয় বাহিনী হিসেবে কাজ করা। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ভুট্টোর সঙ্গে যাঁরা পিপিপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন জে এ রহিম। ১৯৭৪ সালের ২ জুলাই ভুট্টো তাঁকে রাতে খাওয়ার দাওয়াত দেন। নির্দিষ্ট সময়ের পর কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও প্রধানমন্ত্রীর দেখা না মেলায়, রেগে গিয়ে রহিম সাহেব সেখানে উপস্থিত অন্যদের বললেন, ‘তোমরা লারকানার যুবরাজের জন্য অপেক্ষা করো। আমি বাড়ি চললাম।’ ওই রাতেই তাঁর বাড়িতে হামলা চালান এফএসএফ সদস্যরা। তাঁকে বেদম মারধর করা হয়। এভাবে নিজ দলের বিরোধীদের শায়েস্তা করতে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীকে কাজে লাগাতে পিছপা হননি ভুট্টো, যা তাঁর অনেক ভালো কাজের মধ্যে ফোঁটায় ফোঁটায় গো-চোনা যুক্ত করেছিল।
ফলে ভালো-মন্দ মিশিয়ে ভুট্টো এই যে এত কিছু করলেন বা করার চেষ্টা হলো, তা দেশের সাধারণ মানুষকে ততটা বিরক্ত না করলেও পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করা সেনাবাহিনী তাঁকে মেনে নিতে পারেনি। রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘকে খাঁচাবন্দি করার যে প্রয়াস তিনি নিয়েছিলেন, তা হিতে বিপরীত হয়েছে। দুই. তিনি সিন্ধু প্রদেশের মতো একটা ছোট প্রদেশের নেতা হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাবিদের ওপর ছড়ি ঘোরাবেন, এটা তো হতে পারে না। এ রকম অনেক কিছুই তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হককে ক্ষমতা নিতে প্ররোচিত করেছিল। কিন্তু প্ররোচনা নিলেই তো হবে না, শত্রুকে নিকেশ করতে হবে।
১৯৭৭ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভুট্টোর দল জিতলেও অভিযোগ ছিল ব্যাপক কারচুপির। আর এই কারচুপির প্রধান সহায়তাকারী ছিল এফএসএফ বাহিনী। এত সাতকাহন গাওয়ার উদ্দেশ্য একটাই–ঘটনাটা পুরোপুরি রাজনৈতিক। সমাধান হওয়াও উচিত ছিল রাজনৈতিক আন্দোলন, ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে; কিন্তু তা না করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে আবার ১৯৭১-এর আগের সমাধান দিল। ফলে পাকিস্তানের পক্ষে আর ‘পুনর্মূষিকো-ভব’ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর রইল না।
আর এর পরের কাহিনি আরও মারাত্মক। যে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের তাবড় জেনারেলকে ঘোল খাইয়েছেন, নাকে খত দিইয়েছেন, তাঁকে তো শূলে চড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া করা যায়? প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর বিশেষ সহকারী রাফি রাজা লিখেছেন, ‘জিয়াউল হকের সামরিক আইন জারির পর প্রচলিত ধারণা ছিল যে ‘জেনারেল জিয়াউল হক একটি কবর আগে থেকেই দেখে রেখেছিলেন, যাতে তাঁর বা জেএবির (ভুট্টো) লাশ থাকবে।’ ১৯৭৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নওয়াব মাহমুদ আহমেদ খান কাসুরি হত্যা মামলায় প্রথম গ্রেপ্তার করা হয় ভুট্টোকে। কিন্তু দুর্বল মামলায় ১৫ দিনের বেশি আটকে রাখা সম্ভব হয়নি তাঁকে। বিচারক জামিন দেন। সে মামলার ফাইল মোটামুটি প্রমাণাভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
ইতিমধ্যে জে. জিয়া ‘মার্শাল ল’ জারি করে সব নাগরিক অধিকার হরণ করেন। নিয়মের তোয়াক্কা না করে কাসুরি হত্যা মামলা সরাসরি চলে যায় লাহোর হাইকোর্টে। শুনানির জন্য বেছে নেওয়া হয় বিচারপতি মৌলভি মুশতাক হুসেনের বেঞ্চকে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের কারণে পদোন্নতি না পাওয়ায় তিনি ভুট্টো প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। হাইকোর্টে এই মামলা চলল রুদ্ধদ্বার কক্ষে। প্রায় খারিজ হওয়া মামলায় ফাঁসির আদেশ হলো ভুট্টোর। সুপ্রিম কোর্টেরও একক বেঞ্চের বিচারপতি হাইকোর্টের সাথে সহমত হলেন। নাসিম হাসান শাহ নামের ওই বিচারপতি পরে বলেছিলেন, ভুট্টোর ফাঁসির জন্য আংশিক দায়ী বিচারপতিদের দুর্বলতা আর বাকি পুরোটার জন্য দায় তাঁর আইনজীবীর যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরার ব্যর্থতা। তবে তিনি যে কথাটি স্বীকার করেননি তা হলো, রায়টি আসলে লেখা হয়েছিল রাওয়ালপিন্ডির ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সামনে ও পরামর্শে। যে কারণে পাকিস্তানের আইন বিশেষজ্ঞরা ভুট্টো ফাঁসির আদেশকে চিরকাল জুডিশিয়াল কিলিং বা বিচারিক হত্যা বলে আখ্যায়িত করে গেছেন।
সেটাই ৪৪ বছর পরে মেনে নিলেন প্রধান বিচারপতি কাজী ফায়েজ ইসার নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের নয় সদস্যের বেঞ্চ। নিজের দেওয়া রুলিংয়ে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘দেশের বিচারিক ইতিহাসে অতীতে এমন কিছু মামলা রয়েছে, যা জনসাধারণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করেছিল যে “ভয় বা অনুগ্রহ বিচার বিভাগের কর্মক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে”। অতএব, আমাদের অবশ্যই নিজ দায়বদ্ধতার চেতনায় নম্রতার সাথে আমাদের অতীতের ভুল-ত্রুটির মোকাবিলা করতে রাজি থাকতে হবে।’
প্রচলিত ধারা অনুযায়ী, ইতিহাসের আখ্যান যেমন শুধু বিজয়ীর চোখ দিয়ে দেখে লেখা হয়, তেমনি পাকিস্তানসহ এই ভারতীয় উপমহাদেশে আদালতের রায়ের একটা বড় অংশই লেখা হয় শাসকদের খুশি করার জন্য। সময়-কালভেদে বিষয়টি ১৯-২০ হলেও কখনো ১৫-২০ হয় না। এই যে নিজের নানার ব্যাপারে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের রায় শুনে আবেগাপ্লুত বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি; বলেছেন, তিন প্রজন্ম ধরে এই রায়ের জন্য তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন।
কিন্তু বিলাওয়াল কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, তাঁদের সরকারের আমলে এই পক্ষপাতমূলক আচরণ আদালতে হবে না? সরকারের ভাব বুঝে নিম্ন আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত রায় লেখা হবে না? পাকিস্তানের সর্বোচ্চসংখ্যক আসনজয়ী দলের নেতা ইমরান খান আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন, যা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তাঁর নানাকে জীবন দিতে হয়েছিল? এর একটারও উত্তর অন্তত বিলাওয়ালের কাছে নেই। আর কারও কাছে আছে এমন ভাবাটা বোধ হয় দুরাশা। নিম্ন থেকে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকেরা কি নতজানু নীতি থেকে সরতে পারবেন?
পেশোয়ারের শান্তিবাদী কর্মী ও আইনের শিক্ষার্থী আসমা বাঙ্গাশ লিখেছেন, ‘যখন মাননীয় প্রধান বিচারপতি ঘোষণা করেছেন যে, ভুট্টোকে সুষ্ঠু বিচারের সুযোগ দেওয়া হয়নি, তখন আমি আমাদের বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে চাই, আজ ৪৪ বছর পর আদালতে কী ভিন্নভাবে বিচার হচ্ছে? ১৯৭৯ থেকে কি এখন আলাদা? আজকের রেফারেন্সে, আমার প্রশ্ন, পাকিস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা ইমরান খানের সাথে কী করা হচ্ছে? আজকের আদালতে কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে না? ইমরান খানের কি সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে?’
আসমাদের প্রশ্নের উত্তর যদি পাকিস্তানের রাজনীতিকেরা না জানেন বা না মানেন, তাহলে পরিত্রাণের সুযোগ কম। তাঁরা যত পিন্ডির প্রলাপ শুনবেন ততই পেছাবেন। ফলে বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখলে, এখনকার কোনো বিচারিক ভুল সংশোধনের জন্য হয়তো আরও ৪৪ বছর বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে!
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



