এ দেশের বর্তমানের সরকারি কর্মচারীরা ১৫০ বছর আগে জন্ম নিলেই হয়ে যেতেন রাজকর্মচারী। ওই সময় এই দেশে রাজা-রানির শাসনই বিরাজমান ছিল। তবে রাজসময়ের অনেক পরে জন্ম নিলেও তাঁরা আছেন রাজার হালেই। তা নইলে কি আর জনগণের করের টাকায় ৩৬০০ টাকা কেজির বিস্কুট জিভে রোচে?
এমনটা যে দেশের কোনো প্রান্তিক এলাকার সরকারি কর্মচারী ঘটিয়েছেন, তা কিন্তু নয়। খোদ রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের কিছুদিন আগে বড় পদে থাকা এক বড়কর্তাই এমন দামের বিস্কুট কিনেছেন স্রেফ আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে। তাও যে তহবিলের টাকা খরচ করা হয়েছে, সেটি ছিল জনস্বার্থে ত্বরিৎ গতিতে কেনাকাটার জন্য নিবেদিত। সেই তহবিলের টাকাই উত্তর সিটির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা আপ্যায়নে ব্যবহার করেছেন। ওই আপ্যায়নও যে সে নয়। এতটাই বিশেষ, যেখানে হাজার হাজার টাকা কেজির বিস্কুট কিনে খেতে হয়। যুক্তি অবশ্য দেওয়া যেতেই পারে যে, সরকারি কর্মকর্তারা ভালো-মন্দ খেয়ে টিকে না থাকলে জনগণের উন্নতি করবে কে!
সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গত বছরের মে মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় প্রতি মাসেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে ৫-৬ কেজি করে বিস্কুট কেনা হয়েছে। বেশির ভাগ সময়েই বিস্কুট কেনা হয়েছে কেজি প্রতি ৩৬০০ টাকা ব্যয়ে। শুধু গত ডিসেম্বর মাসেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে সাতবার বিস্কুট কেনা হয়। পাঁচবারই কেজিপ্রতি ৩৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। মে থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত অবশ্য কয়েকবার জনগণের করের টাকার ওপর সীমাহীন রহম করে বিস্কুটের দাম কেজিতে ৩ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দেখানো হয়েছে। আহা, কী ত্যাগ স্বীকারই না করেছেন তৎকালীন প্রধান নির্বাহী! এতটা ‘ত্যাগ স্বীকার’ করে তিনি এরই মধ্যে অবসরেও চলে গেছেন। অর্থাৎ, পুলিশ আসার আগেই আসামি পগার পার না হলেও কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছেন।
হাজার হাজার টাকা কেজির বিস্কুটের খবরে মধ্য ও নিম্নবিত্ত মনে কাঁটার খোঁচা যন্ত্রণামুখর হয় বেশ। নিজের জিভ কখনো এত দামি বিস্কুটের ছোঁয়া পেয়েছে বলে মনে পড়ে না। হাজার হোক এ দেশে বিত্তের দিক থেকে মধ্য ও নিম্নই তো সংখ্যায় বেশি। প্রচণ্ড কষ্টেও তারা সরকারকে কর দিয়ে যায় নানা তরিকায়। এই যেমন, বর্তমানের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে টিকতে না পেরে এক রিকশাচালক স্যালাইন-পানি পানের জন্য এই আরোহীর কাছে চেয়েছিলেন অতিরিক্ত ৩০ টাকা। সেটি পেয়েই তিনি তৃপ্ত। তাঁকে যদি বলা হয় ৩৬০০ টাকা কেজির বিস্কুটের খবর, তিনি নিশ্চিত জানতে চাইবেন—এত দামী বিস্কুটে সোনা দেয় নাকি!
কেনাকাটার ভাউচারে দেখা গেছে, এসব দামি দামি বিস্কুট কেনা হয়েছে গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটের কামাল স্ন্যাক্স অ্যান্ড জেনারেল স্টোর নামের একটি দোকান থেকে। যদিও ভাউচারে বিস্কুটের নাম লেখা হয়নি। এসব থেকেই প্রতীয়মান হয় যে জনগণের স্বার্থে তৈরি ‘ইমপ্রেস্টমানি’ বা পুনঃভরণযোগ্য অগ্রিম বরাদ্দের টাকায় কতটা উচ্চমানের হরিলুট হয়েছে। যদিও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হিসাব বলছে, দাপ্তরিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জরুরি কেনাকাটা করতে এই টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
এখানে দুটি শব্দের প্রতি একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করা খুবই দরকার। একটি হলো, ‘প্রয়োজনীয়’। আর অন্যটি হলো, ‘জরুরি’। অর্থাৎ, যে জিনিসটি প্রয়োজনীয় এবং তা জনস্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে কেনা প্রয়োজন, সেক্ষেত্রেই এই ইমপ্রেস্টমানি ব্যবহার করা যাবে। অথচ, সেই অর্থ ব্যবহৃত হলো হাজার হাজার টাকা কেজির বিস্কুট কেনায়। জনগণের করের অর্থের কী নিদারুণ ব্যবহার!
যেকোনো দেশের সরকারব্যবস্থায় কিছু না কিছু দুর্নীতি থাকেই। দুর্নীতি বাদে কোনো সরকারি ব্যবস্থাই চলে না। প্রশ্ন থাকে যে, তার মাত্রা আসলে কতটুকু। যে দেশে এই মাত্রা কম থাকে, সেই দেশ উন্নতির পথে দ্রুত এগিয়ে যায়। আর যে দেশে মাত্রাছাড়া পর্যায়ে থাকে, সে দেশের ভবিষ্যতে কেবল অন্ধকারই দেখা যায়। আমাদের দেশেও কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির নানা খবর মাঝে মাঝেই সংবাদমাধ্যমে মেলে। এই তো সদ্যই দেশের এক প্রান্তের স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের এক কর্মচারীর গুনে গুনে ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হলো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। এমন ভিডিও কিন্তু নিয়মিত বিরতিতেই দেখা যায়। জানাজানি হলে কিছু হল্লা হয় ঠিকই। কিন্তু কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর আবার আসে নতুন কিছু।
অথচ এ দেশের সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুবিধার শেষ নেই। খোদ সরকারই নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। বর্তমান সরকারই তাদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন করে বেতন বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক দফা। দেওয়া হয়েছে অন্যান্য সুবিধাও। এমনকি বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের সঙ্গে সরাসরি বৈষম্য করে সরকারি খাতের কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর সরকার নির্ধারিত করের পরিমাণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এত কিছু দিলে নিয়োগকারীর একটাই চাওয়া থাকে। সেটি হলো, সততা। আর সেই জায়গাতেই যেন অনেক সরকারি কর্মচারীর সর্বগ্রাসী জিভকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সেই জিভ জনস্বার্থের নিমিত্তে তৈরি তহবিল দিয়ে ৩৬০০ টাকা কেজির বিস্কুট খায়। তাও আবার একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর দপ্তরই তা করে। ছোটরা যে তাহলে আরও কী কী করে, তার কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। তাদের মুখের ভেতরে হয়তো পুরো দেশটাই এঁটে যাবে!
এরই মধ্যে ৩৬০০ টাকা কেজি দরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিস্কুট কেনার ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। প্রমাণ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। মেয়র আতিক আরও বলেছেন, এ ঘটনা তদন্তের জন্য সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অনিয়মের সাথে কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করা হবে।
এসব হুঁশিয়ারি শুনতে ভালোই। কিন্তু এর সঠিক বাস্তবায়নই এখন বেশি প্রয়োজন। অভিযোগ যেহেতু উঠেছে প্রতিষ্ঠানের এক সময়ের বড় কর্তার বিরুদ্ধেই, সেহেতু অনিয়মের শাস্তিটা তুলনামূলকভাবে বেশি কঠোর হওয়া জরুরি। তা নইলে তুলনায় ছোটদের জিভে আর লাগাম টানা যাবে না। ‘সোনা’র মতো বিস্কুটেও তখন হয়তো তাদের খিদে মিটবে না। জরুরি তহবিলের সঙ্গে সঙ্গে বিস্কুট-বিরিয়ানি কিনতে কিনতে হাপিস হয়ে যাবে মূল তহবিলের সিংহভাগও। এসব ঠেকাতে তাই সরকারি চাকরির দাড়িপাল্লায় পুরস্কার ও তিরস্কারের মধ্যে সমতা বিধান অতি প্রয়োজন। নইলে যে চাটার দল সব চেটে সাফ করে ফেলবে!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



