ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে অনেকদিন ধরেই যুদ্ধ চলছে। সেই হিসেবে ইউক্রেনের একটি বিশাল অংশ বা কার্যত দেশটির পুরোটাই যুদ্ধাবস্থার আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। এর উল্টো পিঠে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা তেমন কোনো জরুরি অবস্থার মধ্যে নেই। এই শহরের অধিবাসীদের অন্তত মিসাইল বা মর্টার শেল বা গুলির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। তেমন শঙ্কাও মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে না কাউকে। কিন্তু তারপরও যুদ্ধ চলা ইউক্রেনের শহর কিয়েভের অবস্থাও কেন ঢাকার চেয়ে ভালো?
প্রশ্নটি উঠছে মূলত একটি আন্তর্জাতিক সূচকের ফলাফল দেখে। সম্প্রতি পৃথিবীর বাসযোগ্য শহরের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। দ্য গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স-২০২৪ নামের ওই তালিকায় ১৭৩টি শহরের মধ্যে ১৬৮তম অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এ তালিকার শীর্ষে আছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের কিয়েভ শহর এই তালিকায় ১৬৫ নম্বরে রয়েছে। অর্থাৎ, কিয়েভেরও কয়েক ধাপ পেছনে আমাদের ঢাকা শহর। এই শহরে নিশ্চিতভাবেই এমন কিছু আছে, যা বুলেট–বোমার চেয়েও ভয়ঙ্কর! অন্তত আন্তর্জাতিক সূচক তাই বলছে।
স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো, পরিবেশসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘দ্য গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স-২০২৪’। প্রস্তুতকারী সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা ইআইইউ বলছে, এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে মূলত এসব বিষয়ই হিসাবে নেওয়া হয়েছে। আর সেই সব দিক থেকেই বাসযোগ্যতার তালিকায় ঢাকার অবস্থান শেষের দিক থেকে ষষ্ঠ। ৪৩ দশমিক ৮ পয়েন্ট পেয়ে তালিকার ১৬৮তম অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। গত বছর ঢাকার অবস্থান ছিল ১৬৬। সেই হিসাবে এবার বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থানের আরও অবনমন হয়েছে।
এই অবনমন কেন হচ্ছে? চলুন, জেনে নেওয়া যাক, সূচকে দেওয়া ঢাকার মানগুলো। স্থিতিশীলতার দিক থেকে ঢাকা ১০০–তে পেয়েছে মোটে ৫০.০। স্বাস্থ্যসেবায় পেয়েছে ৪১ দশমিক ৭, সংস্কৃতি ও পরিবেশে পেয়েছে সাড়ে ৪০, শিক্ষায় ৬৬ দশমিক ৭ এবং অবকাঠামোয় ২৬ দশমিক ৮। এই সবই কিন্তু ১০০–এর মধ্যে। বাসযোগ্য শীর্ষ দশ শহরের তালিকায় প্রথমে রয়েছে ভিয়েনা। অস্ট্রিয়ার এই রাজধানী শহরের সঙ্গে তুলনায় গেলে দেখা যাবে, উল্লিখিত ৫টি দিক থেকে ভিয়েনা নম্বর পেয়েছে যথাক্রমে ১০০, ১০০, ৯৩ দশমিক ৫, ১০০ ও ১০০। বলা হচ্ছে, চমৎকার অবকাঠামো, সংস্কৃতি, বিনোদন এবং মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা ভিয়েনাকে তালিকার শীর্ষে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
তা, ক্লাসের ফার্স্ট বয় বা গার্লের রেজাল্ট তো ওমনই হবে। ও দিয়ে লাস্ট বেঞ্চে থাকা শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক বিচারে ভালো কোনো চিত্র ফুটে উঠবে না। তাই বলে যুদ্ধ চলা কিয়েভের চেয়েও কেন ঢাকার অবস্থা খারাপ থাকবে? যুদ্ধের মধ্যে থাকা একটি শহর স্থিতিশীলতায় পিছিয়ে থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় যুদ্ধবিধ্বস্ত কিয়েভ ও ঢাকা সমানে সমান। আর সংস্কৃতি ও পরিবেশ এবং শিক্ষায় কিয়েভ এগিয়ে রয়েছে ঢের। অবকাঠামোর দিক থেকে আবার সমান।
এই সূচক থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ঢাকাকে যেভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল, সেভাবে আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। সামান্য ঝড়‑বৃষ্টি হলেই তার প্রমাণ কিন্তু আমরা তদনগদে পেয়ে যাই। এই তো গতকালের কথা। প্রায় দুই ঘণ্টা তুমুল বৃষ্টি হলো ঢাকায়। আর ঠিক তখনই রাইড শেয়ার অ্যাপ থেকে শুরু করে মৌখিক দরাদরিতেও বেড়ে গেল চলাচলের যানবাহনের ভাড়া। আবার হরেদরে প্রত্যাখ্যান তো আছেই। শেষে এক সিএনজি অটোরিকশার চালককে চা‑কফি খাইয়ে কথিত ‘ন্যায্য’ ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে রাজি করান এই অধম। তা সেই ভাড়ার ন্যায্যতা কেমন? মিটারে যা ওঠে, তার দ্বিগুণের বেশি!
এসব অন্যায্য বিষয়গুলোকে ন্যায্য করার দায় অবশ্যই নগর চালানো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের। তা মেটানোর উদ্যোগ এ শহরে দেখা যায় কালেভদ্রে। এ শহরে যাত্রীবাহী বাসে অন্যায্য ভাড়া নেওয়া হয় প্রায়ই। প্রতিদিন অফিসে আসতে যে টাকার টিকিট কেনা হয়, তাতে বাড়তি অংশ থাকে অনেকটাই। সেসবও যে দেখা হয় না, তা আবার টিকিট কিনতে গেলেই বুঝতে পারা যায়।
এই শহরে খোলা জায়গায় আবর্জনা ফেলা হয় যাচ্ছেতাই ভাবে। সংস্কৃতি চর্চার স্থান আরও সীমিত। বিনোদনকেন্দ্রের অভাবও ব্যাপক। তাই আবাসিক ভবনের ছাদে ছাদে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে চলে আনন্দ উদ্যাপন। তাতে পাশের বাসার কারও হৃৎকম্পন হলে কার কী এসে গেল! তাছাড়া ঢাকার বড় বড় ও উঁচু ভবনগুলো যে শহরের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব পূরণ করতে পারছে না, তা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সূচক দেখলেই অনুধাবন করা যাচ্ছে। কারণ আমরা এ শহরে অবকাঠামো বলতেই বুঝি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামানোর ধান্দা। তাই যখনই বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডে কোনো বিশাল ভবন ও তাতে থাকা মানুষ পুড়ে খাক হয়ে যায়, ঠিক তখনই বেরিয়ে আসে অনিয়মের ফিরিস্তি। তখনই শুরু হয় ‘দায়’ নিয়ে লুকোচুরি খেলা। আর সেই ফাঁকে আমাদের প্রাণপ্রিয় ঢাকা শহরের র্যাংকিং যায় নেমে।
ঢাকা আর কিয়েভের স্বাস্থ্যসেবার মান সমান। অন্তত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সূচক তাই জানাচ্ছে। অর্থাৎ, কিয়েভের মানুষ রুশ বুলেট‑মিসাইলের মুখে যেমন স্বাস্থ্যসেবা পায়, আমরা ঢাকাবাসীরাও তেমনি পাই। আশা করি, এ নিয়ে আর বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই। একটু বেশি অসুস্থ হয়ে এই শহরের সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গেলেই আমরা বুঝে যাব সব। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিন্তু পরিসংখ্যানের চেয়েও শক্তিশালী। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে শুধু পাশের বাসার একসময়ের কেয়ারটেকার বাবুল মিয়ার কথা বলি। তাঁর স্ত্রী ক্যানসারের রোগী। চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করেছিলেন সবার কাছে চেয়েচিন্তে। সরকারি একটি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির ডেট বের করতে সেই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের একটি অংশ তাঁকে ব্যয় করতে হয়েছিল ঘুষে। নইলে যে আর রেডিওথেরাপি দেওয়া হতো না সঠিক সময়ে! সরকারির উদাহরণ গেল। আর বেসরকারির হিসাব নিশ্চয়ই একজন সামর্থ্যবানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জানে।
অর্থাৎ, ঢাকায় থাকা প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন যুদ্ধ করে চলে। বেঁচে থাকার কঠিন যুদ্ধ। তার তীব্রতা এতটাই যে, কিয়েভের বুলেট‑বোমাও সেখানে ‘বেটার অপশন’। বাসযোগ্যতার তালিকায় ঢাকা তো কেবল নামছেই। এখন খালি একেবারে তলানিতে থাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের (১৭৩) নিচে না নেমে গেলেই হয়।
হলপ করে বলতে পারি, জুরিখ‑জেনেভা‑সিডনি হওয়ার স্বপ্ন সাধারণ ঢাকাবাসী কখনোই দেখে না। এত ওপরে আমাদের না উঠলেও চলবে। আগে না‑হয় সেরা ১০০‑তে ঢুকি। ওতেই এই শহরের সিংহভাগ মানুষের মানসিক শান্তি উপচে পড়বে নিশ্চিত। একটু চেষ্টা করলেই কিন্তু সম্ভব। চেষ্টাটা করতে হবে সবারই। সৎ চেষ্টায় কী না হয়, বলুন!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


কেমন ঢাকা চাই
