৩৮টি দেশ ও সংস্থার কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিতে এক গুরুত্তপূর্ণ সভায় ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দেন যে, ক্ষমতায় এলে বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো পারিবারিক শাসন প্রতিষ্ঠা করবে না।
লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল বক্তৃতায় তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাঁর দল একটি সমৃদ্ধ ও সুখী জাতি গঠনে ৩১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে কাজ করবে। বলে রাখা ভালো যে, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বিএনপি এই ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। বিএনপি নেতা আরও অঙ্গীকার করেন যে, কোনো ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
‘রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারে বিএনপির ৩১ দফা কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক ঢাকায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় ৫৬ বছর বয়সী তারেক রহমান বলেন, “ভবিষ্যতের বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীসহ কোনো ব্যক্তি যেন ক্ষমতার অপব্যবহার বা ইচ্ছামতো কাজ করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। বিএনপি যদি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে আমরা সব নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব, তা তিনি যেকোনো দলের সমর্থক হোন না কেন।”
“আমাদের লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা যেখানে ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করার জন্য কাউকে হয়রানি করা হবে না। এমন কি প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিয়ে মন্তব্য করার পরও কেউ হয়রানির শিকার হবেন না। মূলধারার ও সামাজিক গণমাধ্যমকে সত্য গোপন করতে বাধ্য করা হবে না, এবং সরকার কাউকে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর জন্য চাপ দেবে না।”
গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনে দেশের রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামো সংস্কারের জন্যে জনআকাঙ্ক্ষা যখন তীব্র, তখন এই প্রতিশ্রুতিগুলো আশাজাগানিয়া।
শেখ হাসিনার ভারতে পালানোর পর বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ অন্তত আপাতত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ছাত্র-যুবসমাজ এবং সাধারণ মানুষের দাবি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের জন্য সংস্কার প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। এ প্রেক্ষাপটে সংস্কারের এই দায়িত্ব এখন প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর বর্তায়।
পূর্ববর্তী শাসক দল আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী শাসনের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করেই বিদায় নিয়েছে। এমন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি নেতৃত্বের এই প্রতিশ্রুতি যে ভবিষ্যতে কোনো সরকারপ্রধান ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বেচ্ছাচারিতা করবেন না, তা দলের ভেতরেও প্রতিফলিত উচিত। প্রকৃত অভ্যন্তরীণ সংস্কার ছাড়া এই ধরনের ঘোষণাগুলো শুধুমাত্র কথার ফুলঝুরি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে—‘ভালো কাজের শুরু নিজের ঘর থেকে করতে হয়’।
উল্লেখ্য, বিএনপি গঠনতন্ত্রে দলের চেয়ারম্যানকে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই দলের প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারের কর্মসূচিকে টেকসই করতে হলে দলকে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিএনপির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দলীয় প্রধান প্রায় সম্পূর্ণ কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি প্রায় সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং ইচ্ছেমতো কিছু সংশোধন বা বাতিল করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটি, যা দলের সবচেয়ে শক্তিশালী নীতিনির্ধারণী সংস্থা, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গ, অসদাচরণ বা দলবিরোধী কার্যকলাপে অভিযুক্ত হলে তার সদস্যপদ বাতিল বা সাময়িক স্থগিত করার ক্ষমতা রাখে। তবে, স্থায়ী কমিটির সভা ডাকা সম্ভব না হলে, দলপ্রধান নিজের বিবেচনায় জরুরি পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত সদস্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ বা পূর্বে আরোপিত শাস্তি প্রত্যাহার করতে পারেন। তবে, এই সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তী স্থায়ী কমিটির সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে।
শৃঙ্খলাবিষয়ক সিদ্ধান্তে দলীয় প্রধানই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত। গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে: “শাস্তির বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি চেয়ারম্যানের কাছে আপিল করতে পারবেন, তবে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।”
এছাড়াও, গঠনতন্ত্র অনুসারে, সকল মহানগর ও জেলা নির্বাহী কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন মহাসচিবের, যিনি চেয়ারম্যানের পরামর্শে কাজ করেন। এই বিধানটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে স্পষ্টভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বিশাল ক্ষমতার অধিকারী, যা তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কার্যকর করা এবং ইচ্ছেমতো পদক্ষেপ বাতিল করার সুযোগ দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দলপ্রধানের ক্ষমতা রয়েছে ৪৭০ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, থিম্যাটিক সাব-কমিটি এবং অন্যান্য কমিটি ভেঙে দেওয়ার। তিনি এই কমিটিগুলো পুনর্গঠন করতে পারেন, তবে পরবর্তী কাউন্সিল সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদনের শর্ত রয়েছে।
এছাড়া, চেয়ারম্যান জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং থিম্যাটিক সাব-কমিটিগুলোর শূন্যপদ পূরণের ক্ষমতা রাখেন। বিশেষ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা পরিবর্তন করতে পারেন, তবে মোট সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত সীমার দশ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বিএনপির মধ্যে এক বা একাধিক সাংগঠনিক সংস্থা গঠনের সুযোগ রয়েছে। তবে, চেয়ারম্যানের অনুমোদন ছাড়া কোনো সংগঠন বিএনপির সহযোগী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পায় না।
এমনকি বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় কাউন্সিলকে পাশ কাটিয়ে দলের গঠনতন্ত্রও সংশোধন করা সম্ভব। গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে: “জরুরি কারণে যদি কোনো সংশোধন প্রয়োজন হয়, তবে দলের চেয়ারম্যান গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে পারেন, তবে সেই সংশোধন অবশ্যই পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিলের সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে গৃহীত হতে হবে।”
এই ধরনের বিধানগুলো প্রমাণ করে যে বিএনপির জন্য অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
আবারও ১৪ নভেম্বরের সভার মূল আলোচনায় ফিরে আসা যাক। সেই অনুষ্ঠানে, একজন বক্তা সতর্ক করছেন যে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে বিএনপি জনগণের কাছে ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে আশার কথা এই যে বিএনপি এখনই শুধু সংস্কারের কথা বলছে না, বরং ২০১৬ সাল থেকেই রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব উত্থাপন করে আসছে। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আশা জাগায় যে, বিএনপি তার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সত্যিই আন্তরিক।
বিএনপিকে মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ এখন স্বৈরাচারী শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের সন্ধিক্ষণে রয়েছে এবং এটা অর্জিত হয়েছে অগণিত মানুষের ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে। এই উত্তরণের শেকড় রয়েছে জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ত্যাগ এবং বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রামে। বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীকেও হত্যাকাণ্ড, গুম, কারাবরণ, নিপীড়ন এবং হাজার হাজার মামলার শিকার হয়েছে। অবশ্যই, এই ত্যাগ আরেকটি স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক শাসনের জন্য ছিল না।
(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত।)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


বিএনপির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ
রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার নিয়ে সামাজিক পরিসরে আলোচনা জরুরি
