পরীক্ষার হল মূলত পরীক্ষা দেওয়া ও নেওয়ার জায়গা। এক পক্ষ সেখানে পরীক্ষা দেয় এবং আরেক পক্ষ পরীক্ষা সৎ ও সঠিক উপায়ে দেওয়া হচ্ছে কিনা, তার দেখভাল করে। অথচ সেখানেই হচ্ছে এক পক্ষের হাসাহাসি ও আড্ডা দেওয়ার কাজ। এমন অভিযোগ এখন উঠলেও এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য কিনা – সেই আলোচনাও কিন্তু আছে। তবে কি এ দেশে পরীক্ষা ব্যবস্থাই মূল্যহীন হয়ে পড়ছে? নইলে আর শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা থোড়াই কেয়ার কেন হবে?
সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে একটি অভিযোগ করেছেন এক শিক্ষার্থী। তাঁর নাম মতিউর রহমান সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ষষ্ঠ সেমিস্টারের এই শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে শিক্ষকদের আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মতিউর গত সোমবার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর চিঠি দিয়েছেন এ বিষয়ে। এমনকি দর্শন বিভাগের সভাপতির কার্যালয়েও চিঠির অনুলিপি জমা দিয়েছেন তিনি।
গত রোববার পরীক্ষার হলে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা চিঠির মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের নজরে এনেছেন মতিউর। তাঁর বক্তব্য, সেদিন কলাভবনের পঞ্চম তলায় ষষ্ঠ সেমিস্টার ফাইনালের একটি কোর্সের পরীক্ষায় বসেছিলেন তিনি। বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরীক্ষা চলেছিল। মতিউরের আসন পড়ে সামনের দিকের দ্বিতীয় বেঞ্চে। তাঁর সামনেই পরীক্ষা হলের দায়িত্বে থাকা ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষক বসে ছিলেন। শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র বিলির পর থেকেই শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করেন। এবং তা নিচু স্বরে ছিল না। বরং শিক্ষার্থীদের মনযোগে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মতিউর বলেছেন, এ ব্যাপারে শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোনো লাভ হয়নি। তাঁরা তাঁদের হাসি-আড্ডায় কোনো বিরতি দেননি। উল্টো মতিউরকেই পেছনের দিকের বেঞ্চে গিয়ে বসে পরীক্ষা দিতে বলা হয়। আর চলতে থাকে শিক্ষকদের গল্প-গুজব।
রোববারে এভাবে পরীক্ষা দেওয়ার পরদিনই মূলত বোমা ফাটান মতিউর। চিঠি লিখে এ কথা জানিয়ে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে। সেই চিঠি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে। এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়।
কথা হলো, মতিউর এই ঘটনা সামনে নিয়ে এলেও এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রায় ১০ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করা এই অধমও একই ঘটনা হরহামেশা দেখেছেন। ওই মতিউর যেখানে পরীক্ষা দিতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, সেখানেই। তার অর্থ হলো, গত ১০-১৫ বছরেও এই অবস্থার পরিবর্তন খুব একটা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কতিপয় শিক্ষক তখনও পরীক্ষার হলকে তাঁদের শিক্ষক লাউঞ্জ মনে করেই দায়িত্ব পালন করতেন। হলের মাঝামাঝি সিট পড়লেই কেবল শিক্ষকদের আলাপের আওয়াজ থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেত। নইলে মেনে নেওয়া ছাড়া আর গতি কি?
কারণ, এসবের প্রতিবাদ জানালে খোদ বিভাগের শিক্ষকদের ব্যক্তি ও সমষ্টিগত রোষে পড়ার শঙ্কা থাকে ভালোমতোই। প্রথমত, শান্তিতে আর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকবে কিনা বা শিক্ষকদের কটাক্ষের মুখোমুখি হতে হবে কিনা, সেই আশঙ্কা ঘিরে ধরে। দ্বিতীয়ত থাকে পরীক্ষার মূল্যায়নে কুপ্রভাব পড়ার ভয়। যত যা-ই বলি না কেন, এ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকদের রোষাণলে পড়ার ভয় শিক্ষার্থীদের থাকেই। এই আস্থাহীনতার বিষয়টি অবশ্যই শিক্ষক সমাজের এবং এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থারই ব্যর্থতা। কারণ, এখানে একেবারে নিরপেক্ষ নিক্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন সব সময় করা হয় না। আর সে কারণেই শিক্ষকদের ‘গুড বুকে’ থাকার মানসিকতা এ দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এর চেইন রিঅ্যাকশনেই তৈরি হয় মুখ বুজে সহ্য করার মানসিকতা। তখনই কর্তৃপক্ষের আড্ডা-গল্প, হাহা-হিহি ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভঙ্গিতে চলতেই থাকে।
নিজের দেওয়া চিঠিতে পরীক্ষার হলের বেশ কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন মতিউর রহমান সরকার। যেমন, দায়িত্বরত শিক্ষকদের কেউ কেউ উচ্চস্বরে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। অথচ পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া ও ব্যবহার করা নিষেধ। সেই কথা পরীক্ষার হলে বড় বড় করে লেখাও থাকে। কিন্তু শিক্ষকদের বেলায়ই কি উল্টো নিয়ম? তাঁরা ব্যবহার তো করছেনই, সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সৃষ্টি করা অপব্যবহারও করছেন! আবার মতিউরের অভিযোগ, প্রায়ই নাকি পরীক্ষার হলে এমনটা হয়। তার মানে হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের মতো করে মোবাইল ব্যবহারেও সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে গেছে শিক্ষক সমাজ। জরিপ করলে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, হয়তো দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এমন চিত্র দেখা যাবে। যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাজের অধিকারবোধ ও তার প্রয়োগের মধ্যে বেজায় তফাত।
তাহলে কি শিক্ষক সমাজের অন্তর্ভুক্ত সবাই-ই এমন? অবশ্যই তা নয়। সেটি হলে পুরো ব্যবস্থাটিই একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ত। সেটি যখন এখনও দৃশ্যমান হয়নি, তার অর্থ হলো কিছু ন্যায়নিষ্ঠ শিক্ষক এখনও টিকে আছেন। তবে তাঁরা যে সংখ্যাগরিষ্ঠ নন, তা সহজেই অনুমেয়।
মতিউরের চিঠিটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকেই আলোচনার তুঙ্গে উঠেছে। সেখানেও পক্ষে-বিপক্ষে বেশ বিচার-সালিশ হয়েছে এবং হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এ কি নতুন কিছু? একটু মানিয়ে নিলেই হয়! কেউ বলছেন, আলোচিত হতেই এমন চিঠির জন্ম। কেউ আবার বলছেন, যার মনোযোগ থাকার, তার সব অবস্থাতেই থাকে! এ যেন অনেকটা যার নয়ে হয় না, তার নব্বইয়েও হবে না মনোভাব।
ধরুন, আপনার কোথাও কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাওয়া প্রয়োজন। আপনি হাতে সময় নিয়ে বের হয়েই পকেট অনুযায়ী রিকশা নিলেন। পথিমধ্যে বেহাল সড়কে রিকশার চাকা গেল, আর আপনিও আর পরিবহন না পেয়ে পা দুটিকে সম্বল করে অনেক দ্রুত হেঁটেও নির্দিষ্ট সময়ের বেশ পরে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হলেন। দেরি হওয়ায় আপনার কাজটিও হলো না। এখন আপনি দোষ দেবেন কাকে? রাস্তাকে? রিকশাকে? নাকি আপনার দুটি পাকে?
এ ক্ষেত্রে রাস্তার দোষ আপনি নিজের কাঁধে নিতেই পারেন। পা দুটোকে আচ্ছামতো বকাও দিতে পারেন। এও বলে নিজেকে দোষ দিতে পারেন যে, কেন নির্দিষ্ট সময়ের ঘণ্টাদশেক আগে রওনা দিলেন না! কিন্তু শেষতক তা নিজের প্রতি একটু কি অবিচার হয়ে যাবে না?
আসলে কিছু অর্জন করতে হলে সহায়ক পরিবেশ সবারই লাগে। হ্যাঁ, বলতেই পারেন যে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কি ল্যাম্পপোস্টের নিচে পড়ে বিদ্যার জাহাজ হননি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সেসব ব্যতিক্রম বিষয়। ব্যতিক্রম কখনও উত্তম উদাহরণ হয় না। কারণ, সব ব্যক্তির সামর্থ্য ও ক্ষমতা এক রকম হয় না। তাই সবার বিষয়টি মাথায় নিয়ে একটি ন্যূনতম মান পরিবেশ বজায় রাখতে হয়। যাতে করে দুর্বল-সবল সবাই প্রাথমিকভাবে কিছুটা একইরকম সুবিধা পায়। এর পর যোগ্যতায় যে যতটা এগোতে পারে, এগোবে।
আমরা পরীক্ষার হলে সেই মৌলিক সুবিধাটি নিশ্চিতেই ব্যর্থ হচ্ছি আসলে। এখানটাতেই আমাদের ঘাটতি। শুধু শিক্ষক সমাজকে শুধরেই আবার সাফল্য আসবে না। এর জন্য পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটিতেই গুণগত পরিবর্তন দরকার এবং তাতে শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করা প্রয়োজন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুপিরিওর-ইনফিরিওর সম্পর্কের অবসান হওয়া এ ক্ষেত্রে অতীব প্রয়োজন। এ ধরনের সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে চলতে থাকলে আদতে কোনো কিছু পরিবর্তন হওয়ার নয়। এক মতিউরের চিঠি পরীক্ষার হলের পরিবেশে কতটা পরিবর্তন আনবে বা আদৌ আনতে পারবে কিনা, তা দেখতে অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই। ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করাই যায়। কথায় তো আছেই, আশায় বাঁচে চাষা!
অর্ণব সান্যাল: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



