জোসে মরিনিও, তুরস্কের লিগ, রেফারি। শব্দগুলো একসঙ্গে জুড়ে দিন, দেখবেন পর্তুগিজ কোচ কীভাবে কোন রেফারিকে সমালোচনায় ধুয়ে দিয়েছেন, সেসবের ফিরিস্তি চলে আসবে। সেসবের জন্য জরিমানা-শাস্তিও কম হয়নি তাঁর! এমনকি নিজের দল জেতার পরও রেফারির সমালোচনা করতে ছাড় দেননি গত ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের ক্লাব ফেনেরবাচেতে যোগ দেওয়া মরিনিও।
সেই মরিনিওই গত পরশু বিরল এক অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছেন রেফারিদের। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে রেফারিকে ভাসিয়েছেন প্রশংসায়। এমনকি ম্যাচের পর রেফারিদের রুমে গিয়েও তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন বলে জানালেন! তা-ও কোন দিনে? যেদিন লিগে প্রতিদ্বন্দ্বী বেসিকতাসের বিপক্ষে ডার্বিতে ১-০ গোলে হেরে শিরোপার দৌড়ে আরেকটু পিছিয়ে পড়েছে মরিনিওর ফেনেরবাচে!
অ্যালেক্স অক্সলেইড-চেম্বারলেইনের গোলে গত পরশু বেসিকতাস নিজেদের মাঠে হারায় ফেনেরবাচেকে। টানা জয়ের ধারা পাঁচ ম্যাচেই থেমে যেতে দেখা এই হারের পর লিগের পয়েন্ট তালিকায় মরিনিওর দল দুই নম্বরেই থেকে গেছে, তবে শিরোপাদৌড়ে ধাক্কা খেয়েছে। গতকাল লিগ শীর্ষে থাকা গালাতাসারাই (১৪ ম্যাচে ৩৮ পয়েন্ট) নিজেদের ম্যাচ জেতায় ফেনেরবাচের (১৪ ম্যাচে ৩২ পয়েন্ট) চেয়ে তারা এগিয়ে গেছে ৬ পয়েন্টে।
অথচ গত পরশু এমন হারের পরও রেফারি মেহমেত তুর্কমেনকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন মরিনিও। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ফেনেরবাচে কোচ বললেন, ‘শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর সব ম্যাচেই আমরা যদি এমন রেফারি পাই, তাহলে এই লিগটা একটা সুন্দর লিগ হয়ে উঠবে, যারা শেষ পর্যন্ত জিতবে তারা যোগ্য দল হিসেবেই জিতবে।’
রেফারিদের সমর্থন করাও দরকার জানিয়ে এরপর মরিনিও বললেন, ‘রেফারিদেরও সমর্থন দরকার হয়। আমিই সমর্থনটা জানানো প্রথম ব্যক্তি – এমন কথা বলতে চাই না, তবে আমার মনে হয় না এই দেশে নিজেদের হারের পর খুব বেশি মানুষ রেফারির প্রশংসা করে।’
সংবাদ সম্মেলনের আগে রেফারিদের ব্যক্তিগতভাবেও ধন্যবাদ জানিয়ে আসার কথাও জানিয়েছেন মরিনিও, ‘এখানে আসার আগে আমি রেফারিদের ড্রেসিংরুমে ছিলাম, রেফারিদের অভিবাদন জানাচ্ছিলাম। আমার মনে হয়েছে তিনি খুব ভালো করেছেন, (ম্যাচজুড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে) ধারাবাহিক ছিলেন। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ঠিক রেখেছেন তিনি। আমরা হেরেছি কারণ ফুটবল এমনই, এখানে (রেফারির) কোনো ভুল দেখি না আমি।’
গত পরশুর সংবাদ সম্মেলনটির অডিও ক্লিপ চাইলে তুরস্কের লিগের রেফারিরা সংগ্রহে রাখতে পারেন, এ যে বিরল এক ঘটনা! মরিনিও তুরস্কে যাওয়ার পর থেকেই যে বারেবারে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন রেফারিদের তুলোধুনো করে!
গত মাসেই তো, ত্রাবজনস্পোরের বিপক্ষে তাঁর দলের ৩-২ গোলে জয়ের পরও তাঁদের বিপক্ষে ভিএআরে দুই পেনাল্টি দেওয়ায় সংবাদ সম্মেলনে টানা ৮ মিনিটের বক্তব্যে ভিএআরের সমালোচনা করেছেন মরিনিও। বলেছিলেন, মাঠের আসল রেফারি ছিলেন ‘ছোট বাচ্চা’, ভিএআর রেফারিই ম্যাচের মূল রেফারি হয়ে উঠেছিলেন। ফেনেরবাচের লোকেরা তাঁকে প্রস্তাব দেওয়ার সময় তুরস্কের রেফারিংয়ের এমন দশার কথা জানায়নি জানিয়ে বললেন, ‘আমি ফেনেরবাচের লোকদেরই দোষ দেব। তাঁরা আমাকে পুরো সত্যিটা বলেনি, বললে আমি এখানে (ফেনেরবাচেতে) আসতামই না!’ এমন মন্তব্যের জন্য পরে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয় তাঁকে।
এর আগে অক্টোবরে ইউরোপা লিগে তাঁরই সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ১-১ গোলে ড্র ম্যাচে ফেনেরবাচের পক্ষে পেনাল্টি না দেওয়ার প্রতিবাদের পর তাঁকে লাল কার্ড দেখানো রেফারির উদ্দেশে স্বভাবসুলভ শ্লেষে মরিনিও বলেছিলেন, ‘আমি তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছি, কারণ তিনি অবিশ্বাস্য! ঘন্টায় ১০০ মাইল বেগে এগোনো ম্যাচে তাঁর এক চোখ পেনাল্টির পরিস্থিতির দিকে ছিল, আরেক চোখ ছিল আমার আচরণের দিকে। তিনি তো আমাকে ব্যাখ্যায় এটাই বলেছেন, সেটা হলে তিনি তো বিশ্বের সেরা রেফারিদের একজন!’
এর আগে সেপ্টেম্বরে আন্তালিয়াস্পরের বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়ের ম্যাচে রেফারি অফসাইডের কারণে ফেনেরবাচের গোল বাতিল করার পর মরিনিও ক্যামেরার সামনে ল্যাপটপ মেলে ধরেন, যেখানে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, অফসাইডের সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল না। জবাবে তাঁকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি!
সেই মরিনিও রেফারির প্রশংসা করছেন, এটা রেফারিদেরও সম্ভবত হজম করতে সময় লাগবে!



