বার্সেলোনা যে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে, এটা নিয়ে খুব বেশি সংশয় ছিল কি? গত সপ্তাহে শেষ ষোলোর প্রথম লেগে বেনফিকার মাঠে প্রায় ৭০ মিনিট একজন কম নিয়ে খেলেছে বার্সা। তারপরও পর্তুগিজ ক্লাবটির মাঠ থেকে ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে ফিরেছিল হানসি ফ্লিকের দল।
ঘরের মাঠে বেনফিকা যেখানে ১০ জনের বার্সাকেই আটকাতে পারেনি, সেখানে ফিরতি লেগে কাতালান ক্লাবটির মাঠে গিয়ে যে খুব বেশি সুবিধা আদায় করতে পাবে না, সেটা অনুমিতই ছিল। হয়েছেও সেটাই। গতকাল মঙ্গলবার রাতে স্তাদিও অলিম্পিক লুইস কোম্পানিতে ফিরতি লেগে বেনফিকাকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়েছে বার্সা। তাতে দুই লেগ মিলিয়ে ৪-১ ব্যবধানের অগ্রগামিতায় কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে কাতালান ক্লাবটি।
বার্সার হয়ে রাফিনিয়া দুটি ও লামিন ইয়ামাল অন্য গোলটি করেছেন। এতে দুজনেরই নাম উঠেছে রেকর্ড বইয়ে। চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসে ব্রাজিল তারকাদের মধ্যে নেইমার-কাকা-রিভালদোদের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন রাফিনিয়া। আর ইউরোপ সেরার এ প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে একই ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্টের কীর্তি গড়েছেন ইয়ামাল। এর মধ্যে গোলটি তো যেন লিওনেল মেসিকেই মনে করিয়ে দিয়েছে!
বার্সা-বেনফিকা ম্যাচের চারটি গোলই হয়েছে প্রথমার্ধে। ম্যাচের ১১তম মিনিটে মধ্যমাঠের কিছুটা সামনে থেকে বল পেয়ে এগোতে থাকেন ইয়ামাল। এরপর প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারকে রীতিমতো বোকা বানিয়ে বক্সের ভেতর ঢুকে বাঁ পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে অন্য প্রান্তে পাস দেন স্প্যানিশ তরুণ। অনেকটা অরক্ষিত থাকা রাফিনিয়া এগিয়ে গিয়ে দারুণ এক ভলিতে বেনফিকার জালে বল জড়ান।
জবাব দিতে খুব বেশি দেরি করেনি বেনফিকাও। দুই মিনিট পরেই কর্নার থেকে হেড করে বেনফিকাকে ম্যাচে ফেরান ওতামেন্দি। ২০১৭ সালের নভেম্বরের পর এই প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল পেলেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার।
বেনফিকা ম্যাচে ফিরলেও দ্রুতই আবার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় বার্সা। টানা আক্রমণ আর পাসের পর পাস দিয়ে পর্তুগিজ ক্লাবটিকে রীতিমতো অসহায় বানিয়ে ফেলেন পেদ্রি-ফ্রেঙ্কি দি ইয়ংরা। এর মধ্যে মাচের ২৭ মিনিটে দৃষ্টিনন্দন এক গোল করে বার্সাকে এগিয়ে দেন ইয়ামাল।
রাফিনিয়া যখন বলটা বাড়িয়েছিলেন, সেটি বাঁ প্রান্তের টাচ লাইনের দিকে যাচ্ছিল। অনেকটা দৌড়ে গিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন ইয়ামাল। এরপর বেনফিকার এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সের ভেতর দিয়ে ঢুকে পজিশন তৈরি করে নিয়ে বক্সের বাইরে গিয়ে বাঁ পায়ের বাঁকানো এক শট নেন তরুণ এ তারকা। বেনফিকা গোলকিপার আনাতোলি ত্রুবিন অনেকটা ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি। দূরের পোস্ট দিয়ে বল আশ্রয় নেয় জালে। যেন সেরা সময়ের লিওনেল মেসির কোনো গোল!
দারুণ এক অ্যাসিস্টের পর অনেকদিন চোখে লেগে থাকার মতো এক গোল। প্রশ্ন হতে পারে, ইয়ামালের গোল নাকি অ্যাসিস্ট, কোনটা বেশি দর্শনীয় ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব বেশি সহজ না হলেও গতকালের গোল-অ্যাসিস্টে দারুণ একটা কীর্তিতে নাম উঠেছে ইয়মালের। স্প্যানিশ এ তরুণ তারকাই এখন চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে (১৭ বছর ২৪১ দিন) একই ম্যাচে গোল আর অ্যাসিস্ট করা ফুটবলার। আগের রেকর্ডটি ছিল ব্রিল এমবোলোর। বাসেলের হয়ে ২০১৪ সালে ১৭ বছর ২৬৩ দিন বয়সে এ কীর্তি গড়েছিলেল তিনি।
বিরতির তিন মিনিট আগে তৃতীয় গোলটি পেয়ে যায় বার্সা। এবার আলেহান্দ্রো বালদের থ্রু থেকে ম্যাচের স্কোরলাইন ৩-১ করেন রাফিনিয়া।
চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে এটি রাফিনিয়ার ১১তম গোল। আর তাতেই ব্রাজিলিয়ানদের হয়ে রেকর্ডটা নিজের করে নিলেন এ উইঙ্গার। ইউরোপ সেরার মঞ্চে এর আগে কখনোই এক মৌসুমে ১০ গোলের বেশি করতে পারেননি আর কেউ। ১০টি করে গোল আছে কাকা (২০০৬-০৭, রিভালদো (১৯৯৯-০০), ইয়ারদেল (১৯৯৯-০০), রবের্তো ফিরমিনো (২০১৭-১৮) ও নেইমারের (২০১৪-১৫)।
রাফিনিয়ার রেকর্ডগড়া ওই গোলের পর ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় বার্সা। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য আর গোল করায় মনোযোগ দেননি লেভানদফস্কি, রাফিনিয়ারা। তাতে শেষ পর্যন্ত একই স্কোরলাইন নিয়েই মাঠ ছাড়ে ফ্লিকের দল। আজ রাতে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড আর লিলের ম্যাচে নির্ধারিত হবে কোয়ার্টার ফাইনালে কে হবে বার্সার প্রতিপক্ষ।
এর আগে গত শনিবার রাতে লিগে ওসাসুনার বিপক্ষে ম্যাচের কিছু সময় আগে বার্সার মূল দলের চিকিৎসক কার্লেস মিনারো গার্সিয়া মারা যান। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সেদিন বার্সার অনুরোধে ম্যাচটা স্থগিত করেছিল লা লিগা কর্তৃপক্ষ। গতকাল চ্যাম্পিয়নস লিগে জয়ের পর রাফিনিয়া জানিয়েছেন, জয়টা উৎসর্গ করেছেন সদ্য প্রয়াত চিকিৎসককেই। ব্রাজিল উইঙ্গারের ভাষায়, ‘আমরা কার্লেসের স্মরণে এ ম্যাচটা আরও বেশি করে জিততে চেয়েছিলাম।’
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে একই সুরে গলা মিলিয়েছেন বার্সা কোচ ফ্লিক, ‘ম্যাচে আগে আমি বলেছিলাম, কার্লেসের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে চাই। ম্যাচে যা হয়েছে, আমার মনে হয়, এ জয়টা তাঁর জন্য। কার্লেস দলের মধ্যে একটা জায়গা রেখে গেছেন।’



