ফুটবলে প্রচলিত একটি কথা আছে— ‘আক্রমণ ম্যাচ জেতায়, আর রক্ষণ এনে দেয় শিরোপা।’ চলতি বিশ্বকাপে আক্রমণ ও রক্ষণের প্রসঙ্গ তুলেল দুটি দলের নাম সবার আগে মাথায় আসে- ফ্রান্স ও স্পেন। মজার বিষয়, টুর্নামেন্টের প্রথম সেমিফাইনালে আজ মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও স্পেন।
অপটার সুপার কম্পিউটারের হিসাব অনুসারে, এবারের বিশ্বকাপ জেতার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে এ দুটি দলই। টুর্নামেন্টের অন্য দুই সেমিফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার তুলনায় ফ্রান্স ও স্পেনের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু সেই দুই দলের যেকোনো এক দলকে আজকে বিদায় নিতে হবে।
ডালাসে সেমিফাইনালে ওঠার পথে স্পেন আর ফ্রান্সের কৌশলটা ছিল ভিন্ন। স্পেন যেখানে নিজেদর সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে শক্তিশালী রক্ষণ দিয়ে। ফ্রান্স সেখানে ভরসা রেখেছে তারকায় ঠাসা আক্রমণভাগের ওপর। আজ রাতে হতে যাওয়া সেমিফাইনালটিকে তাই অনায়াসেই ফ্রান্সের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণের সঙ্গে স্পেনের অটল রক্ষণের লড়াই বলাই যায়।
একনজরে দেখে নেওয়া যাক, দুই দলের শক্তির জায়গাটা কোথায়-
স্পেনের ‘দুর্ভেদ্য দেয়াল’
স্প্যানিশ ফুটবল বললেই সাধারণত আক্রমণাত্মক পাসিং ফুটবলের কথাই মনে আসে। কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এবার রক্ষণকেও নিজেদের বড় অস্ত্র বানিয়েছে।স্পেন এখনো তাদের ঐতিহ্যবাহী পাসিং ফুটবল ধরে রেখেছে। এবারের বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৫৯৮টি পাস সম্পন্ন করেছে তারা, যা আর্জেন্টিনার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে বল দখলেও সবার ওপরে—গড়ে ৬৬ শতাংশ।
তবে শুধু আক্রমণ নয়, প্রতিপক্ষকে সুযোগ না দেওয়ার ক্ষেত্রেও অসাধারণ স্পেন। ছয় ম্যাচ শেষে স্পেনের বিপক্ষে প্রতিপক্ষের অন-টার্গেট শট মাত্র সাতটি। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে গড়ে ১.১৭টি করে শট গোলমুখে এসেছে তাদের বিপক্ষে। ১৯৬৬ সালের পর পুরুষদের বিশ্বকাপে এটি সবচেয়ে কম।
শুধু শট নয়, প্রতিপক্ষকে ভালো সুযোগ তৈরি করতেও দেয়নি স্পেন। এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে প্রতি প্রতিপক্ষের প্রত্যাশিত গোল (xG) ম্যাচপ্রতি মাত্র ০.৩১ । ১৯৬৬ সালের পর এই রেকর্ডে তাদের সঙ্গে সমান অবস্থানে আছে শুধু ১৯৯০ বিশ্বকাপের উরুগুয়ে।
প্রতিপক্ষের শটগুলোর গড় xG মাত্র ০.০৫, যা এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম এবং ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বনিম্ন।
রক্ষণ পুরো দলের কাজ হলেও কয়েকজন খেলোয়াড় আলাদাভাবে নজর কেড়েছেন। স্পেনের রক্ষণ সামলাচ্ছেন আয়মেরিক লাপোর্তে। তার ১১টি ইন্টারসেপশন রয়েছে। ফ্রান্সের উপামেকানোই শুধু এর চেয়ে বেশি (১২টি) ইন্টারসেপশন করতে পেরেছেন।
গোলপোস্টের নিচে উনাই সিমনও দুর্দান্ত। স্পেনের রক্ষণ সাধারণত অনেক ওপরে উঠে চাপ তৈরি করে, তখন পেছনের বল সামলাতে কিছুটা এগিয়ে যেতে হয় সিমনকে। এবারের বিশ্বকাপে মাত্র তিনজন গোলকিপার সিমনের চেয়ে বেশি ‘কিপার সুইপ’ করেছেন।
অন্যদিকে অধিনায়ক রদ্রিও চোট কাটিয়ে নিজের সেরা ছন্দে ফিরেছেন। তিনি মোট ১৮টি ট্যাকল করেছেন, যা বিশ্বকাপে তৃতীয় সর্বোচ্চ। পাশাপাশি ৩২ বার বলের দখল নিয়েছেন তিনি।
কোচ দে লা ফুয়েন্তে রক্ষণভাগেও ধারাবাহিকতা রেখেছেন। উনাই সিমন, লাপোর্তে, পাও কুবার্সি ও মার্ক কুকুরেয়া—চারজনই স্পেনের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে শুরু করেছেন। আর এই বোঝাপড়াই তাদের রক্ষণকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে ফ্রান্সের বিপক্ষে এবারই তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে।
ফ্রান্সের অস্ত্র আক্রমণভাগ
বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই কাগজে-কলমে ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে ভয়ংকর মনে হচ্ছিল। মাঠেও সেটিই প্রমাণ করেছে দিদিয়ের দেশঁর দল। এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে ১৬ গোল করেছে ফ্রান্স।
আক্রমণভাগের পরিসংখ্যানও দুর্দান্ত। ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স এখন পর্যন্ত ৪৭টি শট লক্ষ্যে রেখেছে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর, আর কোনো বিশ্বকাপে এত বেশি অন-টার্গেট শট নেয়নি তারা। প্রতি ম্যাচে গড়ে ৭.৮টি অন-টার্গেট শট— ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে যা সর্বোচ্চ।
এছাড়া এবারের টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের xG বা প্রত্যাশিত গোলের হারও সবচেয়ে বেশি। তারা মোট ১৪.৩ xG তৈরি করেছে, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা আর্জেন্টিনার চেয়ে অন্তত ১.৬ বেশি।
এর পেছনে বড় কারণ দলের অসাধারণ আক্রমণভাগ। সামনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। আবারও দুর্দান্ত এক বিশ্বকাপ কাটাচ্ছেন তিনি। ৮ গোল করে ২০২৬ গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসির সঙ্গে লড়াই করছেন ফ্রান্স অধিনায়ক।
শুধু গোল নয়, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এমবাপ্পে। তিনি ১৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন এবং তিনটি অ্যাসিস্টও করেছেন। বর্তমান বালন দ’র জয়ী উসমান দেম্বেলের সঙ্গে এমবাপ্পের বোঝাপড়াও দুর্দান্ত।
বিশ্বকাপে এমবাপ্পে ও দেম্বেলে একে অপরের জন্য ১৯টি সুযোগ তৈরি করেছেন। এর মধ্যে এমবাপ্পে দেম্বেলের জন্য ১০টি, আর দেম্বেলে এমবাপ্পের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন ৯টি।
এমবাপ্পে-দেম্বেলের পাশাপাশি আলাদাভাবে নজর কেড়েছেন মাইকেল অলিসে। বায়ার্ন মিউনিখ তারকাই যেন এবার ফ্রান্সের আক্রমণভাগের সৃজনশীল ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। ওলিসের দুর্দান্ত পাসিং ক্ষমতা মুহূর্তেই ভেঙে দিচ্ছে প্রতিপক্ষের রক্ষণ। ওলিসে এখন পর্যন্ত ৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন, যা টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অলিসে এখন পর্যন্ত পাঁচটি অ্যাসিস্ট করেছেন, যা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে জার্মানির থমাস হ্যাসলারের পর এক বিশ্বকাপে ৫ অ্যাসিস্ট করা প্রথম ফুটবলার অলিসে।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগের এখানেই শেষ নয়। বারকোলা ও দেজিরে দুয়ে নিয়মিত সুযোগ না পেলেও দুজনে মিলে ৫টি গোলে অবদান রেখেছেন। এর বাইরে রায়ান শেরকি খেলেছেন মোটে ৫০ মিনিট। আকলিউশ ও থুরাম মিলিয়ে মাঠে ছিলেন ১০ মিনিটেরও কম।
এখন প্রশ্ন হলো, ফ্রান্সের তারকায় ঠাসা আক্রমণভাগের সামনে কি স্পেনের রক্ষণ দেয়াল টিকে থাকতে পারবে? উত্তর মিলবে আজ রাতে।



