বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ট্রফি জয়ের পাশাপাশি বিশ্বসেরা তারকাদের ব্যক্তিগত লড়াইটাও কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। আচ্ছা একবার ভাবুনতো দুই বা তিনজন খেলোয়াড় যদি টুর্নামেন্টে সমান সংখ্যক গোল করেন, তবে গোল্ডেন বুট কার হাতে উঠবে? কিংবা ফাইনালের ঠিক আগ মুহূর্তে কীভাবে ঠিক করা হয় টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় বা সেরা গোলরক্ষক কে?
অনেকেরই ধারণা, এটা কেবলই গোল কিংবা ক্লিনশিটের খেলা। কিন্তু না, ফিফার এই ব্যক্তিগত পুরস্কার নির্ধারণের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু জটিল সমীকরণ এবং একদল মাস্টারমাইন্ড। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন গ্লাভস বিজয়ী কীভাবে নির্ধারিত হয়?
বিশ্বকাপে কার হাতে উঠে গোল্ডেন বুট?
শুরু করা যাক 'গোল্ডেন বুট' পুরস্কার দিয়ে। নিয়মটা পরিষ্কার, পুরো টুর্নামেন্টে যিনি সবচেয়ে বেশি গোল করবেন, তিনিই হবেন গোল্ডেন বুট বিজয়ী। কিন্তু একাধিক খেলোয়াড়ের গোলসংখ্যা যদি সমান হয়ে যায়? তখনই আসে ফিফার 'টাই-ব্রেকার' সমীকরণ।
টাই-ব্রেকারে প্রথম নিয়মটি হলো অ্যাসিস্ট বা গোল করানোর ক্ষেত্রে কে এগিয়ে সেটি দেখা। অর্থাৎ, গোলসংখ্যা সমান হলে যিনি সতীর্থদের দিয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করিয়েছেন তাঁর হাতেই উঠবে এই সোনালী বুট।
কিন্তু গোল এবং অ্যাসিস্ট দুটোই যদি সমান হয়, তখন কী হবে? এবারে আসবে দ্বিতীয় টাই-ব্রেকারের সমীকরণ। এক্ষেত্রে দেখা হবে, পুরো টুর্নামেন্টে কে কত মিনিট খেলেছেন। যে খেলোয়াড় মাঠে সবচেয়ে কম সময় খেলে সমপরিমাণ গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন, ফিফা তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করবে।
অর্থাৎ, মাঠে কম সময় থেকে বেশি কার্যকর থাকাকেই এখানে পুরস্কৃত করা হয়। গোল্ডেন বুটের পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার জন্য রয়েছে সিলভার ও ব্রোঞ্জ বুট।
কারা আছেন গোল্ডেন বুটের দৌড়ে?
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল শেষ হওয়ার পর সেমিফাইনালের দলগত নানা সমীকরণের মাঝে গোল্ডেন বুটের লড়াইটাও দারুনভাবে জমে উঠেছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মতোই গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। দুজনেরই গোলসংখ্যা এখন পর্যন্ত ৮টি।
তবে ফিফার অফিশিয়াল টাই-ব্রেকার নিয়ম অনুযায়ী, ৩টি অ্যাসিস্ট নিয়ে এই মুহূর্তে সামান্য এগিয়ে আছেন এমবাপ্পে, যেখানে মেসির অ্যাসিস্ট ২টি। তাছাড়া মিনিটের হিসেবেও মেসির চেয়ে কম সময় মাঠে থেকেছেন এমবাপ্পে।
তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা নরওয়ের আর্লিং হলান্ড ৭ গোল নিয়ে ইতোমধ্যেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছেন। তবে চমক দিতে পারেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম, যাদের দু’জনের ঝুলিতেই রয়েছে ৬টি করে গোল আর ১টি করে অ্যাসিস্ট। এছাড়া ৫টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আছেন ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলেও।
'গোল্ডেন বল' বিজয়ী নির্ধারণ হয় যেভাবে
এবারে আসা যাক টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার 'গোল্ডেন বল' বিজয়ী নির্ধারণের নিয়মে। গোল্ডেন বুটের মতো এটি কিন্তু শুধুই গোল আর অ্যাসিস্টের গাণিতিক হিসাব নয়। এটি নির্ধারিত হয় ফিফার একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল এবং সাংবাদিকদের ভোটের মাধ্যমে।
টুর্নামেন্টের নকআউট পর্ব চলাকালীন ফিফার বিশেষ টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ সেরা খেলোয়াড়দের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা বা শর্টলিস্ট তৈরি করে। এরপর বিশ্বকাপ কভার করা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের ভোটে এই তালিকা থেকেই একজন সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
ভোটদানের এই প্রক্রিয়াটি শেষ হয় বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছুটা আগে। আর এ কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, রানার্সআপ দলের একজন অনন্য পারফর্মারও গোল্ডেন বল জিতে নেন। এমনটাই আমরা দেখেছি ২০১৪ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে লুকা মদরিচের ক্ষেত্রে।
সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে কারা?
গোল্ডেন বুটের মতোই গোল্ডেন বলের দৌড়েও একাধিক প্রতিযোগী রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই ফেভারিট হিসেবে নাম রয়েছে লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের। তবে এই দুই মহাতারকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত আছেন স্পেনের ১৮ বছর বয়সী বিষ্ময় বালক লামিন ইয়ামাল। ইনজুরি কাটিয়ে ফেরার পর এখনও নিজের সেরা ফর্মে পারফর্ম করতে না পারলেও ইয়ামালের জাদুকরী ড্রিবলিং স্পেনকে ইতোমধ্যেই সেমিফাইনালে তুলেছে।
এছাড়াও ফ্রান্সের সাফল্যে নেপথ্যের কারিগর হিসেবে মাইকেল অলিসে টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ৫টি অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বলের দৌড়ে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছেন। ঠিক যেমনটা আছেন স্পেনের মিকেল ওয়্যারসাবাল, ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে এবং ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম।
গোল্ডেন গ্লাভস কার জন্য, কীভাবে নির্ধারিত হয়?
ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিনের স্মরণে ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষককে দেওয়া হয় লেভ ইয়াসিন অ্যাওয়ার্ড, যা বর্তমানে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ নামেও পরিচিত। এই পুরস্কারের বিজয়ী নির্ধারণে কোনো মিডিয়া বা পাবলিক ভোটিং কাজ করে না। গোল্ডেন গ্লাভস কে পাবেন, তা সম্পূর্ণ এককভাবে নির্ধারণ করে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ।
টুর্নামেন্টে একজন গোলরক্ষক কতটি ক্লিনশিট (ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়া) রেখেছেন বা পেনাল্টি সেভ করেছেন, কেবলমাত্র তার ভিত্তিতেই বিজয়ী নির্ধারণ করে না এই বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এক্ষেত্রে একজন গোলরক্ষক পুরো টুর্নামেন্টে কতটা সাহসিকতার সাথে নিজের রক্ষণভাগ পরিচালনা করেছেন, গোলপোস্টের নিচে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, এবং নকআউট পর্বে প্রচণ্ড চাপের মুহূর্তে দলের ত্রাতা হতে পেরেছেন কিনা- এই সবগুলো বিষয় নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে গোল্ডেন গ্লাভস বিজয়ী ঘোষণা করে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ।
গোল্ডেন গ্লাভস জয়ের দৌড়ে আছেন চার সেমি-ফাইনালিস্ট দলের গোলরক্ষকই। অর্থাৎ, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ, স্পেনের উনাই সিমন, ফ্রান্সের মাইক মাইগনান এবং ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড- যে কারো হাতেই উঠতে পারে এবারের আসরের গোল্ডেন গ্লাভস।
ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ
ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ বা টিএসজি হচ্ছে ১০ জন বিশেষজ্ঞের একটি প্যানেল। ফুটবলের কিংবদন্তিতুল্য ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গারের নির্দেশনায় ও তত্ত্বাবধানে এবং সাবেক সুইস গোলরক্ষক পাসকাল জুবেরবুলারের নেতৃত্বে এই প্যানেলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান, গিলবার্তো সিলভা ও পাবলো জাবালেতার মতো সাবেক বিশ্বসেরা ফুটবলাররা।
হাই-টেক ডেটা, সিক্স-অ্যাঙ্গেল ট্যাকটিক্যাল ক্যামেরা আর আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই প্যানেল নিখুঁতভাবে প্রতিটি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করেন এবং গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন গ্লাভস বিজয়ী নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
গত মে মাসে ফিফা এবারের বিশ্বকাপের জন্য ১০ সদস্যের টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ ঘোষণা করে। এ তালিকায় আছেন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আছেন পাসকাল জুবেরবুলার, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান, গিলবার্তো সিলভা, পাবলো জাবালেতা, টবিন হিথ, আরণ উইন্টার, অটো আডো, পাওলো ওয়ানচোপ, জন ডাল টমাসন এবং মাইকেল ও'নিল।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে, বিশ্বকাপ শিরোপার পাশাপাশি এই ব্যক্তিগত পুরস্কারের সমীকরণগুলো কোনো অংশেই কম রোমাঞ্চকর নয়। তাই কোন দল বিশ্বকাপ জিতবে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেমন সমর্থকদের মাঝে বিতর্ক চলছে, তেমনি ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় আছে গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল আর গোল্ডেন গ্লাভসের মতো ব্যক্তিগত পুরস্কারও।



