হোটেলে দেশি কোচের সঙ্গে হাতাহাতির পর পুলিশ ডাকলেন নিজেই! তারপর ফেসবুকে কান্নাভেজা ভিডিও বার্তায় বললেন, ‘আমি নিরাপদ নই!’ আর এরপরই ছড়িয়ে পড়ল খবর— বরখাস্ত করা হয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ জেরার্ড জোনসকে!
কিন্তু আসল ঘটনা কী? বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ জেরার্ড জোনসের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে, আর উজবেকিস্তান যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে কেন এত ধোঁয়াশা? সত্যিই কি বরখাস্ত করা হয়েছে জোন্সকে? নাকি এর পেছনে আছে অন্য কোনো রহস্য!
প্রেক্ষাপট— শুরুটা কোথায়?
গত জুন মাসে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দলের দায়িত্ব নেন ইংলিশ কোচ জেরার্ড জোনস। বাফুফের সঙ্গে তার চুক্তি হয় দুই বছরের জন্য। লক্ষ্য ছিল একটাই—আসন্ন এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ভালো কিছু করা। প্রস্তুতিও শুরু হয় যশোরে, সবকিছু ছিল স্বাভাবিক।
প্রথম ধাক্কা — বেতন-বিতর্ক
কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার দেড় মাসের মাথায়, ১০ আগস্ট হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা পোস্ট দিয়ে আলোচনায় চলে আসেন জোনস। দাবি করেন— বেতন পাচ্ছেন না, পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতে পারছেন না, এমনকি নিজের জীবন নিয়েও শঙ্কিত।
বাফুফে পাল্টা জানায়— চুক্তি অনুযায়ী ঠিক সময়েই তার অ্যাকাউন্টে বেতন পাঠানো হয়েছে। কিছুক্ষণ পর জোনস নিজেও স্বীকার করেন যে টাকা পেয়েছেন, তবে দাবি করেন— তার ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে, আর ঢাকায় নাকি তাকে ঘিরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এখানেই প্রথমবার প্রশ্ন ওঠে—আসল সমস্যাটা কী, শুধুই বেতন, নাকি অন্য কিছু? এই প্রথম ধাক্কাতেই তাঁকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় ফুটবল অঙ্গনে।
টিম হোটেলে হাতাহাতি: কী ঘটেছিল?
এরপর আসে সবচেয়ে বড় মোড়। গত বুধবার টিম হোটেলে জেরার্ড জোনস আর সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়, যা একপর্যায়ে গড়ায় ধাক্কাধাক্কিতে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে জোনস নিজেই ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ঘটনা দেশের ফুটবল অঙ্গনে বেশ বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করে। ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসে বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটি। তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দলের ম্যানেজার সামিদ কাশেমও জানান, কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
জোনসের ভিডিও বার্তা- একই সঙ্গে দুই রকম কথা
সোমবার রাতে ফেসবুকে আবেগঘন এক ভিডিও বার্তা দেন জোনস। সেখানে দাবি করেন, কর্মক্ষেত্রে তিনি শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন, আত্মরক্ষার জন্যই পুলিশ ডাকতে হয়েছিল, এবং তিনি এখনও নিরাপদ বোধ করছেন না।
কিন্তু একই ভিডিওতে তিনি আবার সহকারী কোচের সঙ্গে বিরোধের কথা অস্বীকার করেন, বলেন তাদের সম্পর্ক নাকি চমৎকার। একদিকে হামলার অভিযোগ, অন্যদিকে সম্পর্ক ভালো থাকার দাবি— এই দুই বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশে পিটার বাটলার, থমাস ডুলি কিংবা মার্টিন ফ্রেডরিকের মতো আরও বিদেশি কোচ কাজ করছেন বহুদিন ধরে, তারা কখনো এমন নিরাপত্তা-শঙ্কার কথা বলেননি।
বরখাস্তের গুঞ্জন বনাম জোনসের অস্বীকার
এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে—জোনসকে বরখাস্ত করেছে বাফুফে। কিন্তু বাফুফে থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। উল্টো জোনস নিজের ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় এই খবর সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ফেডারেশন থেকে তাকে এমন কিছু জানানো হয়নি, এবং প্রশ্ন তোলেন—কে বা কারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই তথ্য ছড়াচ্ছে।
এখন কী হতে যাচ্ছে
সূত্র বলছে, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জোনসকে হয়তো সরাসরি বরখাস্ত না করা হলেও, তাকে অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্য কোনো দায়িত্বে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, উজবেকিস্তানে আসন্ন এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে তিনি দলের সঙ্গে না-ও যেতে পারেন।
আগামী ৩১ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে এই বাছাইপর্ব। আর দলের দেশ ছাড়ার কথা একদিন পরেই। ফলে হাতে সময় খুবই কম—দ্রুত সিদ্ধান্ত না হলে দলের প্রস্তুতিতেই এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।



