অবশেষে আর শেষ রক্ষা হলো না জেরার্ড জোন্সের! জল ঘোলা অনেক হয়েছিল, নাটকীয়তাও কম হয়নি— তবে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললো বাফুফে। এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের মাঝপথেই বরখাস্ত করা হলো ব্রিটিশ কোচ জেরার্ড জোন্সকে।
টানা দুই ম্যাচে বিশ্রী হার। প্রথমে স্বাগতিক উজবেকিস্তানের কাছে ২-০, আর বৃহস্পতিবার সিরিয়ার কাছে ৩-০ গোলের বড় ধাক্কা। ২৪ বছর পর অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলার যে স্বপ্নের কথা বাফুফে ভেবেছিল, মাঠের পারফরম্যান্সে তা এখন প্রায় শেষ।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাফুফে স্পষ্ট জানিয়েছে— জোন্সের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। জানা গেছে, সব সুযোগ-সুবিধা ও পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে তাঁকে অবিলম্বে দল ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। এমনকি দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা বা যোগাযোগের ওপরও জারি করা হয়েছে কড়া নিষেধাজ্ঞা!
জোন্সকে বরখাস্ত করার পেছনের কারণ কি শুধুই মাঠের হার? একদমই না! আসল কারণটা ছিল মাঠের বাইরের চরম বিশৃঙ্খলা। কিন্তু জোন্সের সঙ্গে বাফুফের শুরুটা মোটেও এমন ছিল না।
গত জুনে দুই বছরের চুক্তিতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব নেন জোন্স। লক্ষ্য ছিল— সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের সাফল্য ধরে রেখে ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটানো। আর এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের মূলপর্বে জায়গা করে নেওয়া। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে জুলাই ও আগস্টজুড়ে যশোরে চলে দীর্ঘ ক্যাম্প। দলে যোগ করা হয় বিদেশি বংশোদ্ভূত পাঁচ ফুটবলারও। সব মিলিয়ে প্রত্যাশা ছিল অনেক।
কিন্তু এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের আগেই বদলে যায় চিত্র। ১০ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা দিয়ে বেতন ও নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ করেন জোন্স। দাবি করেন, বেতন না পাওয়ায় পরিবারকে টাকা পাঠাতে পারছেন না। এমনকি বাংলাদেশে নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কার কথা জানান। পরে অবশ্য বাফুফে জানায়, চুক্তি অনুযায়ী জোন্সের বেতন যথাসময়েই দেওয়া হয়েছে। জোন্সও টাকা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
কিন্তু বিতর্ক থামেনি। উজবেকিস্তান যাওয়ার ঠিক আগে টিম হোটেলে জোন্স ও সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে কথা-কাটাকাটির ঘটনা সামনে আসে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি গড়ায় ধাক্কাধাক্কিতে। আর তখনই ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন জোন্স নিজেই। পরে ঘটনাটি খতিয়ে দেখে বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটি।
ঘটনার পর ফেসবুকে কান্নাভেজা ভিডিও বার্তায় জোন্স দাবি করেন— তিনি বাংলাদেশে নিরাপদ নন, তাঁর ওপর নাকি হামলা হয়েছে! অথচ একই ভিডিওতে আবার বলেন সহকারী কোচের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দারুণ! একদিকে নিরাপত্তার শঙ্কা, অন্যদিকে অল-ইজ-ওয়েল দাবি—তাঁর এমন দ্বিচারিতা ও অসংলগ্ন আচরণে ফুটবল অঙ্গনে তীব্র প্রশ্ন ওঠে।
এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে— বরখাস্ত হতে যাচ্ছেন জোন্স। কিন্তু তখনও বাফুফের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। বরং জোন্স নিজেই বরখাস্তের খবর অস্বীকার করেন। এরপর দল নিয়ে পৌঁছান উজবেকিস্তানে।
কিন্তু সেখানেও কাটেনি অস্বস্তি। বাছাইপর্বের আগে টিম হোটেলের সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন না কোনো কোচিং স্টাফ কিংবা খেলোয়াড়। মাঠের বাইরের এই চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলাই মূলত বাফুফের ধৈর্যের শেষ সীমা পার করে দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় বাছাইপর্বে বেহাল পারফরম্যান্স। দুই ম্যাচে ৫ গোল হজম। তাতে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে ওঠার সমীকরণটাও কঠিন হয়ে যায়।
অনেকটা বাধ্য হয়েই তাই কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় বাফুফে। সিরিয়ার কাছে হারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জেরার্ড জোন্সকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। বাতিল করা হলো তাঁর সঙ্গে করা চুক্তিও। অর্থাৎ, দুই বছরের পরিকল্পনা— শেষ হলো মাত্র তিন মাসেই।



