অন্ধজান বন্ধু আমাদের, তোমার রাজা পালিয়েছে। শোষণের যাত্রায় সকল প্রজা অনুভূতি শূন্য, এবার লড়াই আত্মার সাথে। নিজের আত্মার সাথে লড়বে সে নিজেই। পথের যত কাঁটা থাকবে, সব উপড়ে ফেলা হবে। অন্ধজান বন্ধু আমাদের, তোমার পথের গল্পগুলো লিখে রাখা যেত যদি, নিশ্চিত এমন শব্দ এখনো হয়নি বৈকি।
আর দশজনের মতো নয়; ঘরের সাথে যুদ্ধ করে, সমাজের নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, সকল বিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে নারীরা এগিয়ে যায় রোজ–এসব গল্প পুরানো। নারীর গল্প শুনবে এমন লোক কথায়? মানুষের অভাব থাকে না বিত্তে, মানুষের অভাব হয় রুচিতে, মননে। এ অভাব সকলে টের পায় না, ভাবায়ও না। সোনাই খাতুন বলছেন, ‘আমার বাবার কোনো অভাব ছিল না, আমিও তথাকথিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। তবুও অর্থের অভাবে পড়াশোনা অনেকবারই আটকেছে। এমনও দিন গেছে বোনের পরা জামা সে ধুয়ে শুকাতে দিলে, আমি পরতে পারতাম। আসলে আমাদের অভাবটা ছিল মনে।’
পরিবারের তিন ভাইবোনের মধ্যে সোনাই খাতুন বড়। ছোটবেলা থেকে তাঁর দুচোখের আলো হারিয়েছেন। প্রকৃতি শুধু আলোই কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় সুখ-শান্তি, গদ্যে না বলা অনেক কিছুও। তবে সোনাই খাতুন থেকে চোখের আলোর সাথে জীবনের আলো, তাঁর মাকেও কেড়ে নিয়েছে মাত্র দেড় বছর বয়সে। এর পর ঘরের আলো জ্বালাতেই বাবা এনেছেন তাঁর নতুন সঙ্গী। গল্পের সৎ মায়েরা ঠিক যেমন হয়, তারচেয়ে কম না তিনি। নতুন ঘরের সন্তানদের মানুষ করার জন্যে দুমুঠো ভাত সোনাই খাতুনকে দেওয়াই যায়। পড়াশোনা করেই বা কী হবে আর! সোনাই তো আর দেখতে পায় না।
ছোটবেলায় যে এনজিও স্কুলে ভর্তি করানো হয়, সে এনজিও ফান্ডিংয়ের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বাবাকে আবারও স্কুলে ভর্তি করাতে বললে, বাবা উত্তর দেন, ‘তোমার স্কুল বন্ধ, তুমি চোখে দেখো না। পড়ে কী হবে, বাসায় থাকো।’ ঘরের চার দেওয়ালে সোনাই থাকতে চায়নি। কেবল ভাইবোন সামলে দুমুঠো ভাতের বিনিময়ে জীবন হতে পারে না। সোনাই খাতুন দেখতে চেয়েছিলেন নিশ্চয়। কিন্তু এই পৃথিবীর বীভৎস রূপ তাঁর অদেখা রইল না আর। দেখা-অদেখার এই জীবনে সবকিছু ছেড়ে নিজ দায়িত্বে সিদ্ধান্ত নিলেন, সোনাই খাতুন পড়বেন। যেকোনো মূল্যেই পড়বেন। পঞ্চম শ্রেণির জিপিএ ফাইভ, পড়াশোনার আগ্রহ বাড়িয়ে দিল এক ধাপ। পাশের বাড়িতে ভাইকে পড়াতে আসতেন এক শিক্ষক। তিনিই সোনাই খাতুনকে নিয়ে যান খুলনা শহরে এনজিওভুক্ত এক স্কুলে পড়াতে। কিন্তু ফরিদপুরের গ্রাম থেকে খুলনার শহরে আসার এই গল্প মোটেও সহজ নয়। বাবা-মা বললেন, ‘ছেলে ধরা; পাচার করার ধান্দা।’
সোনাই খাতুন যথেষ্ট যুদ্ধ করে রাজি করালেন বাবাকে। গেলেনও খুলনা। তবে বাবাও জানিয়ে দিলেন তাঁকে পড়াশোনা করাবেন না, সে নিজে যেন খরচ বহন করে। সোনাই খাতুন জানেন, তিনি দমবেন না। একলাই পরবর্তী পথ পাড়ি দিলেন। ঘর থেকে চলে গেলেন বরিশালে, অপরিচিত এক ছেলেকে গার্জিয়ান দেখিয়ে বহুকষ্টে ভর্তি হলেন বরিশালের কলেজে। তবে পথের রাজা পথ নিজেই। এসএসসি পরিক্ষার আগেই এপেন্ডিক্সের অপারেশন হলো। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অবহেলায় অপারেশনের অস্ত্র রয়ে গেল পাকস্থলিতে। যুদ্ধ যেন শেষই হয় না। শরীর‑মনের সাথে কোনো রকমে পেরে উঠেই আবারও পরীক্ষায় বসলেন। তবে মনমতো এল না ফলাফল।
পরে বদরুন্নেসা কলেজে ভর্তি হলেন। কেবল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্তই ছিল ব্রেইলে পড়ার সুযোগ। এরপর অডিও শুনে বা বান্ধবীদের থেকে বুঝে নিয়ে কোনোভাবে পাস করেন এইচএসসি। খুব ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, সুযোগ পাননি। মনের কষ্টে আর কোথাও পরীক্ষা দিতে চাইলেন না। বন্ধুরা উৎসাহ দিয়ে বলল, শেষবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে। যে দেশের আইনে এখনো সমস্যা, যে দেশের আইন তার নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করে না, যেখানে সমান অধিকার পায় না তার নাগরিক, সেখানেই সম্পূর্ণ মনোবলে চবির আইন বিভাগে টিকে গেলেন সোনাই খাতুন।
সোনাই খাতুনের কোনো কাজই যেন সহজে সমাপ্ত হয় না, বাধা লেগে থাকবে–এই যেন স্বাভাবিক। ঘর থেকে কোনো সহযোগিতা নেই, নিজের হাতেও ভর্তির জন্য নেই কিছু। ধার করে, সারা রাত ট্রেনে দাঁড়িয়ে থেকে মাত্র কিছু টাকা নিয়ে ছুটে চললেন। কিন্তু পেরিয়ে গেল ভর্তির তারিখ। বিভাগ জানাল ভর্তি করানো সম্ভব না। তৎকালীন ভিসির কাছে আরজি জানান সোনাই। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কেবল সোনাই খাতুনের জন্যে ভর্তির তারিখ বাড়ানো হলো আরও তিন দিন। সোনাইয়ের সাথে ভর্তির সুযোগ পেল আরও কিছু শিক্ষার্থী, যাদের হয়তো অর্থের কারণে মাঝপথে ঝুলে ছিল ভাগ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় সোনাইয়ের খুবই পছন্দ। সকলের সাহায্য এবং ভালোবাসা সোনাইকে নতুন রূপে শক্তি জোগাচ্ছে। কিন্তু ক্লাসের অডিও রেকর্ড শুনে, বান্ধবীদের সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করলেও ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করা তাঁর অধিকার বলে মনে করেন সোনাই। আমাদের সমাজে এমন অনেকেই তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় রোজ। তবুও তাদের অঙ্কুরোদগম আটকানো যে মুশকিল।
সোনাই খাতুনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই দেশে কি আর থাকতে চাও? সোনাই এই দেশ থেকে আর কোথাও যেতে চান না, এই দেশই তাঁর জন্যে ভালো। যে দেশ, দেশের প্রতিন্ধকতা তাঁকে আটকে রাখতে চেয়েছিল ঘরে, সে দেশেই তিনি হতে চান একজন শিক্ষক। তার কারণও আছে। সোনাই মনে করেন, তাঁর শ্রুতিলেখকের দরকার নেই। তিনি তো ব্রেইল পদ্ধতিতে লিখতে পারেন। তার জন্যে যদি একজন ব্রেইলে পারদর্শী শিক্ষক বা তাঁর মতোই একজন শিক্ষক থাকতেন, তাহলে তাঁর খাতা তিনিই কাটতে পারতেন। বরং যার লেখার ক্ষমতা নেই, চলার ক্ষমতা নেই, তাকে শ্রুতিলেখকের সুবিধা দেওয়া হোক। সোনাই বলেন, ‘আমাদের দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই তার দালান তৈরির সময় ভাবে না এখানে শারীরিক প্রতিবন্ধিরাও পড়তে পারে।’
যাদের ভেতরের আলোকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে এই সমাজ, তারা ঠিকই এই যাত্রা পার করে। বেশ ভালোমতোই পার করে । কিন্তু সকলে সোনাই খাতুন হতে পারেন না। ছায়ার তলে থেকে উপরিতলের ছায়াকেও পাশ কাটিয়ে আলো ঠিকই তার পথ খুঁজে নেয়। ফলে ছায়ার তলে থাকা‑না থাকা খুব বেশি জরুরি না। নিজের কাজ আপন গতিতে যিনি করে যান, যার মনোবল পাহাড়সম, তার জন্যে পথই সই।
সোনাই ভালোবাসেন দাবা খেলতে। দাবা খেলে নারী বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। কথা ছিল রাশিয়ায় যাওয়ার। কিন্তু করোনা মহামারি তাঁর এই সফরের স্বপ্নকে অপূর্ণই রাখল। সোনাই তবুও মায়া করেন প্রত্যেক মানুষের জন্য। ভবিষ্যতে তাঁর মতো অনেকের জন্যেই কাজ করতে চান। চলার পথে যে সকল ভালো বন্ধুর হাত পেয়েছেন, প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা রাখেন মনে। ‘অধিকার সমতা ক্ষমতায়ন নারী কন্যার উন্নয়ন’–প্রতিপাদ্যে এবারের নারী দিবস সফল হোক, সোনাই খাতুনের মতো যারা আলো হাতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সমাজের তরে আলো, তাঁদের প্রতিও হোক সমদৃষ্টিপাত।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



