এই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) শুরু হয়েছে গাম্বিয়ার ঐতিহাসিক মামলা, যেখানে দেশটি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনেছে। সোমবার আইসিজের বিচারকদের সামনে গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী দাউদা এ জাল্লো বলেন, মিয়ানমারের সরকার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের ‘ধ্বংস করা লক্ষ্যে’ নেমেছে।
প্রায় এক দশক আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী একটি সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল, যাদের বেশির ভাগই আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী বাংলাদেশে। শরণার্থীরা সে সময় গণহত্যা, ধর্ষণ এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
এই মামলার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে শুনানি হচ্ছে। আরও একটি দিক থেকে এই মামলাটি নজিরবিহীন — কারণ এই প্রথম আইসিজে এমন একটি গণহত্যার মামলা শুনছে, যেখানে কোনো তৃতীয় দেশ অন্য একটি জনগোষ্ঠীর পক্ষে মামলা করেছে।
এমন মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখতে না পারা দাউদা জাল্লো আদালতের ‘পিস হল’-এ উপস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দাঁড়িয়ে পরিচয় দিতে অনুরোধ করেন, যাতে ১৫ সদস্যের বিচারক প্যানেল তাঁদের স্বীকৃতি দেন। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বন্ধ দরজার ভেতরে সাক্ষ্য দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আদালত কবে চূড়ান্ত রায় দেবে, তা এখনো জানা যায়নি।
আইসিজে নিজে কোনো রায় কার্যকর করতে পারে না, তবে তাদের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা মামলায় আদালতের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা ইসরায়েলবিরোধী গণহত্যা মামলার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা এই মামলা করেছিল, পরে আরও কয়েকটি দেশ এতে যুক্ত হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো — গাম্বিয়া কেন রোহিঙ্গাদের পক্ষে এই লড়াইয়ে নেমেছে?
কেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে গাম্বিয়া
২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে মিয়ানমার।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গাম্বিয়া, যার জনসংখ্যা মাত্র ২৫ লাখ। তারা মামলাটি করেছে ৫৭ সদস্যবিশিষ্ট ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-এর পক্ষে। গাম্বিয়া ওআইসির সক্রিয় সদস্যদেশ।
এই পদক্ষেপ মামলাটির মূল পরিকল্পনাকারী, গাম্বিয়া সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবুবাকার তামবাদুকে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় নিয়ে আসে। পরে তামবাদু জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ইন্টারন্যাশনাল রেসিডিয়াল মেকানিজম ফর ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনালস, যেটি কিনা জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক আদালত – সেই সংস্থার রেজিস্ট্রার। ২০২১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতও হন।
গাম্বিয়া মামলাটি করার পর বিভিন্ন সময়ে কানাডা, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, মালদ্বীপ, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য —এই সাতটি দেশ আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলাকে সমর্থন দিতে আবেদন করে এবং তা অনুমোদিত হয়।
২০১৬ সালের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী তাতমাদাও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কয়েক মাসব্যাপী সহিংস অভিযান চালায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, রোহিঙ্গারা বহুদিন ধরেই নির্যাতনের শিকার হলেও ওই সময় সহিংসতা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছায়। গ্রাম পোড়ানো, গণহারে গুলি, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো ঘটনাগুলো ছিল নিয়মিত।
২০১৯ সালে, অর্থাৎ যে বছর গাম্বিয়া মামলা দায়ের করে, সে বছর জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল জানায়, প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং ৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সামরিক অভিযানে ‘গণহত্যার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য’ ছিল এবং রোহিঙ্গা পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
গাম্বিয়ার নিজস্ব ইতিহাসও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন দেশটির সাবেক সরকারি আইনজীবী ইমরান দারবোয়ে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ২০১৭ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া জাম্মের কঠোর শাসনের অভিজ্ঞতা গাম্বিয়াকে সংবেদনশীল করে তুলেছিল।
জাম্মে ২০১৭ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে আঞ্চলিক সামরিক হস্তক্ষেপে তাঁকে উৎখাত করা হয়। ২০১৮ সালে নতুন সরকার জাম্মে আমলের হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের তদন্ত শুরু করে।
এই সময়েই বিশ্ব দেখছিল রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহতা। দারবোয়ের ভাষায়, ‘আমরা তখন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। মানবাধিকার রক্ষার গুরুত্ব তখন আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি।’ তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার যদি সত্যিই সার্বজনীন হয়, তাহলে শুধু নিজের দেশের দুঃখ দেখলেই হবে না। রোহিঙ্গারা যা অনুভব করছে, আমরা সেটাই অনুভব করছিলাম।’
ওআইসির সক্রিয় সমর্থনও গাম্বিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছোট দেশ হওয়ায় মামলার খরচ বড় চাপ হলেও ওআইসির সহায়তায় গাম্বিয়ার পক্ষে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানান দারবোয়ে।
আইসিজেতে গাম্বিয়ার যুক্তি কী
সোমবার আইসিজেতে দেওয়া সূচনা বক্তব্যে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাউদা জাল্লো বলেন, মিয়ানমারের শাসক সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে রোহিঙ্গাদের নিশানা বানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ধ্বংস করার লক্ষ্যেই তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে।’ আরও বলেন, ‘মিয়ানমার তাদের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। তাদের জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে, এমন ভয়াবহ সহিংসতার শিকার করেছে যা কল্পনাও করা কঠিন।’
গাম্বিয়ার আইনজীবী পল রাইখলার ২০১৭ সালের বহু প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য আদালতে পড়ে শোনান। সেসব সাক্ষ্যে বলা হয়, মানুষসহ ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, দলবদ্ধ ধর্ষণ হয়েছে, নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। রাইখলার বলেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘অপবিত্র ও নিচু জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
আরেক আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ড বলেন, সহিংসতার ব্যাপকতা স্পষ্ট করে যে, ‘মিয়ানমার এই ক্ষেত্রে গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করেছে।’
মিয়ানমারের বক্তব্য কী
মিয়ানমারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী কো কো হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা দল শুক্রবার থেকে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করবে, যা চলবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। ২০১৯ সালে মামলা দায়েরের সময় দেশটি ছিল বেসামরিক সরকারের অধীনে। তখন প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমার অভিযোগ অস্বীকার করে।
সাবেক নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি নিজে আদালতে উপস্থিত হয়ে গাম্বিয়ার অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলেছিলেন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে রোহিঙ্গা গণহত্যা ঠেকাতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেয়।
বর্তমানে সামরিক শাসনের অধীনে থাকা মিয়ানমার এখনো গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা ‘সন্ত্রাস দমনের অভিযান’ চালিয়েছিল।
রোহিঙ্গারা কারা
রোহিঙ্গারা মূলত মুসলিম একটি জাতিগোষ্ঠী, যারা মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে বসবাস করত। রাজ্যটি বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা। ২০১৭ সালের আগে মিয়ানমারে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা ছিল। মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিকত্ব দেয় না এবং দাবি করে, তারা বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী। রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ও সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরেই নিপীড়িত।
২০১৬ সালের পর সহিংসতা চরমে পৌঁছায়। কমপক্ষে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আসে। ২০২৫ সাল নাগাদ কক্সবাজারে লাখো রোহিঙ্গা শরণার্থী অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছে। তারা প্রায় পুরোপুরি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও তাদের স্থায়ী সমাধান হিসেবে প্রত্যাবাসনের কথাই বলে আসছে।



