কাবুল শহরের উপকণ্ঠে একটি ছেঁড়া-ফাটা তাবুর ভেতর একটিমাত্র বাতি টিমটিমে জ্বলছে। সেই আলোয় সামিউল্লাহ আর তাঁর স্ত্রী বিবি রেহানা বসে আছেন। সামনে শুকনো রুটি আর চা — এ দুটোই তাঁদের পরিবারের আজকের একমাত্র খাবার। পাশে তাঁদের পাঁচ সন্তান আর তিন মাসের নাতি।
৫৫ বছর বয়সী সামিউল্লাহ বললেন, ‘আমরা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে মৃত্যুকেই বরং খুশি মনে মেনে নিতে শিখেছি।’
ইরান ও পাকিস্তান থেকে গত এক বছরে যাঁদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, সামিউল্লাহর পরিবারও তাঁদের একজন। তাঁর দুই বড় ছেলে, যাঁদের বয়স ১৮ ও ২০ বছর, এবং তাঁদের স্ত্রীরাও এই পরিবারের সঙ্গে আছেন। তিনি বলেন, ‘দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরে এসে তাঁদের এই অবস্থা।’
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) বলছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় আফগানিস্তানে অন্তত ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ এখন তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছে। সামিউল্লাহ বলেন, ‘আমাদের যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। অন্তত আমাদের সন্তানদের জীবনটা যদি একটু ভালো হতো।’
ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হওয়ার আগেই তিনি এসব কথা বলছিলেন। সেই দমন-পীড়নে পরে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে বলে জানা যায়।
সামিউল্লাহ জানান, ইরানে তাঁদের ছোট্ট একটি ঘর ছিল। কিন্তু এক রাতে হঠাৎই ইরানি কর্তৃপক্ষ অভিযান চালায়। গ্রেপ্তার হওয়ার পরপরই তাঁদের দেশছাড়া করা হয়। এক রাতের মধ্যেই ঘরবাড়ি ছেড়ে এই তাবুতে এসে ঠাঁই নিতে হয়েছে। কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পেরেছেন, কিন্তু সঞ্চয়ের টাকা আনতে পারেননি। ওই টাকায় শীতটা কোনোরকমে পার করে দেওয়ার কথা ছিল।
এ বিষয়ে ইরানের কর্তৃপক্ষের মন্তব্য জানতে পারেনি রয়টার্স।
আফগান প্রশাসনের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘দেশে ফিরে আসা অভিবাসীদের যতটা সম্ভব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে—যাতায়াত, বাসস্থান, চিকিৎসা ও খাবারের ক্ষেত্রে।’ তবে তাঁর কথায়, ৪০ বছরের যুদ্ধ আর রাজস্ব-সম্পদের বড় অংশ হারানো একটি দেশে দারিদ্র্য রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। ‘অর্থনৈতিক কর্মসূচির ফল আসতে সময় লাগে, মানুষের জীবনে সঙ্গে সঙ্গে প্রভাব পড়ে না’ – বলেছেন জাবিউল্লাহ মুজাহিদ।
ডাব্লিউএফপি জানায়, ইরান ও পাকিস্তান মিলিয়ে ২৫ লাখের বেশি আফগান নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ইরান গত বছর নির্বাসনের গতি বাড়ায়। অভিযোগ ওঠে, আফগানরা নাকি ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছে। নিরাপত্তা ও সম্পদের চাপের কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পাকিস্তানও নির্বাসন জোরদার করেছে। তাদের অভিযোগ, সীমান্তপারে হামলায় জড়িত জঙ্গিদের তালেবান আশ্রয় দিচ্ছে — যা আফগানিস্তান অস্বীকার করেছে।
আয় নেই, সহায়তাও নেই
আফগানিস্তানের শুকনো জমিতে শীত নামতেই কাজের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তারওপর দেশে ফেরা মানুষের ঢলে জনসংখ্যা প্রায় দশ শতাংশ বেড়ে গেছে, বলেন ডাব্লিউএফপির আফগানিস্তান প্রধান জন আইলিফ। তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলোর অনেকেই ইরান ও পাকিস্তানে কাজ করতেন। সেখান থেকে টাকা পাঠাতেন দেশে। সেই টাকা আফগানিস্তানের জন্য ছিল জীবনদানকারী।’ এখন আরও ৩০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর বিশ্বজুড়ে সহায়তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট হয়েছে। এতে ডাব্লিউএফপির মতো সংস্থাগুলোর তহবিল কমে গেছে। অন্য দাতারাও পিছিয়ে এসেছে। ফলে সারা বিশ্বেই লাখো মানুষ ঝুঁকিতে পড়েছে। আইলিফ বলেন, ‘গত বছর আফগানিস্তানে অপুষ্টির হার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ছিল। দুঃখজনকভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে।’ তাঁর ধারণা, ২০২৬ সালে আরও দুই লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগবে।
কাবুল থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরের বামিয়ান এলাকায় ডাব্লিউএফপির সহায়তা কেন্দ্রে চালের বস্তা আর পাম তেলের বোতল সাজানো। ঠেলাগাড়িতে আরও খাবার আনা হচ্ছে। তবু দীর্ঘ লাইনের মানুষের জন্য তা যথেষ্ট নয়। ৫০ বছর বয়সী জাহরা আহমেদি বলেন, ‘এই সামান্য জিনিস দিয়েই আমাকে শীত কাটাতে হবে। কখনো খাই, কখনো না।’ আট কন্যাসন্তানের এই বিধবা মা এবারই প্রথম সহায়তা পেলেন।
‘জীবন আর আগের মতো নেই’
রাজধানীর কাসাবা ক্লিনিকে ওষুধ আর পুষ্টিকর খাবারের অপেক্ষায় মায়েরা শিশুদের কোলে নিয়ে শান্ত করছেন। চিকিৎসক রাবিয়া রহিমি ইয়াদগারি বলেন, ‘অভিবাসী না থাকাকালীন সময়ের তুলনায় এখন রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ।’ প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন অপুষ্ট রোগী আসে, কিন্তু সহায়তা যথেষ্ট নয়।
৩০ বছর বয়সী লায়লা বলেন, তাঁর ছেলে আবদুল রহমান কিছুদিন পুষ্টিকর খাবার খেয়ে সুস্থ হচ্ছিল, ‘কিন্তু কিছুদিন পর আবার ওজন কমে যায়।’ তিনি বলেন, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তাঁর স্বামী সরকারি চাকরি হারান। ধীরে ধীরে সংসারের অবস্থা ভেঙে পড়ে। ‘জীবন আর আগের মতো নেই।’
২০২১ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ে। ২০ বছরের যুদ্ধের পর তালেবানরা কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
সন্ধ্যা নামতেই ঠান্ডা বাড়ে। সামিউল্লাহ কাঠ জোগাড় করেন, আর বিবি রেহানা চুলা জ্বালান। সামিউল্লাহ বলেন, ‘রাতে খুব ঠান্ডা পড়ে। বাচ্চারা বলে, “বাবা, খুব ঠান্ডা লাগছে।” আমি তাদের বুকে জড়িয়ে বলি, “সব ঠিক হয়ে যাবে।” আমাদের আর কী করার আছে?’
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘ইরানে কাজ করতাম, অন্তত পেট ভরে খাওয়াতে পারতাম। এখানে না আছে কাজ, না আছে জীবিকা।’



