দৃশ্য ১: স্কুলপড়ুয়া ছেলে তর্ক করছে বাবার সঙ্গে। বাবার প্রশ্ন—কেন সে বন্দুক নিয়ে বোনের কলেজে গিয়ে ‘মাস্তানি’ করল। তখন ছেলের উত্তর—বাবা-মা, দুই মেয়ে ও এক ছেলের সংসারে বাবা ও ছেলেই পরিবারের দেখভাল করে। যেহেতু বাবা কাজে ব্যস্ত থাকেন, সেহেতু স্কুলে পড়া ছেলেকেই মা-বোনদের দেখভাল করতে হবে।
দৃশ্য ২: স্কুলপড়ুয়া ছেলে বড় হয়েছে। একটি বিষয়ে বাবার সঙ্গে তার তর্কাতর্কি চলার সময় মা মধ্যস্থতা করতে গেলে, ছেলে বলে ওঠে, ‘মা, তুমি কথা বলো না। এটা বাবা আর ছেলের ব্যাপার।’ এর পরের কিছু ঘটনায় বাবা-ছেলের কথা বলার সময় মাকে কখনো কখনো ঘরের দরজার বাইরে উৎকন্ঠিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা গেছে। মায়ের যেন বাবা-ছেলের কথার মাঝে কথা বলারই নিয়ম নেই!
দৃশ্য ৩: প্রেমিকাকে আকৃষ্ট করতে সেই ছেলেই অবতারণা করে প্রাচীন যুগের আলফা মেল ধারণার। বলে দেয়, শক্তিশালী (ধনে, মানে ও ক্ষমতায় অবশ্যই) পুরুষকেই তার বিয়ে করা উচিত। যেহেতু সে শক্তিশালী, তাই তাকে বিয়ে করলেই নিরাপদে থাকতে পারবে। সেই সঙ্গে স্বল্প আলাপচারিতায় এও জানিয়ে দেয় যে, মেয়েটির পেলভিস বা শ্রোণিচক্র বেশ বড় আকারের। তাই সে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সন্তান জন্ম দিতে পারবে। এবং এর জন্যই তার শক্তিশালী পুরুষ বিয়ে করা প্রয়োজন।
দৃশ্য ৪: প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হওয়া নারীকে নিজের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের দৈহিকভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে বলে প্রধান চরিত্রটি। জানায় যে, সেটি ছিল কৌশলমাত্র। তবে শত্রুপক্ষের সঙ্গে শেষ মোকাবিলায় যাওয়ার আগে কম বয়সী স্ত্রীকে বলে যায়, সে মরে গেলেও যেন দ্বিতীয় বিয়ে না করে!
এ তো কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। তিন ঘণ্টারও বেশি দৈর্ঘ্যের ‘অ্যানিম্যাল’ থেকে এমন আরও উদাহরণ বের করা যায়। যেসব দৃশ্যের মোদ্দা কথা হলো, শক্তিশালী পুরুষরাই এই পৃথিবী শাসন করতে সক্ষম। নারীরা সেখানে পুরুষের সহকারী মাত্র। এবং এসবের ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়, নারীদের পক্ষে কখনোই পুরুষের সমান হওয়া সম্ভব নয়।
এমন একটি বিষয়কে উপজীব্য ধরেই পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা তৈরি করেছেন ‘অ্যানিম্যাল’ ছবিটি। বাবা ও ছেলের ভূমিকায় যথাক্রমে অভিনয় করেছেন অনিল কাপুর ও রণবীর কাপুর। আর কে কোন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তা আসলে না জানলেও ক্ষতি নেই। কারণ এই দুজন ছাড়া পুরো ছবিতে আর কোনো চরিত্রের খুব একটা গুরুত্বই নেই। স্রেফ গল্প এগিয়ে নেওয়ার ছোটখাটো উপকরণ হিসেবেই কেউ কেউ এসেছেন, কেউ কেউ আবার উবেও গেছেন।
মূলত বাবার প্রতি ছেলের অন্ধ ভালোবাসাই এই চলচ্চিত্রের উপজীব্য। বাবার ওপর হামলার প্রতিশোধ নিতে পাগলপারা ছেলের কর্মকাণ্ডই দেখানো হয়েছে সিনেমাজুড়ে। প্রতিশোধের রূপায়ণে সহিংসতা দেখানো হয়েছে চরম আকারে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলো বেশ যত্ন নিয়েই তৈরি করেছেন পরিচালক এবং বলিউডে এ ধরনের সিনেমা সত্যিই আগে কখনো দেখা যায়নি। বলতেই হয় যে, মারামারি, আবেগীয় কান্নাকাটি, চরিত্রের পাগলামি ও ধনদৌলতের ফ্যান্টাসির কারণে প্রচলিত ‘মাসালা মুভি’র সমস্ত উপকরণ ‘অ্যানিম্যাল’-এ উপস্থিত। সেই সঙ্গে বাড়তি হিসেবে আছে নারীর প্রতি তাচ্ছিল্য ও তীর্যক মন্তব্য। যদি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—অর্থাৎ, এই উপমহাদেশের পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজের ভোক্তাশ্রেণির কথা ভাবেন, তবে এটি অতি অবশ্যই ধুন্ধুমার ব্যবসা করার মতোই একটি সিনেমা।

ছবিটির ব্যবসায়িক সফলতা এরই মধ্যে প্রমাণিতও হয়ে গেছে। নানা সমালোচনা সত্ত্বেও চলতি বছরের বলিউডি ছবিগুলোর মধ্যে তিন দিনের কালেকশনে অ্যানিম্যাল এখন আয়ের দিকে থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। তিন দিনে অ্যানিম্যাল ভারতে তুলেছে ২০০ কোটি রুপি। আর বিশ্বব্যাপী এর সর্বমোট আয় ৩৫০ কোটি রুপি। বলা হচ্ছে, ছবিটি বানাতে খরচ হয়েছে ১০০ কোটি রুপি। তার মানে, পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা যে ফর্মুলায় ছবিটি বানিয়েছেন, তা ব্যবসায়িকভাবে অত্যন্ত সফল।
সমালোচনার প্রসঙ্গটি যখন এলোই, তখন এর গভীরে যাওয়া যাক। ভারতীয় এই চলচ্চিত্রটির সমালোচনা শুরু হয়েছে ভারতেই।
হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, ‘অ্যানিম্যালের কাহিনি ত্রুটিযুক্ত, নারীর প্রতি ঘৃণাবাক্যে পূর্ণ, তবে উপভোগ্য।’
দ্য হিন্দু লিখেছে, ‘পুরুষত্বের জয়জয়কার দেখানো সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার ছবিতে ভুগেছেন রণবীর।’
এনডিটিভিতে প্রকাশিত রিভিউয়ে বলা হয়েছে, ‘বিরক্তিকর ও ক্লান্তিকর অ্যানিম্যালে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন রণবীর।’
আর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস যা বলেছে তার অর্থ দাঁড়ায়, ‘অ্যানিম্যালের অযৌক্তিক ও দুর্বল গল্পে অনিল ও রণবীর কাপুরের অভিনয় ক্ষমতার অপচয় হয়েছে।’
অর্থাৎ, ভারতের ভেতরেই এই ছবির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। তারপরও ছবিটি ব্যবসা করছে এবং অনেক মানুষ ভিড় করেই হলে গিয়ে ছবিটি দেখছেন। ছবিটির যেসব বিষয় নিয়ে আপত্তি উঠছে, সেগুলো পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার জন্য পুরোনো। তিনি এই সিনেমার চিত্রনাট্য ও সম্পাদকও বটে। এর আগে ‘অর্জুন রেড্ডি’ ও তার ক্লোন ‘কবির সিং’ সিনেমার জন্যও একই অভিযোগ তাঁকে শুনতে হয়েছিল। মূল অভিযোগ হলো—নারীবিদ্বেষ। বোঝাই যাচ্ছে, সমালোচনা সত্ত্বেও এই বিষয়কেই তিনি নিজের নির্মাণবৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। পরিচালক যেকোনো একটি বিষয়কে নিজের ‘স্টাইল’-এর অন্তর্ভুক্ত করতেই পারেন, এটি তাঁর স্বাধীনতা। সমস্যা হলো, উপমহাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় সন্দীপের স্টাইল নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্যকে সামাজিকভাবে আরও শক্তিশালী ও দমিয়ে রাখার অস্ত্র হিসেবে তৈরি করতেই সাহায্য করে। দেখা গেল, অ্যানিম্যাল দেখে বাড়িতে ফেরার পর একজন স্কুলপড়ুয়া ছেলে আর মায়ের কথা মানতে চাইল না, অপমানও করতে পারে। কারণ স্বপ্নের নায়ককে যে সে বড় পর্দায় তা-ই করতে দেখেছে!
হ্যাঁ, অ্যানিম্যাল চিত্তরঞ্জনের জন্য উপযুক্ত, মাসালা মুভি হিসেবেও দুর্দান্ত। নিজেদের সব সময় ‘সুপিরিয়র’ ভাবতে চাওয়া তথাকথিত পুরুষদের মনোরঞ্জনের জন্য এই ছবি একটু বেশিই উপযুক্ত। নারীদের অবশ্য অপমান কিছুটা গায়ে মেখেই দেখতে হবে। বিশেষ করে, মাথা খাটিয়ে না দেখলে এই ছবি উপভোগ করে পয়সা উসুল হবেই। তবে মাথা খাটালেই মনে হতে পারে, পুরুষকে পাশবিক হওয়ার দীক্ষাই হয়তো দিল অ্যানিম্যাল!


রণবীর কাপুর নয়, সিংকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল ‘অ্যানিম্যালের’
আনকাট সেন্সর পেল ‘অ্যানিম্যাল’
