তাঁর পরনে নেই কোনো সামরিক পোশাক। নেই অস্ত্র। এমনকি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য বারবার আওয়াজও দিচ্ছেন না তিনি। এরপরও কঠিন এক যুদ্ধে নেমেছেন ইসরায়েলি নারী ইয়ায়েল নোয়। গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকেই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
‘ভালো কিছুর জন্য যুদ্ধ করছি আমি। দুপক্ষই যখন এমন এক ভয়াবহ নৃংশসতায় জড়িয়ে পড়েছে, তখন আমি নৈতিকতার জন্য লড়ছি। আগে আমি যেই মানুষটা ছিলাম, সেই মানুষটাই হতে লড়ে যাচ্ছি।’—এমনটাই বলছেন ইয়ায়েল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, রোড টু রিকভারি নামে ইয়ায়েলের একটি চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে আহতদের সেবাসহ বিভিন্ন সহায়তা করা। রোড টু রিকভারিতে কাজ করা একদল ইসরায়েলি এখন আহত ফিলিস্তিনিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
এসব ফিলিস্তিনিরা অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা সীমান্ত থেকে ইসরায়েলে আসছেন চিকিৎসা নিতে। বেশির ভাগই শিশু। তবে এখন আর এদের ইসরায়েলে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না সরকার। ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের হামলায় ৪ ইসরায়েলি ভলান্টিয়ার নিহতের পর এই সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এমনকি গত ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলায় নিহতদের মধ্যে ৪ ভলান্টিয়ারের আত্মীয়ও ছিল। এর পরও এতদিন ফিলিস্তিনিদের সেবা দিয়ে গেছেন এরা। এবার বন্ধ হওয়ার পর ইয়ায়েল চেষ্টা করছেন এই পথ আবারও খোলার।
উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দা ইয়ায়েলের বাবাও হামাসের হামলার শিকার হন। এই ঘটনার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন গাজার মানুষের জন্য আর কিছু করবেন না। এমনকি তাদের সাথে কথাও বলবেন না। পরে আবার সেই সিদ্ধান্ত বদলান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে বলেছিলাম, এই নৃংশসতা যেন আমাকে হারাতে না পারে।’
ইয়ায়েল ও রোড টু রিকভারির অন্যান্য ভলান্টিয়াররা এতদিন পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ক্যানসারসহ কিডনি ডায়ালাইসিস ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনও করতেন। এমনকি গাজা থেকেও নিজেদের উদ্যোগে নিয়ে আসতেন আহতদের। ইয়ায়েল বলছেন, ‘আমাদের প্রতিবেশীর সাহায্য দরকার, আমাদের সেই সাহায্যটা করাই উচিত।’
ইসরায়েলি নারী ইয়ায়েল নোয় বলেন, ‘আমরা যখন সীমান্তের চেকপয়েন্ট দিয়ে এসব আহত ফিলিস্তিনিদের নিয়ে আসি, দায়িত্বরত কর্মকর্তারা আমাদের জিজ্ঞাসা করেন, এগুলো আমরা কেন করছি। এমনকি পথেও অনেকে এই প্রশ্ন করেন।’
গাজার শিশুরা ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আছেন বলে জানান ইয়ায়েল। সেখানকার মানুষও তাঁর দিকে শত্রুর মতো তাকিয়ে থাকে বলে জানান তিনি।
ইয়ায়েল বলেন, ‘ওরা ফিলিস্তিনি বলে আমি সেবা দিচ্ছি, এমন নয়। আমি বোঝাতে চায় আমরা ইসরায়েলিরা নিজেদের নিয়ে গর্বিত। আপনি ইসরায়েলি হোন অথবা ফিলিস্তিনি, ইহুদি হোন বা আরবীয়, সবার আগে আপনি মানুষ।’
এদিকে প্রথমবারের মতো গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় ইসরায়েল সরকার যে লক্ষ্যের কথা বলেছিল, তার সঙ্গে তাদের আচরণের ফারাক থেকে যাচ্ছে।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, সম্প্রতি দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করছে, তার সমালোচনা করতে গিয়ে ব্লিঙ্কেন এমন মন্তব্য করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে বৈঠকের পর ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে ব্লিঙ্কেন এ মন্তব্য করেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। ফোনালাপের সময় তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং হামাস থেকে বেসামরিক নাগরিকদের আলাদা করার ওপর জোর দিয়েছেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানয়েছে, গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ১৭ হাজার ১৭০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪৬ হাজার আহত হয়েছে। আর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুসারে, হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হয়েছে।


ইসরায়েলের কড়া সমালোচনায় ব্লিঙ্কেন
