আমরাই হয়তো শেষ জেনারেশন… সত্যিই কি তাই?

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:২৫ পিএম

‘আমরাই হয়তো শেষ জেনারেশন…’

‘আমরাই হয়তো প্রথম জেনারেশন…’

‘আমরাই হয়তো প্রথম ও শেষ জেনারেশন…’

এই তিন ধরনের আলোচনাই বেশ কিছুদিন ধরে এ দেশের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে চলছে। কেউ বলছেন, তাঁরাই শেষ জেনারেশন যাদের মা পিঠা বানাতে জানে। আবার, কারও কারও বক্তব্য হলো—তারাই হয়তো প্রথম জেনারেশন, যারা ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন পরপর দেখেছে। অন্যদিকে কারও পোস্ট বলছে, আমরাই হয়তো প্রথম ও শেষ জেনারেশন, যাদের গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে, নস্টালজিক হওয়ার মতো অনেক স্মৃতি আছে!

এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যে একটি ধারণা বিদ্যমান। সেটি হলো—আমাদের দিন ভালো ছিল বা আমাদের সময়ের সবই ভালো ছিল। আর সূক্ষ্ম যে ঠেস থাকে, সেটি হলো এখন আর কী আছে! এখনকার ছেলে-মেয়ে কী আর বুঝেছে, কী আর শিখেছে, কী আর জানে! এটিকে সাধারণভাবে বলা হয় জেনারেশন গ্যাপ বা দুই প্রজন্মের মধ্যকার ব্যবধান। উল্টোদিকে তরুণ প্রজন্মকেও বলতে শোনা যায় যে, পুরোনোরা কি আর এতকিছু বোঝে! অর্থাৎ, দুই বা ততোধিক প্রজন্ম আদতে একে-অন্যকে উড়িয়ে দিতে চায় অবলীলায়। কিন্তু এই প্রবণতা কি স্বাভাবিক? এটি সুফল বয়ে আনে, নাকি কুফল?

সে আলোচনায় যাওয়ার আগে চলুন প্রজন্মের প্রকারভেদ নিয়ে একটু আলোচনা করে নেওয়া যাক। এ ধরনের প্রকারভেদ মূলত সময়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। একটি নির্দিষ্ট সাল বা সময়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরাই এক-একটি প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত হন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯০১ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের বলা হয় ‘গ্রেটেস্ট জেনারেশন’। ১৯২৮ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা যে প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত, সেটির নাম ‘সাইলেন্ট জেনারেশন’। এই দুই প্রজন্মের নামকরণের ক্ষেত্রে দুটি বিশ্বযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দার সম্পর্ক আছে। ঠিক তেমনভাবেই অধিক জন্মহারের বিষয়টি সম্পর্কিত ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া মানুষদের ক্ষেত্রে, তাদের বলা হয় ‘বেবি বুমার’। এর পর থেকেই শুরু জেনারেশন এক্স, ওয়াই ও জেড। জেনারেশন এক্স-এর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্ম ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়ারা ঢুকেছে জেনারেশন ওয়াই-এ। আর জেনারেশন জেড হচ্ছে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়ারা এবং এটিই এখন বেশির ভাগ দেশ ও অঞ্চলের সবচেয়ে তরুণ প্রজন্ম।

বছরের হিসাব অনুযায়ী সৃষ্ট প্রজন্মের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বটে। যেমন: সাইলেন্ট জেনারেশনের মানুষেরা চরিত্রগতভাবে খানিকটা প্রথানুসারী ঘরানার। বেবি বুমার’রা অনেক বেশি আদর্শবাদী ও পরিশ্রমী। জেনারেশন এক্স, ওয়াই ও জেড আবার অনেকটাই প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট। জেনারেশন এক্স যেখানে বস্তুবাদী, ওয়াই সেখানে সাধারণত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আর সর্বশেষ প্রজন্ম জেনারেশন জেড চূড়ান্ত মাত্রায় বাস্তববাদী। এদের যেমন দ্রুত শেখার সামর্থ্য আছে, তেমনি আনুষ্ঠানিক খাতের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করায় এদের আগ্রহ বেশি।

আমাদের দেশে মূলত জেনারেশন এক্স, ওয়াই ও জেডের মধ্যেই কথার লড়াই চলে বেশি। এক্স মনে করে, তাদের সময়টাই শ্রেষ্ঠ। একই বিষয় মনে করে ওয়াই-ও। আর জেড মূলত দুই জেনারেশনের চাপ পুরোপুরি ঘাড়ে নেয়। কারণ স্নেহের মতো অভিযোগও এ দেশে অনেকটাই নিম্নমুখী। সবার শেষে যেহেতু জেনারেশন জেড, তাই সব অভিযোগের দোষটাই তাদের ঘাড়ে এসে চেপে বসে জগদ্দল পাথরের মতো। নিজেদের সবকিছুকে ভালো দেখাতে গিয়ে তাই খারাপ হয়ে পড়ে পরবর্তী সব প্রজন্মই। বোধ হয়, ওই প্রজন্ম বাদে পরবর্তী বাকি সবই যেন উচ্ছন্নে গেছে!

অবশ্য এই প্রবণতা পৃথিবীর বুকে নতুন কিছু নয়। বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটলও গ্রিসের তৎকালীন তরুণদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন এই বলে যে, ‘তারা ভাবে তারা সব জানে এবং এ ব্যাপারে তারা একেবারে নিশ্চিতও।’ এমন কথার গভীরে লুকিয়ে থাকা খোঁচা অনুভব করা অসম্ভব কিছু নয়। তেমনি বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় ছড়িয়ে পড়া ‘আমরাই হয়তো প্রথম বা শেষ জেনারেশন’ ঘরানার বক্তব্যগুলোতেও অন্য প্রজন্মকে বঞ্চিত, দুর্ভাগ্যবান এবং অনেকাংশে ‘ওরা আর কী বোঝে বা জানে’ বলার একটা চেষ্টা সুস্পষ্ট থাকে। এর পাল্টা দেয় পরবর্তী প্রজন্মগুলোও। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এক ধরনের বৈরি আবহের সৃষ্টি হয়। আর তার প্রভাব পড়তে পারে সব ক্ষেত্রেই।

এই পরিস্থিতির প্রভাব যেমন সামাজিকভাবে পড়ে, তেমনি একটি জাতির মানসিক গঠন তৈরিতেও এর প্রভাব ব্যাপক। জেনারেশন গ্যাপ যখন অতি মাত্রায় বৈরি আবহ সৃষ্টি করে, তখন তা একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথে অন্তরায় তৈরি করে। কারণ এটি সামষ্টিকভাবে এক হতে বাধা দেয়, তৈরি করে বিভক্তির চরম রূপ। আর এর কুপ্রভাব তখন গিয়ে পড়ে উৎপাদনশীলতা তথা অর্থনীতিতেও। এ ব্যাপারে থাইল্যান্ডের অবস্থাকে বিবেচনায় ধরে একটি গবেষণা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। গবেষণার শিরোনাম ছিল—‘Generation gap and its impact on economic growth’। ২০২১ সালের জুনে গবেষণাপত্রটি সায়েন্স ডাইরেক্টে প্রকাশিত হয়েছিল। এতে দেখা যায়, জেনারেশন গ্যাপ মারাত্মক রূপ নিলে তা পুরো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ কোনো প্রজন্মই যখন একে-অপরকে গ্রহণ করতে পারে না, তখন তা অর্থকরী বিভিন্ন কাজে একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এতে অর্থনৈতিক উন্নতিও শ্লথ হয়ে যায়। এই গবেষণায় জেনারেশন গ্যাপ কমানোর ক্ষেত্রে সরকার ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এক প্রজন্মের প্রতি আরেক প্রজন্মের সহিষ্ণুতা ও হৃদ্যতা বাড়ানোয় উদ্যোগী হওয়ার কথাও বলেছেন গবেষকেরা।

আমাদের দেশেও কিন্তু এমন পরিস্থিতির দিকেই ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ধারণা ও ভাবনার প্রতি এ দেশের পুরোনো প্রজন্মের ব্যক্তিরা সত্যিকার অর্থে কতটুকু শ্রদ্ধাশীল—তা এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন বটে। উল্টোদিক থেকে পুরোনো প্রজন্মের ধ্যান-ধারণার প্রতি নব প্রজন্মের শ্রদ্ধাবোধের গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে কেবলই অন্যকে নিচে নামাতেই ব্যস্ত। ফলে বাহাসে সবাই মিলেই আসলে নিচে নেমে যাচ্ছি। এর চেয়ে পরিবর্তন মেনে নেওয়া ও অন্যের প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধাবোধের চর্চা থাকলে সহজেই এমন ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু সেই সহিষ্ণুতার চর্চা তো আমাদের দেশে জাতীয়ভাবেই অপ্রতুল। এর গণচর্চা তাই হয়ে যাচ্ছে ডুমুরে ফুল।

গবেষকেরা মনে করেন, মূলত দুটি কারণে পূর্ববর্তী প্রজন্ম তাদের সময়কেই শ্রেষ্ঠ মনে করে থাকে। এর পেছনে প্রথমত, বর্তমান প্রজন্মের ত্রুটি ধরার ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটি প্রবণতা কাজ করে। অর্থাৎ, নব প্রজন্মের শুধু ত্রুটিগুলোই আমরা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাই এবং নিজেদের প্রজন্মের সঙ্গে তুলনায় গিয়ে সেটিকে নিচে নামিয়ে আনি। দ্বিতীয় কারণটি হলো—নিজেদের সময়ের স্মৃতিকাতরতায় ভোগা। অর্থাৎ, ওই স্মৃতির প্রতি আমাদের যুক্ততা গভীর থাকে এবং আমরা অনুরক্ত বেশি থাকি। ফলে আমরা শুধু সেই স্মৃতির সঙ্গেই বর্তমানের হ্রাস-বৃদ্ধিকে তুলনায় নিয়ে আসি এবং নিজেদের ফেলে আসা সময়কে ওপরে তোলার চেষ্টা করতে থাকি।

সব মিলিয়ে বলাই যায় যে, জেনারেশন গ্যাপ আমাদের বাংলাদেশেও ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই পূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের রমরমা সময় সেটিকে আরও তীব্র করে তুলছে অবশ্যই। অথচ আদতে প্রত্যেকটা সময় তার মতো করেই পরিপূর্ণ ও উজ্জ্বল হতে পারে। তাই কাউকে ছোট করে নয়, বরং পরিবর্তনকে সহজে গ্রহণ করতে পারলেই কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অবশ্য সেই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের চেয়ে এ দেশের সব প্রজন্মই এখন ওপরে ওঠার মই খুঁজতে এবং না পেলে তার নির্মাণেই বেশি আগ্রহী। আর এই প্রবণতাটিই ক্ষতিকর। কিন্তু আশায় বাঁচে চাষা! তাই আশা করতে তো দোষ নেই যে, হয়তো কোনো একদিন আমরা এসব থেকে বেরিয়ে সহিষ্ণুতার চর্চা করতে পারব। তখন হয়তো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ওয়ালজুড়ে কিছুটা কমই দেখা যাবে প্রথম ও শেষ প্রজন্ম বিষয়ক কচকচানি। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া আর গত্যন্তর কী!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
এখনও যদি ভিন্নমত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সামাজিক বিভাজন ও সম্প্রীতি নষ্টের মতো গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ফ্যাসীবাদী সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্রে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? তবে...
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যায় বর্তমানে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। সেই ২০২২ সাল থেকেই বেশি। একটি দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বিতর্কিত করে, দমন করার চেষ্টা করে, কেবলই পুরুষের যৌনবস্তু...
প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত এবং তা সহজে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চিকিৎসকেরা যেন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার...
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় সাতক্ষীরাযর রসুলপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাফিজুর রহমান ওরফে লালটু নামে এক আর্জেন্টিনার সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি...
দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। অভিযান শুরুর পর ককরোচ জনতা পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে হতাহতদের বিষয়ে...
লোডিং...

এলাকার খবর