অষ্টম অ্যালবাম ‘বাতিঘর’ মুক্তি দিতে যাচ্ছে দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীন। এরই মধ্যে গানগুলোর রেকর্ডিং থেকে শুরু করে ভিডিওচিত্র নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত বছরের শেষদিকে থাইল্যান্ডে হয়েছে বেশ কিছু গানের দৃশ্যধারণ। শুটিং হয়েছে দেশের মাটিতেও। শিগগিরই ভারতে হতে যাচ্ছে আরও কিছু কাজ। ব্যান্ডটির বেজিস্ট ও দলনেতা জিয়াউর রহমান জিয়া জানালেন, অ্যালবামের ১০টি গানের মধ্যে ৫টি গানের ভিডিও ধারণের কাজ সম্পন্ন। প্রথমে মুক্তি পাবে টাইটেল সংগীত বাতিঘর গানটি। এরই মধ্যে এর ভিডিওচিত্র ধারণের কাজও পুরোপুরি সম্পন্ন। তবে এখনই মুক্তি না দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে স্পন্সর খুঁজে পাওয়ার জটিলতা।
গীতিকার ও বেজিস্ট জিয়াউর রহমান জিয়া বললেন, ‘পরিকল্পনা ছিল এ বছরের শুরুর দিকেই বাতিঘর গানটি মুক্তি দেওয়ার। কিন্তু স্পন্সর না পাওয়ায় সেটা আর সম্ভব হয়নি। শ্রোতারা প্রায়ই আমাদের কাছে অ্যালবামটির বিষয়ে জানতে চায়। তবে স্পন্সরের কারণে একটু দেরি হচ্ছে।’
বাতিঘর অ্যালবামটি সাজানো হয়েছে ১০টি গানে। ভক্তদের জন্য থাকছে দারুণ কিছু সারপ্রাইজ। জানা গেছে, প্রতিটি গান প্রকাশিত হবে তিনটি ভার্সনে। একটি ভিডিওচিত্র, দ্বিতীয়টি পারফরম্যান্স ও তৃতীয়টি লিরিক্যাল ভার্সন। অর্থাৎ প্রত্যেক গানের তিনটি করে ভার্সন হলে মোট ৩০টি কনটেন্ট। এ ছাড়া ‘এই অবেলায় ২’ ও ‘জানে না কেউ’ নামের গান দুটি আসছে ইংরেজি ভার্সনে। ইতিমধ্যে ভাষান্তর করে সেগুলোর রেকর্ডিংও সম্পন্ন। সব মিলিয়ে, এই অ্যালবামে থাকছে ৩২টি কনটেন্ট।

এত নতুন কিছুর সমারোহ যে অ্যালবামে, তা নিয়েই স্পন্সর জটিলতা পেয়ে বসেছে ব্যান্ডটিকে। কেন এমনটা হচ্ছে—জানতে চাইলে জিয়া জানান, বিগ বাজেটের প্রজেক্ট এই অ্যালবাম। প্রথমদিকে বাজেট ছিল দেড় কোটি টাকা। কিন্তু ইতিমধ্যে সেই বাজেট ছাড়িয়ে গেছে। আর ব্যান্ড মিউজিকের ক্ষেত্রে স্পন্সর খুঁজে পাওয়াই এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বললেন, ‘আমাদের বামবার (বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন) সভাপতি হামিন আহমেদ বলেছিলেন, আমাদের দেশের গর্ব করার টপিক আসলে দুটি। এক হচ্ছে ক্রিকেট খেলা, আরেকটি ব্যান্ড মিউজিক। আমার মনে হয় তিনি খুবই সঠিক কথা বলেছেন। এবং আমরা যথেষ্ট গর্ব করার সুযোগ পাই—যখন আমাদের দেশের ব্যান্ড মিউজককে বিশ্বের অন্যান্য ব্যান্ড মিউজিকের সাথে দাঁড় করাতে পারি। কারণ মানগত জায়গা থেকে আমরা খুব বেশি পিছিয়ে নেই। হয়তো সমসাময়িক বা একই স্কেলের স্কিলটা আমরা প্রদর্শন করতে পারি। তো এই জায়গা থেকে করপোরেট কোম্পানিগুলোর পেট্রোনাইজিংয়ের (পৃষ্ঠপোষকতা) একটা দায়িত্ব থাকে। এটাকে বলে করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি। কারণ একটা দেশের মেরুদণ্ড হচ্ছে তার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্প। তো এই জায়গাগুলোতে যখন আমরা পিছিয়ে যাই তখন একটা দেশ সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে যায়। তার অগ্রগতি বলতে কিছুই থাকে না। সেই ক্ষেত্রে করপোরেট কোম্পানিগুলোর ব্যান্ড মিউজিককে পেট্রোনাইজ করার দায়িত্ব নিতে হবে; তাঁদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে আনতে হবে। চিজি বা আজেবাজে কনটেন্ট যেগুলো ভাইরাল হিসেবে খ্যাত হয়, সেখানে পেট্রোনাইজিং থেকে বিরত থেকে আর্টের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। আর্টে পেট্রোনাইজ করাটা খুব জরুরি।’
শিরোনামহীনের মতো জনপ্রিয় ব্যান্ডকেও যদি স্পন্সরের অভাবে ভুগতে হয়, তাহলে অন্য কিংবা নবাগত ব্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতার পরিস্থিতি আরও নাজুক পর্যায়ে বলে মনে করেন জিয়াউর রহমান জিয়া। সামগ্রিক পরিস্থিতির একটা চিত্র তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘শুধু শিরোনামহীনের জন্য বলছি না, আমাদের দেশের ব্যান্ড মিউজিক আমাদের গর্ব। এবং সেখানে এগিয়ে আসাটা করপোরেট কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব বলে মনে করি। যাতে আমাদের স্ট্রাগল না হয়, আমরা যাতে পরবর্তী কাজ করার জন্য অনুপ্রেরণা পাই। আমাদের প্রতিটা কাজে যথেষ্ট ব্যয় হয় এবং সেই ব্যয়টা যদি কোনোভাবে তুলতে না পারি, অনেক পিছিয়ে যাই—তাহলে পরবর্তী কাজটি করার আগ্রহ কিন্তু শিল্পীরা হারিয়ে ফেলবে। যেটা আমরা উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছি।’

উদাহরণ টেনে তিনি আরও বললেন, ‘‘আমাদের দেশের স্বনামধন্য ব্যান্ডগুলো কিন্তু নতুন গান বা নতুন সৃষ্টি নিয়ে খুব বেশি মনোযোগী হতে পারছে না। অনেক বেশি রিলিজ হচ্ছে না। নব্বই দশকে অনেক বেশি রিলিজ হতো, যে কারণে ওই সময়কে আমরা ব্যান্ড মিউজিকের ‘গোল্ডেন টাইম’ মনে করি। অনেক বেশি গান রিলিজ হয়েছে তখন, তাই আমরাও অনেক ভালো ভালো ক্রিয়েশন শুনতে পেয়েছি। এখনও সেই সুযোগ আছে, আমাদের ক্রিয়েটিভিটি হারিয়ে গেছে সেটা আমি মনে করি না। কিন্তু আমাদের পেট্রোনাইজিং যে হারিয়ে গেছে সেটা দেখাই যাচ্ছে। আমাদের বর্তমান বাজারে এই জায়গাটি নিয়ে যদি চিন্তিত না হই, তাহলে আমাদের ক্রিয়েশনও হারাবে। আমাদের শিল্প হারিয়ে যাবে এবং নতুন ক্রিয়েশন আসবে না। আর এই সেক্টের এমন নয় যে সরকারের কোনো সহযোগিতা আছে, কখনও কিন্তু সরকারি অনুদানে ব্যান্ড মিউজিক হয়েছে এমন ইতিহাস নেই; আমরা শুনিওনি। অন্যান্য সেক্টরে সরকারের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে, অনুদান থাকে। এখন সেটাও যেহেতু আমাদের জন্য নেই, তাই একমাত্র করপোরেট জায়গাগুলোতে ভরসা বা স্পন্সরের ওপর নির্ভর করা ছাড়া শিল্পীদের বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। সুতরাং তাঁদের সহযোগিতায় কিন্তু আমরা যেকোনো ব্যান্ড নতুন ক্রিয়েশনের দিকে এগিয়ে আসতে পারব। আমাদের দেশের ব্যান্ডগুলোর সম্ভাবনা অত্যন্ত ভালো, এখন স্পন্সরদের সদিচ্ছা আমাদেরকে এগিয়ে নিতে পারে।’’
প্রসঙ্গত, শিরোনামহীনের সবশেষ প্রকাশিত অ্যালবাম ছিল ‘দ্যা অনলি হেডলাইনার’। বই আকারে এটির একটি সংকলনও এসেছিল। জানা যায়, বাতিঘর নিয়েও তেমনই পরিকল্পনা করেছে ব্যান্ডটি।
বর্তমানে শিরোনামহীনের লাইনআপে রয়েছেন জিয়াউর রহমান জিয়া (বেজিস্ট ও গীতিকার), কাজী আহমাদ শাফিন (ড্রামার), শেখ ইশতিয়াক (ভোকালিস্ট), সাইমন চৌধুরী (কি-বোর্ডিস্ট) ও দীপু সিনহা (গিটারিস্ট)।


আসছে সুনিধির প্রথম অ্যালবাম ‘আড়ালে’
নতুন অ্যালবামে আসছে ‘এই অবেলায় ২’
