আ মরি বাংলা ভাষা

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:১৩ এএম

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমার প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার জয়গান গাইতে হয়। ভাব থেকেই ভাষার উদ্ভব। আবার, ভাবপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম ভাষা। তাই ভাব ও ভাষার সম্পর্ক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। অন্যান্য প্রাণীর থেকে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হিসেবে মানুষের উন্নত অবস্থান অনেকাংশে ভাষার সূত্রেই। মনুষ্য সমাজের অন্যতম সংযোজক সূত্র ভাষা। তাই সমাজ পরিবর্তনের ছাপ ভাষা ধারণ করবে, সেটিই স্বাভাবিক। ভাষা বিশ্লেষণ করে একটি সমাজ বা গোষ্ঠীর চারিত্রিক বিশ্লেষণও নিপুণভাবে করা সম্ভব। মানবগোষ্ঠীর মতো ভাষাও নানা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন নিজের অবয়বে গ্রহণ ও আত্তীকরণ করেই সমৃদ্ধ আর সচল থাকে। পৃথিবীতে যেকোনো শক্তিশালী ভাষার ক্ষেত্রে এমনটাই হয়ে থাকে।

যেকোনো ভাষারই সহজাত প্রবণতা ও ক্ষমতা থাকে অন্য ভাষা থেকে শব্দ আত্মসাৎ করার, ঋণ গ্রহণ করার। বাংলা ভাষা সেটা করেছে, এবং করছে।

ভাষা হিসেবে বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই সমৃদ্ধির মূলে রয়েছে বাংলার বিস্তৃত শব্দভাণ্ডার। বিভিন্ন ভাষার শব্দ গ্রহণে ও আত্মীকরণে বাংলা ভাষা অত্যন্ত উদার।

বাংলাভাষার শব্দভাণ্ডারে বহিরাগত শব্দের সংখ্যা বিপুল। সেটা যেকোনো ভাষার সজীবতার লক্ষণ। সুদীর্ঘকাল তুর্কি-আফগান ও মুঘল শাসনের প্রভাবে আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দের অনুপ্রবেশ সর্বাধিক—প্রায় হাজার তিনেক। তা ছাড়া পর্তুগিজ শ’খানেক, কিছু ওলন্দাজ ও চীনা, আর হাজার দেড়েক ইংরেজি। অনুপ্রবেশ পর্যবসিত হয়েছে আত্মীকরণে।
আজব, আসবাব, এলাকা, উকিল, ওজন, কায়দা, খাতির, খারিজ, জরিমানা, জ্বালাতন, দাবি, বাকি, মতলব, মেজাজ, মেহনত, হাওয়া, হুকুম—এসব শব্দকে কি আমরা আরবি ভেবে ব্যবহার করি?

তেমনি আন্দাজ, কোমর, খরচ, খরিদ্দার, গরম, চশমা, চামচ, চাকর, দরখাস্ত, দরজা, দোকান, নরম, পছন্দ, বন্দোবস্ত, বাজার, রুমাল, সবুজ, সরকার, সরঞ্জাম, এমনকি হিন্দুও যে ফারসি শব্দ, তার খবর কে রাখে?

এখনো আইন–আদালতে ব্যবহৃত বহু পরিভাষাই ফারসি। তুর্কি শব্দের কিছু উদাহরণ—আলখাল্লা, উজবুক, কাঁচি, কাবু, কুলি, দারোগা, বাবুর্চি, বাবা, বারুদ, বোঁচকা। পর্তুগিজ—আনারস, আলমারি, ইস্পাত, চাবি, জানালা, পেঁপে, পেরেক, বোতাম, বারান্দা, ইত্যাদি।

বলা বাহুল্য, এসব বিদেশি শব্দের আসল রূপ, আর উচ্চারণ বদলেছে বাংলায়। এমনকি অর্থের পরিবর্তন ঘটেছে কিছু শব্দের, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা নিদারুণভাবে। যেমন, ফারসিতে বুজুর্গ শব্দের অর্থ মহৎ বা সাধুব্যক্তি, বাংলায় বুজুর্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে বুজরুক এবং তার অর্থ হলো—প্রতারক বা ঠগ। ইংরেজি থেকে বাংলায় এসেছে অর্ডার, উল, কলেজ, কাটলেট, কার্পেট, কেরোসিন, চেক, চেয়ার তাদের নিজস্ব রূপে; আপেল, আপিল, ইঞ্চি, স্কুল, টেবিল, ডাক্তার, বুরুশ, বেঞ্চি, হাসপাতাল পরিবর্তিত রূপে। General-কে জাঁদরেল, lamp-কে ল্যাম্ফো করে নিতে অসুবিধা হয়নি আমাদের।

হিন্দি থেকে বাংলায় এসেছে—রুটি, পুরি, মিঠাই, কামাই, জলদি ইত্যাদি। ভারতীয় সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান চাপে সম্প্রতি নতুন কিছু হিন্দি শব্দের সংযোজন ঘটেছে ও ঘটছে। অবিরামের জায়গায় লাগাতার, বোঝাপড়ার জায়গায় সমঝোতা, দেখাশোনার জায়গায় দেখভাল প্রায় কায়েমি হয়ে বসেছে কথ্য ও লিখিত বাংলায়।

বাঙালি বিদেশি ও বহিরাগত শব্দকে চিরকাল নিজের মতো করে উচ্চারণ করে এসেছে— যেমন পার্লামেন্ট বা রেস্টুরেন্ট। সেটাই বাঙালিয়ানা। নিজের ভাষার শব্দ অন্য ভাষার ঢঙে উচ্চারণ নিজের ভাষার অমর্যাদা করা। কিছু ব্যক্তি ফেস, গেট, ফেক, কেক-এর বদলে ফেইস, গেইট, ফেইক, কেইক ইত্যাদি লেখার চেষ্টা করেন। এটাও বাড়াবাড়ি, ভাষার অমর্যাদা।

ভাষা বদলে যায়, শব্দও বদলায়, বদলায় মানে। যেমন ‘অংশীদারি’ থেকে ব্যাকরণসম্মত ‘অংশীদারত্ব’-র জায়গায় ‘অংশীদারিত্ব’ স্থান পেয়েছে বিভিন্ন বানান অভিধানে, কিন্তু সংসদ বাংলা অভিধানে শুধুই ‘অংশীদারি’। বোঝা যাচ্ছে, কিছু তৎসম শব্দ, অনভিপ্রেত হলেও, বাংলায় ব্যবহারিক ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়েছে—বানানে ও অর্থেও। অর্থ পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ‘ফলশ্রুতি’-র। এর আদি অর্থ হলো কর্মের বা পুণ্যকর্মের ফল বর্ণনা ও তার শ্রবণ, কিন্তু বাংলায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে পরিণাম বা ফলাফল। নানা আপত্তি সত্ত্বেও এই ‘অপপ্রয়োগ’ ঠেকানো যায়নি। তেমনি আরেক অপপ্রয়োগ—বক্তব্য পেশ করা বা উপস্থাপন করার বদলে ‘বক্তব্য রাখা’—কায়েম হয়ে বসেছে।

ঊনবিংশতিতম বা বিংশতিতমের জায়গায় সরলীকৃত ঊনিশতম বা বিশতমের ব্যবহারও তাই।

আবার কিছু ইংরেজি শব্দের মানে নিজের মতো করে আমরা আত্তীকরণ করেছি। পাঁঠা বা খাসির মাংস বলতে ব্যবহার করা হয় মাটন। কিন্তু মাটনের আসল মানে ভেড়া বা মেষের মাংস।

কেউ কেউ বলেন, বহুব্যবহৃত হলে ভুলটা আর ভুল থাকে না। তাহলে আমি আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি না— এখানে ‘ব্যবহার’ কথাটা হওয়া উচিত ‘আচরণ’। বিহেভিয়ার তো তা-ই হয়। আমি অ্যাপ-টা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি না। এখানে ‘ইউজ’। কিন্তু ‘ব্যবহার’ কথাটা যত্রতত্র ব্যবহার করি।

সংবাদপত্রে প্রায়ই ‘ভোর রাতে’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। প্রায়ই লেখা বা বলা হয় ‘এ জাতীয়’। হওয়া উচিত ‘এ ধরনের’ বা এ রকম। ন্যাশনাল-ই জাতিগত বা জাতীয়। যেমন, জাতীয় ক্রিকেট দল, জাতীয় আয়, জাতীয় পশু, জাতীয় সংগীত, জাতির জনক।

শূন্য রান-টা কী? ডাক মানে 0। শূন্য রান কেন? আমরা নিয়মিত ব্যবহার করি বোলিং করা, ব্যাটিং করা—পাশাপাশি দুটো ক্রিয়াপদ, তারপরও আমরা ব্যবহার করি। অনেকের কাছে সর্বজনীন এখনো ‘সার্বজনীন’ হয়ে আছে।

কোনো কোনো বাসে এখনো লেখা আছে ‘বাস না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন’। Till Stop-এর এ কেমন তর্জমা! তা হলে তো বাস থামবে না। ঠিক হতো—‘বাস থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন’। ‘মন্ত্রী না আসা পর্যন্ত সভা হবে না’, এটা তো ভুল। হওয়া উচিত ‘মন্ত্রী এলেই সভা হবে’।

আর মুঠো তো হাতেই। হাতের মুঠো কেন লেখা হবে? কোয়েশ্চেন-এর মানে প্রশ্ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা, তিস্তা সমস্যা হোক। ‘তিস্তা প্রশ্নে’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে’ কেন হবে?

তবে ভিন্ন যুক্তিও আছে। ভাষা সব সময়ই বদলের মধ্যে দিয়ে অন্য রূপ নেয়। নতুন শব্দ যোগ হয়, কখনো একই শব্দে যোগ হয় ভিন্ন অর্থ। জীবন্ত ভাষা অনেক কিছু আত্মস্থ করে।

প্রতীকী ছবিযেমন ‘অনেক কিছু’ কথাটা। ‘কিছু’ এমনিতে ‘অনেকের’ বিপরীত শব্দ। কিন্তু এখানে সেটি ‘আইটেম’ অর্থে ব্যবহৃত। যেমন ‘পথে পথে পাত্র ভরেছি/ অনেক কিছু দিয়ে’। (রবীন্দ্রনাথ)

‘বিহেভিয়র’-এর বাংলা ‘ব্যবহার’ ও ‘আচরণ’ দুইই হতে পারে এবং হয়ে আসছে। অভিধানসম্মত। ‘আমি যন্ত্রটার ব্যবহার জানি না’ এক অর্থে। অন্য অর্থে ‘ব্যবহারই বংশের পরিচয়।’ অশুদ্ধ বলা যাবে কি?

যেমন আমরা ব্যবহার করি- ‘মরণ বাঁচন লড়াই’। লড়াইয়ে জিততে না পারলে মরণ অবশ্যই আসবে—এ অর্থে ‘মরণ বাঁচন লড়াই’। মরার জন্য লড়াই নয়।

‘চশমা পরে পড়ছে’ বললে কাজ মিটে যায়। তবে ‘চোখে চশমা পরে পড়ছে’ বললে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না!

নতুন শব্দ তৈরি হচ্ছে। ডাক্তার সাহেব যখন কোনো রোগীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘রাত্রে কি অনেকবার বাথরুম হয়েছে?’ বিশেষ্যপদের ক্রিয়াতে রূপান্তর। আমাদের বাথরুম পায়। টয়লেট করি। আমাদের মাতৃভাষা মায়ের মতো—এ সবকিছুকেই কোল পেতে দিচ্ছেন! এখানেই বাংলাভাষার মাহাত্ম্য!

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

পৃথিবীর জনসংখ্যার মোট ওজনের সমান প্লাস্টিক প্রতিবছর উৎপাদিত হয় (সূত্র: আর্থডে)। যদি বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক ব্যবহারের ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ২০৫০ সালের ভেতর ১,১০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হবে।...
আমার মায়ের হাতে আমরা ভাইবোনেরা কখনো মার খাইনি। মায়ের তাকানোতেই আমরা বুঝে নিতাম, মা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। যদি‑বা না বুঝতাম, উনি তখন আমাদের ‘তুমি’ সম্বোধন করতেন। তাঁকে সেই ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ সম্বোধনে...
আমার মা’র পক্ষে রাজনীতিতে আগ্রহী হওয়ার কথা ছিল না। তিনি হনও-নি, কিন্তু বিদ্যমান রাজনীতির ঝাপ্টা তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে বৈকি, বৃক্ষ যেমন সহ্য করে ঝড়কে। রাষ্ট্রের উত্থানপতন দেখেছেন, টের পেয়েছেন,...
শাসক শ্রেণি নিজেদের টার্গেট পূরণে বিশাল কর্মকাণ্ডের জাল বিস্তার করেছে। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পূর্ণটাই পরিকল্পনাহীন। শাসক শ্রেণি স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে এ পর্যন্ত কোনোদিন ভেবেও দেখেনি দেশ ও...
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর