ভারতীয় লোকসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে শুক্রবার (১৯ এপ্রিল)। সাত দফার এই দীর্ঘ নির্বাচনের আগে মাঠে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), কংগ্রেসসহ অন্যান্য দলগুলো। তবে প্রচারে সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইউটিউব। আর এ মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে ইউটিউব ব্যবহারকারী ৪৬ কোটি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বলছে, ইউটিউবের সবচেয়ে বড় বাজার ভারতে প্রতি পাঁচজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে চারজনই ইউটিউবে কনটেন্ট দেখেন। আর এদের বেশির ভাগই সংবাদ দেখেন। নির্বাচন আসার সাথে সাথে তাই ইউটিউব নির্ভরতা আরও বেড়ে গেছে।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে সাংবাদিক কুনাল পুরোহিত বলছেন, এই সুযোগটাই নিচ্ছেন অনেক ইউটিউবার ও সংবাদমাধ্যম। উদাহরণ হিসেবে বেশ কিছু ভিডিওর কথা বলেছেন তিনি। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফিলিস্তিনের প্রতি সমবেদনা জানানো এক মুসলিম ব্যক্তিকে সাংবাদিক প্রশ্ন করছেন, ‘পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে হিন্দুদের ওপর এভাবে নির্যাতন হলে আপনি কি এই সমবেদনা জানাতেন?’
আরেকটি চ্যানেলে তো এক মুসলমান ব্যক্তিকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘অযোধ্যায় পুরোনো মসজিদ ভাঙার পর সেখানে রাম মন্দির বানানোর কারণে মুসলিমরা কি খুশি হয়েছে?’ আরেকটি চ্যানেলে এক উপস্থাপক সরাসরি বলে দেন, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের কেরালা রাজ্যকে ‘ইসলামিক স্টেট’ বানানোর পাঁয়তারা চলছে। এই মন্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ তো নেই-ই, কোনো যুক্তিও দিতে পারেননি তিনি।
নির্বাচনের আগে ভারতের ইউটিউব চ্যানেলগুলোর কনটেন্টের এই অবস্থাই চলছে এখন। আলজাজিরার ওই প্রতিবেদনে সাংবাদিক কুনাল পুরোহিত বলছেন, এসব চ্যানেল নামে সংবাদনির্ভর হলেও সংবাদের পরিবর্তে ছড়াচ্ছে গুজব ও মুসলিমবিদ্বেষী কথাবার্তা। আর তাতে আখেরে লাভটা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল বিজেপির।
ইউটিউব চ্যানেলে এভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু ভারতের এসব চ্যানেল সংবাদ প্রচারের নাম করে ভুল তথ্য দিচ্ছে। এসব প্রচারের পাশাপাশি মোদির দল বিজেপিও প্রচার চালাচ্ছে। প্রচলিত সংবাদমাধ্যম না হলেও এদের রয়েছে কোটি কোটি দর্শক।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে এনএমএফ নিউজের কথা। ভারতের শীর্ষ এক শ সংবাদ ও রাজনীতি-নির্ভর ইউটিউব চ্যানেলের মধ্যে এটি একটি। ১ কোটি ৮২ লাখ সাবস্ক্রাইবার। তাদের ভিডিও মোট দেখা হয়েছে ৮১০ কোটিবার। এ ছাড়া হেডলাইন ইন্ডিয়া, রাজধর্ম নিউজের দেখার প্রবণতাও অনেক। 
এত বেশি মানুষের যুক্ত থাকার কারণেই নির্বাচনের আগে ভারতের নাগরিকদের চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারটি আসছে। গবেষণা বলছে, ভারতীয়রা সংবাদের ক্ষেত্রে ইউটিউব ও হোয়াটস অ্যাপকে বেশি বিশ্বস্ত বলে মনে করে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এখানে পিছিয়ে। চলতি বছর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট বলছে, এসব কারণে ভারতে ভুয়া সংবাদ প্রচারের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
এমন অভিযোগে প্রথম দিকে রয়েছে এনএমএফ নিউজ। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঝাড়খন্ডে প্রতিষ্ঠানটির ব্যুরো প্রধান বলছেন, তাঁরা তথ্য পরীক্ষা করেই সংবাদ প্রকাশ করেন। তবে, তারা ডানপন্থী। হেডলাইন ইন্ডিয়া, রাজধর্ম নিউজ এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি।
গুজব আর প্রচারের ‘খেলা’
এনএমএফ নিউজের বেশ কয়েকটি কনটেন্ট দেখলে ব্যাপারটি বোঝা যাবে। এর মধ্যে তিন মিনিটের একটি ভিডিওতে নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারবিরোধী ও বাম রাজনীতির দিকটি তুলে ধরা হয়। এতে মোদির পক্ষের নেতাদের অভিযোগকেই বারবার উল্লেখ করা হয়। এমনকি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সংবাদ দেখা যায়। তাদের ইউটিউব চ্যানেলে প্রতিদিনই এমন সংবাদ প্রচার হচ্ছে।
শুধু এনএমএফ নিউজ নয়, এসব প্রচারে যুক্ত আরও অনেক চ্যানেল। নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যারেটিভ রিসার্চ ল্যাব বলছে, হেডলাইন ইন্ডিয়া, রাজধর্ম নিউজ, শাইনিং ইন্ডিয়া, ক্যাপিটাল টিভি, ও নিউজ হিন্দি পক্ষপাতমূলক সংবাদ প্রচার করছে। এসব সংবাদে মোদিবিরোধী নেতাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। উল্টোদিকে বিজেপি ও মোদির ছবি ও সংবাদে সয়লাব। 
২০২৩ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২২ মার্চ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ভিডিও বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য দেয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যারেটিভ রিসার্চ ল্যাব। বেশির ভাগ ভিডিওতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ মোদি, বিজেপি ও যোগী। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ নারভানি বলেন, বিরোধীদের নির্মূল করতেই এরা কনটেন্ট বানায়।
নয়াদিল্লিভিত্তিক ক্যারাভান ম্যাগাজিনের সাংবাদিক নীল মাধব বলছেন, এসব চ্যানেলের সঙ্গে বিজেপি সরাসরি যুক্ত। বিজেপি এদের অনেক ভিডিও শেয়ার করে।
মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ছেই
আলজাজিরার ওই প্রতিবেদনে সাংবাদিক কুনাল পুরোহিত বলছেন, সমাজে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব ছড়াতে কাজ করে যাচ্ছে এসব ইউটিউব চ্যানেল। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে রাম মন্দির উদ্বোধনের আগে রাজধর্ম নিউজের প্রতিবদনেই ব্যাপারটি স্পষ্ট। ওই সময় স্থানীয় মুসলমানদের যে ধরনের প্রশ্ন করা হয়, তাতেই বোঝা যায় প্রতিবেদন কতটা ইসলামবিদ্বেষী।
প্রশ্নগুলো ছিল এমন, ‘সবাই বলছে, এখানে মন্দির বানানোর কারণে মুসলমানরা অনেক খুশি হয়েছে। তারা দিওয়ালির মতোই উৎসব করছে। এটা কি সত্য?’, ‘কিছু মুসলমান বলছেন, রাম তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন, এটি কতটা সত্য?’, ‘আপনি কি মনে করেন ২২ জানুয়ারি মন্দির উদ্বোধনের সময় মুসলমানরা শান্ত থাকবেন?’
তিন দশক আগে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে বিজেপির আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিলে আড়াই হাজার মানুষ মারা যায়। তা নিয়ে আজও মনস্তাত্বিক খেলা চলছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনগুলোতে এটি স্পষ্ট।
গত বছরের জুলাইয়ে হরিয়ানা রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় রাজধর্ম নিউজ তাদের প্রতিবেদনে এক মুসলমান ব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হয়, হামলার কারণে তিনি ভালো বোধ করছেন কিনা। বলা হয়, মুসলমানদের কোনো ক্ষতি না করার পরও তারা কেন হিন্দুদের ওপর চড়াও হচ্ছে। এই ভিডিও ইউটিউবে প্রায় ৮ লাখবার দেখা হয়েছে।
ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের পক্ষে অনেক ভিডিও প্রকাশ করে এসব চ্যানেল। এমনকি মুসলমানদের যুক্ত না করার ব্যাপারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়।
গুজব ছড়ানো ও হিংসাত্মক মন্তব্য প্রচারের ব্যাপারে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা বারবার বলে আসছে ইউটিউবসহ ভিডিও মাধ্যম। এমনকি এর জন্য তাদের বিশেষ টিম রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতে দেদারসে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। নির্বাচন কেন্দ্র করে তা আরও বেড়েছে। এতে বিরোধীরা আরও নির্মূল হবে এবং গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে বলেই মনে করছেন বিজেপিবিরোধীরা।



