বিয়ের আগে চুটিয়ে প্রেম করা মানুষটিই দেখা যায়, বিয়ের পরে অন্যরকম। যার সঙ্গে দিনের পর দিন পাশাপাশি হেঁটেছেন, টংয়ের দোকানে বেঞ্চে বসে চা খেয়েছেন অথবা কোনো দামি রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করেছেন, সেই মানুষটির সঙ্গেই যখন এক ছাদের নিচে থাকতে শুরু করলেন, তখন তাকে আর চেনা যায় না। কেমন যেন ভিন্ন এক মানুষ। রোজ খুটখাট ঝগড়াঝাটি লেগেই আছে। এক বিছানায় শুতে গিয়ে ঠিকঠাক ঘুমানোই যাচ্ছে না নিত্য ঝগড়ার কারণে।
এমন পরিস্থিতিতে আপনি আপনার সঙ্গীকে ‘স্লিপ ডিভোর্স’ দিতে পারেন। ভয় পাওয়ার কারণ নেই, এটি ‘বিবাহবিচ্ছিদ’ ধরনের কিছু নয়। বরং ঘুমের সময় আলাদা বিছানার ঘুমানোর নামই স্লিপ ডিভোর্স।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বাধিক অনুসন্ধান করা একটি বিষয় হচ্ছে ‘হ্যাসট্যাগ স্লিপ ডিভোর্স’।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, স্লিপ ডিভোর্সের প্রভূত উপকারীতা রয়েছে। এতে ঘুম ভালো হয়। আর ঘুম ভালো হলে শরীর, মন দুটোই ভালো থাকে।
ঘুমের সমস্যার সমাধানে কতটা কার্যকর স্লিপ ডিভোর্স
বিয়ের আগে জানতেন না, আপনার সঙ্গী ঘুমের মধ্যে নাক ডাকেন। এখন তাঁর নাক ডাকার কারণে আপনি ঘুমাতে পারেন না। আবার দেখা যায়, ঘুমানোর সময় এসি চলবে কি চলবে না, ফ্যান চলবে কি চলবে না, চললেও কত মাত্রায় চলবে, এসব নিয়েও মনোমালিন্য হয় সঙ্গীর সঙ্গে। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে স্লিপ ডিভোর্স। অর্থাৎ আলাদা বিছানায় বা আলাদা কক্ষে ঘুমানো।
ভারতীয় চিকিৎসক চাঁদনি তুগনাইট বলেন, ‘ঘুমের ব্যাঘাতজনিত কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা, ক্লান্তি, অবসাদ, অস্থিরতা ইত্যাদি ভর করে। এর প্রভাব পড়ে বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর। প্রভাব পড়ে পুরো সংসারে। তাই সামগ্রিক সুস্থতার জন্য ভালো ঘুম হওয়া খুবই দরকার। এ ক্ষেত্রে স্লিপ ডিভোর্স খুবই চমৎকার একটি সমাধান।’
স্লিপ ডিভোর্সের উপকারিতা
ডা. চাঁদনি আরও বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন ও আরামদায়ক ঘুম এনে দিতে পারে স্লিপ ডিভোর্স। এটি আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খু্বই উপকারি। ভেবে দেখুন, আপনার পাশে কেউ নাক ডাকছে না, ঘুমের মধ্যে কেউ আপনার শরীরে পা তুলে দিচ্ছে না, অথবা আপনি নাক ডেকে কারও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন না, এর চেয়ে চমৎকার বিষয় আর কি হতে পারে!’
ঘুমের পরিবেশ: আপনি আপনার মনের মতো করে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে নিতে পারেন। অর্থাৎ ঘরে কতটুকু আলো থাকবে, কতটুকু তাপমাত্রা থাকবে, কত জোরে ফ্যান চলবে, জানালা খোলা থাকবে কি থাকবে না, মশারি টানাবেন নাকি টানাবেন না—এ সব কিছুই আপনি নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এতে আপনার মানসিক প্রশান্তি আসবে আর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।
ঘুমের ব্যাঘাতের সমাধান: যেসব কারণে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত হয়, যেমন নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাত পা ছোড়াছুড়ি করা, স্বপ্নের ভেতর কথা বলা—এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে স্লিপ ডিভোর্স। আলাদা বিছানায় ঘুমানোর কারণে কেউ কারও বিরক্তির কারণ হয় না। এতে দুজনের সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ অটুট থাকে। দাম্পত্য সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়।
নিজেকে সুস্থ রাখা: নিজেকে সব দিক দিয়ে সুস্থ রাখার জন্য ঘুম অপরিহার্য। স্লিপ ডিভোর্স আপনার ঘুমকেই প্রধান্য দেয়। তাই আপনার মেজাজ খারাপ হয় না, হাইপার টেনশন হয় না, রক্তচাপ বাড়ে না। আপনার মস্তিস্ক শান্ত শীতল থাকার কারণে আপনি বুদ্ধিবৃত্তিক কাজেও সফলতা দেখাতে পারেন।
সম্পর্কের উন্নয়ন: পরিপূর্ণ ঘুম হলে মন শান্ত থাকে। মস্তিস্কও স্থির থাকে। এর প্রভাব পড়ে পুরো জীবনযাপনের ওপর। যারা মানসিক ও শারিরীকভাবে সুস্থ থাকে তারা সম্পর্কের যত্ন নিতে পারে। এতে দাম্পত্য সম্পর্কের উন্নতি হয়।
স্লিপ ডিভোর্সের অপকারিতা
ডা. চাঁদনি বলেন, স্লিপ ডেভোর্সের কিছু খারাপ দিকও আছে। যেমন আলাদা ঘুমানোর কারণে শারিরীক দূরত্বের পাশাপাশি মানসিক দূরত্বও তৈরি হয়। সঙ্গীর কাছ থেকে দীর্ঘ দিন দূরে থাকলে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাও কমে যায়। এতে দাম্পত্য সম্পর্ক নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। এসব ক্ষতিকর দিকও ভাবা উচিত।
মানসিক দূরত্ব: আলদা বিছানায় বা আলাদা কক্ষে ঘুমানোর ফলে সঙ্গীর সঙ্গে প্রথমত শারিরীক দূরত্ব তৈরি হয়। এরপর ধীরে ধীরে তা মানসিক দূরত্বে রূপ নেয়। আর মানসিক দূরত্বের প্রভাব পড়ে সংসারের ওপরে, দাম্পত্য সম্পর্কের ওপরে। এতে সংসারজীবনে অশান্তি তৈরি হয়।
এড়িয়ে চলার অনুভূতি: স্লিপ ডিভোর্সকে অনেক সঙ্গী সহজভাবে নিতে পারেন না। তারা মনে করেন, তাঁর সঙ্গী তাঁকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। এতে দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। ভালোবাসার সুতোয় টান পড়ে।
যোগাযোগ: দুজনের মধ্যে মানসিক যোগাযোগও কমে আসে। এক সঙ্গে থাকলে দেখা যায়, এক সঙ্গী আরেক সঙ্গীর চোখের ভাষাও পড়তে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ দিন এক বিছানায় না থাকার কারণে হয়তো সঙ্গীর চোখের দিকে তাকানোর সুযোগই হয় না। এভাবে পারস্পরিক যোগাযোগের নানা উপায় নষ্ট হয়। যেমন এক বিছানায় ঘুমালে সংসারের খুটিনাটি নানা বিষয় নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে আলাপ হয়। কিন্তু স্লিপ ডিভোর্সের কারণে এই যোগাযোগটা আর হয় না।
যৌন সম্পর্কের ওপর প্রভাব: স্লিপ ডিভোর্সের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে যৌন সম্পর্কের ওপর। সঙ্গী দূরে থাকার কারণে স্বতস্ফূর্ত যৌন সম্পর্ক তৈরি হয় না। অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলোয় আন্তরিকার অভাব দেখা যায়।
কিছু ত্রুটি কিছু বিচ্যুতি, কিছু উপকারিতা ও কিছু অপকারিতা নিয়েই স্লিপ ডিভোর্স। তাই স্লিপ ডিভোর্সকে সচেতনভাবে ব্যবহার করা উচিত। ডা. চাঁদনি বলেন, ‘আপনার ঘুমকেও প্রাধান্য দেওয়া উচিত, আবার দাম্পত্য সম্পর্ককেও প্রধান্য দেওয়া উচিত। একটি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনের জন্য এ দুটো বিষয়ের ভারসাম্য রাখতে হয়।’



