
হালের ওয়েব সিরিজের মতো নেই রহস্য কিংবা রোমাঞ্চ। ক্রাইম-থ্রিলারের দিকেও হাঁটেননি নির্মাতা। পুরো মনযোগ দিয়েছেন গল্পের দিকে। গ্রামের মানুষদের প্রতিদিনকার কাজ নিয়েই কাহিনি এগিয়েছে।
গ্রামের সাদাসিধে গল্প ও অভিনয়শিল্পীদের সহজাত অভিনয় দিয়ে প্রথম দুই কিস্তি মাত করেছিল ওয়েব সিরিজ ‘পঞ্চায়েত’। তাই অপেক্ষাটা ছিল তৃতীয় পর্বে সেই প্রত্যাশার চাপ কতটা সামালে দিতে পারেন পরিচালক। তাহলে কতটা জমল পঞ্চায়েত-এর নতুন সিজন?
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন প্রাইমে গত ২৮ মে মুক্তি পেয়েছে পঞ্চায়েত ওয়েব সিরিজের তৃতীয় কিস্তি। এই সিজনে লেখক চন্দন কুমার ও পরিচালক দীপক কুমার মিশ্র খেলেছেন বর্তমান সময়ে গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাজনীতি নিয়ে। আর সাথে ছিল মানবিক সম্পর্কের কিছুটা ছোঁয়া। তবে, এ দুজন চিত্রনাট্যে মানুষের মন নিয়েই এবার ব্যস্ত ছিলেন বেশি।
উত্তর প্রদেশের ফুলেরা গ্রাম, সেখানকার বাসিন্দা, সচিবজি, প্রধানজি, বিকাশ—সবাই কি আগের মতোই আছে? বিধায়ক কি নতুন হাঙ্গামা তৈরি করেছে? ভূষণ এবার কোন মতলব আঁটবে? রিঙ্কির সঙ্গে সচিবজির সম্পর্কটা কি এবার হবে, নাকি অপেক্ষা বাড়বে?
এসব প্রশ্ন নিয়ে অধীর আগ্রহে তৃতীয় সিজনের জন্য বসে ছিলেন পঞ্চায়েতের দর্শকেরা। তাদের নিরাশ করেননি কুমারদ্বয়। আগের পর্বের গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্রই বাদ রাখার ঝুঁকি নেননি। এমনকি হাস্যরস যুক্ত করতে ছোট অনেক চরিত্রকেই ফিরিয়ে এনেছেন। তবে, এবার গল্প বলার ঢঙে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
খুব ছোট করে বললে, তৃতীয় কিস্তি ভিলেজ পলিটিক্সের ওপর ভর করে বানানো। তবে, ভিলেজ পলিটিক্সে দাঙ্গা-হাঙ্গামার যে ছাপ থাকে, এখানে তা খুব একটা দেখা যায়নি। এই দিকে গুরুত্ব না দিয়ে গ্রামবাসীর একতার বিষয়টিকে তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। স্থানীয় বিধায়ক ফুলেরা গ্রামের ওপর নাখোশ। বারবার তাকে বেইজ্জতি করছে এই গ্রামেরই মানুষ। এ কারণে তিনি হামলা করতেই চলে আসেন!
এরপর কী হয়? গ্রামবাসী কীভাবে বিধায়ক ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের মোকাবিলা করে? এমনকি ভূষণ ও তার দলবলও ছিল বিধায়কের পক্ষে। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে এবারের সিজনে। এমনকি প্রধানজি ও ভূষণ নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য গ্রামে কী কী করতে পারেন, তা বোঝানো হয়েছে খুব সহজভাবে। তবে এতেও হাস্যরস ঢেলে দেওয়া হয়েছে পরিমাণমতোই। এখানে গল্প একটু জোর করে টেনে নেওয়ার তাগিদের ছাপ ছিল।
রিঙ্কির সঙ্গে সচিবের সম্পর্কটা এগিয়েছে খুব ধীরগতিতে। প্রথমদিকে গল্পের গতিও ধীর ছিল। এ জন্য দর্শক ধরে রাখা কিছুটা কঠিন হতে পারে অবশ্যই। কিন্তু প্রথম দুই সিজনে যারা উপপ্রধান প্রহ্লাদের হাস্যরসে বুঁদ হয়ে ছিলেন, তারা এ পর্বে দেখবেন তার অভিনয়ের নতুন ঝলক। সামরিক বাহিনীতে থাকা তার ছেলের মৃত্যুর পর তিনি কতটা একা হয়ে গেছেন, তা তার চেহারার অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট ছিল।
সিরিজের এবারের সিজনের শেষটা এবার একটু অন্যরকমই হলো। তবে তাতে বেশ তাড়াহুড়ো ছিল বলেই বোধ হয়েছে। পঞ্চায়েতেন নির্বাচন কি এবার হলো? তা জানতে হলে দেখতে হবে সিরিজটি। শেষদিকের চমকটা কেউ হয়তো আশাও করবেন না।

অভিনয়ে প্রথম দুই পর্বের মতোই দুর্দান্ত ছিলেন প্রায় সবাই। পঞ্চায়েত সচিবের (অভিষেক ত্রিপাঠী) ভূমিকায় জিতেন্দ্র কুমার আগের মতোই স্বাভাবিক চালের অভিনয়টাই করেছেন। প্রধানজির চরিত্রে রঘুবীর যাদব, তাঁর স্ত্রী মঞ্জু দেবীর চরিত্রে নীনা গুপ্তা, বিকাশের চরিত্রে চন্দন রায় ছিলেন ঠিকঠাক। এ ছাড়া অভিনয়ে আরও ছিলেন ভূষণ চরিত্রে দুর্গেশ কুমার, রিঙ্কি চরিত্রে সানভিকা, বিধায়ক চরিত্রে পঙ্কজ ঝা প্রমুখ। চমক দেখিয়েছেন উপপ্রধান প্রহ্লাদের চরিত্রে অভিনয় করা ফয়সাল মালিক। এর আগে ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ ছবিতে এক ঝলক দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এবার তিনি নিজেকে পুরোটাই নিংড়ে দিলেন যেন।

ক্যামেরার কাজ প্রথম দুই পর্বের মতোই দারুণ ছিল। গ্রামের সৌন্দর্য আর গাছের সবুজ পাতায় বাতাসের ঝাপটা দেখানোর জন্য প্রায়ই অ্যারিয়াল শট নিতে হয়েছে। কালার গ্রেডিং নিয়ে বলতে হয়, কিছু সময় গাছের পাতা একটু বেশিই সবুজ দেখা যেতে পারে! এই বিষয়টি কিছুটা বেখাপ্পাও মনে হতে পারে।
তিন নম্বর সিজনে যোগ করা হয়েছে কয়েকটি গানও। মিউজিকে ছিলেন অনুরাগ সাইকিয়া। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ঠিকঠাক ছিল এবারও।
সব মিলিয়ে ‘পঞ্চায়েত’-এর সিজন থ্রি উপভোগ্য অবশ্যই। রহস্য, রোমাঞ্চ আর খুন-খারাবিকে একপাশে সরিয়ে রেখে একটু নির্মল বিনোদন পেতে চাইলে দেখতেই পারেন সিরিজটি।
রেটিং: ৪.৫/৫.০০
পরিচালক: দীপক কুমার মিশ্র
গল্প ও চিত্রনাট্য: চন্দন কুমার
অভিনয়শিল্পী: জিতেন্দ্র কুমার, রঘুবীর যাদব, নীনা গুপ্তা, পঙ্কজ ঝা, চন্দন রায় ফয়সাল মালিক, দুর্গেশ কুমার, সানভিকা প্রমুখ
ভাষা: হিন্দি
ধরন: কমেডি, ড্রামা
মুক্তি: ২৮ মে ২০২৪, প্রাইম ভিডিও
লেখক: সাংবাদিক



