ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিন নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়ে সঠিকভাবে বুঝতে গেলে প্রথমেই দুইটি বিষয় জানতে হবে। এক ডায়াবেটিস, অন্যটি ইনসুলিন।
ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত রোগ। মানুষের অগ্ন্যাশয় নামক অঙ্গের বিটা সেল থেকে ইনসুলিন নামক একটি হরমোন বের হয়, যা আমরা যে সকল খাবার খেয়ে থাকি সেগুলোর বিপাক বা Metabolism এর জন্য অত্যাবশ্যক। এই হরমোনটির অপর্যাপ্ততা থাকলে ডায়াবেটিসের উৎপত্তি হয়। সুতরাং ইনসুলিন হলো মানবদেহের জন্য এক অপরিহার্য হরমোন, যা অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হয়।
একটু বিস্তারিত বললে মানুষ যখন কোনো খাবার খায়, তখন মানুষের শরীর সেই খাবারকে ভেঙ্গে চিনি বা গ্লুকোজে রূপান্তরিত করে। আর ইনসুলিন শরীরের কোষগুলোকে নির্দেশ দেয়, সেই চিনিকে গ্রহণ করার জন্য। এই চিনি মানবদেহের জ্বালানি বা শক্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু অগ্ন্যাশয় যখন শরীরে ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, অর্থাৎ, শরীর যখন রক্তের সব চিনিকে (গ্লুকোজ) ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তখনই ‘ডায়াবেটিস’ বা ‘বহুমূত্র রোগ’ হয়। এমন পরিস্থিতিতে মানবদেহকে সুস্থ রাখার জন্য বাইরে থেকে কৃত্রিম ইনসুলিন দিতে হয়। কারণ ইনসুলিন উৎপাদন বা ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা—এর যেকোনো একটি বা দুটোই যদি না হয়, তাহলে রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র তথ্য অনুযায়ী, অভুক্ত অবস্থায় যদি মানুষের রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ৭ মিলি.মোল/লি এর বেশি পাওয়া যায়, তাহলে তার ডায়াবেটিস আছে বলে ধরা হয়। কিন্তু এই মাত্রার গ্লুকোজ থাকলেই রোগীকে ইনসুলিন গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে না। ডায়াবেটিসের মাত্রা যদি ১৬ দশমিক ৭ মিলি.মোল/লি–এর উপরে চলে যায়, তখন রোগীকে সাধারণত কৃত্রিমভাবে ইনসুলিন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।
ইনসুলিন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সব সময় রক্তের গ্লুকোজের মাত্রার উপর নির্ভর করে না। রোগীকে ইনসুলিন নিতে হবে নাকি হবে না, তা নির্ভর করছে রোগী কোন ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, সেই বিষয়টির উপর। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে যেমন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে, কোনো অস্ত্রোপচার বা সার্জারি, শরীরে কোনো ধরনের ক্ষত ঘা বা ইনফেকশন থাকলে, বিশেষ কোনো রোগের কারণেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন ব্যবহার করা লাগতে পারে, যা দেওয়া হয় ইনজেকশন বা ইনজেক্ট্যাবল কলম বা পাম্পের মাধ্যমে।
ডায়াবেটিস অনেক প্রকার হলেও মূলত দুই ধরনের ডায়াবেটিসই বেশি দেখা যায়। এগুলো হলো– টাইপ ওয়ান ও টাইপ টু ডায়াবেটিস। টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস মূলত বংশগত, অর্থাৎ জেনেটিক কারণে হয়। সাধারণত তরুণ বয়সে, অর্থাৎ ১৮ বছরের আগেই এটি শুরু হয় এবং এক্ষেত্রে বেশিরভাগ রোগীদেরই ওজন আধিক্য থাকে। ডায়াবেটিসের এই ধরন দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের শরীরে ইনসুলিন একবারেই থাকে না। তাই টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস যাদের, তাদেরকে ইনসুলিন দিতেই হবে। কারণ এই হরমোন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
আবার টাইপ টু ডায়াবেটিসে যারা আক্রান্ত, তাদের অগ্ন্যাশয়ে যথেষ্ট ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না অথবা এই হরমোনটি ঠিক মতো কাজ করে না। পৃথিবীতে টাইপ টু ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি এবং এই রোগীদের ক্ষেত্রে অনেকসময় চিকিৎসকরা ইনজেক্ট্যাবল ইনসুলিন দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ একজন টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগী, যার শরীরে ইনসুলিন আছে; কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত না। তখন তাকে ওষুধ, ডায়েট, এক্সারসাইজ দেওয়া হয়। কিন্তু এগুলা দিয়েও যখন তার সুগার কন্ট্রোল করা যায় না, তখন তাকে বাইরে থেকে ইনসুলিন দেওয়া হয়।
অনেক মানুষের মাঝে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, ইনজেক্ট্যাবল ইনসুলিন একবার গ্রহণ করলে তা আর বন্ধ করা যায় না। কিন্তু এটি আসলে একটি ভুল ধারণা। ইনসুলিন গ্রহণের কোনও নেতিবাচক প্রভাব নেই। শরীরে ইনসুলিন কমে গেলে কিছুদিন ইনসুলিন গ্রহণ করার পর সুগার কন্ট্রোল হয়ে গেলে, রোগী জীবনযাত্রাকে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়মের মাঝে রেখে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন আবার বন্ধ করে ওষুধ সেবন করতে পারেন।
তবে নিয়ম অনুযায়ী ইনসুলিন দিলে অবশ্যই নিয়ম করে খাবার গ্রহণ করতেই হবে। অন্যথায় রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তের গ্লুকোজ প্রয়োজনের তুলনায় কমে যেতে পারে অথবা হাইপার গ্লাইসেমিয়া বা রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা তুলনামূলক বেড়ে যেতে পারে এবং উভয় ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিবে। তবে ভুলক্রমে মাত্রা অতিরিক্ত ইনসুলিন ব্যবহার এবং ইনসুলিন নেওয়ার পরপরই খাবার গ্রহণ না করার ফলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে, যা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


লিভারে চর্বি জমলে কী হয়?
মা–বাবার কারণে সন্তানের যে রোগ হয়
খাবারে ফরমালিন ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?
