ইরানে নারীদের একটা সময় ভোটাধিকার, উচ্চশিক্ষার অধিকার এবং সন্তান নেওয়া বা না নেওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা চালু হয়। সে সময় ঘরের বাইরে নারীদের হিজাব পরা এবং চুল ঢেকে রাখার নিয়ম চালু হয়। ধীরে ধীরে নারীদের কিছু কিছু চাকরিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা চালু হয়। এর পাশাপাশি সন্তানকে হেফাজতে নেওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়। আবার চাকরি বা দেশ ছাড়ার ক্ষেত্রে স্বামী অথবা পুরুষ অভিভাবকের অনুমতির নিয়ম চালু করা হয়।
ইরানে বছরের পর বছর দমন–পীড়ন ও হয়রানি সত্ত্বেও নারীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যু সমগ্র ইরানে আবারও ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। নারী, জীবন ও স্বাধীনতা- স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশটির রাজপথ।
চলতি মাসে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সংস্কারপন্থি মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইসলামপন্থি গোঁড়ামির কারণে অতিষ্ঠ ইরানের লাখো মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি।
ইতোমধ্যেই পরিবর্তনের হাওয়া দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। নিজের ক্যামেরার লেন্সে সে দৃশ্যের অনেকটাই তুলে ধরেছেন ফটোসাংবাদিক ফারাউ আলেই। তিনি বলেন, ‘আমি যখন ফটোগ্রাফি শুরু করি, আমার পরিবার থেকে শুরু করে, বন্ধুবান্ধব সবাই সতর্ক করেছিল। তাদের মতে, এখানকার নারীদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’
এসব কথা শোনার পরেও থেমে যাননি ফারাউ। নিজের সাহসিকতায় সামনের দিকে এগিয়ে যান। ফারাউ বলেন, ‘আমার এই প্রকল্প ইরানের রোল মডেলদের কেন্দ্র করে। যাদের কাঁধে ভর করে এই প্রজন্ম সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্যাবু ভেঙ্গেছে, তারাই আমার ক্যামেরায় উঠে এসেছেন।’
ইরানের কট্টর শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থেকেছেন যারা, চলুন দেখি তাদের এক ঝলক-
কিয়ানা ইয়ারহমাদি ও নিলুফার ফারাহমান্দ
ইরানে একেবারে শুরুর দিকে গাড়ি মেকানিকের কাজ শুরু করেন যেসব নারী, তাদের অন্যতম ছিলেন কিয়ানা ইয়ারহমাদি ও নিলুফার ফারাহমান্দ। অটো-মেকানিক ইনস্টিটিউটগু লোতে নারীদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স না থাকায়, তারা নিজেরাই নিজেদের শেখাতে শুরু করেন। ইনস্টাগ্রামে এসব প্রশিক্ষণের ভিডিও প্রকাশ করলে তা ভাইরালে রূপ নেয়।
এলনাজ রেকাবি
২০২১ সালে মস্কোতে আইএফএসসি ক্লাইম্বিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জেতেন ইরানের এই পর্বতারোহী। কিন্তু তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন পরের বছর। সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মাথায় কোনো স্কার্ফ ছাড়াই সিউলে আইএফএসসি এশিয়া চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন তিনি। সেইবার কোনো পদক জেতেননি এলনাজ। কিন্তু সবার মুখে মুখে ছিল একটাই ধ্বনি, ‘এলনাজ দ্য চ্যাম্পিয়ন’।
আজম সানেই
আজম ইরানের নারী আইস হকি দলের অধিনায়ক ও সহকারী কোচ। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হকি খেলতে শুরু করেন আজম। আজমের পদাঙ্ক যারা অনুসরণ করতে চান, তাদের জন্য তাঁর পরামর্শ, পুরো পৃথিবী তোমার কাছে যা চায়, সেটি বাস্তবতা নয়। আমাদের মনে আর হৃদয়ে যা রয়েছে, সেটিই হলো বাস্তবতা। যদি ইচ্ছা আর প্যাশন থাকে, তাহলেই পরিবর্তন ও সফলতা অবশ্যই আসবে।
পারভা কারখানে
বিয়ে এবং সন্তান পালন ছিল উত্তরপশ্চিম ইরানের কুর্দি অঞ্চলের রক্ষণশীল পরিবারের নারীদের কর্তব্য। এই চিরাচরিত ভূমিকার বাইরে গিয়ে পারভা নিজেকে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে পরিস্থিতির কারণে গ্যালারি, এমনকি নিজের ঘরেও তাঁকে অনেক ছবি কাগজ বা কাপড়ে ঢেকে রাখতে হয়। পারভার মতে, কিছু দেয়াল সব সময়ই থাকবে, যা আমাদের চিন্তাকে সীমাবদ্ধ করে রাখে।
যাহরা ইয়াজদানি চেরাতি
একজন দক্ষ রেসলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন যাহরা ইয়াজদানি চেরাতি। কিন্তু ইরানে তাঁর মতো নারী ক্রীড়াবিদদের তীব্রভাবে নজরদারির আওতায় রাখা হয়। ফলে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তাঁকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
বেহিন বলৌরি ও সামিন বলৌরি
বেহিন বলৌরি ও সামিন বলৌরি দু’বোন। ইরানে সাধারণত নারীদের জনসমক্ষে গান গাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এ দুই বোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সুরের মূর্ছনা পৌঁছে দিয়েছেন হাজারও অনুসারীর কাছে।
গত বছর দেশটিতে মাহসা আমিনির বিক্ষোভের সময়টায় তারা ইতালিয়ান ফ্যাসিবাদ বিরোধী ফোকগান ‘বেলা চাও’য়ের ফার্সি সংস্করণ প্রকাশ করেন। ‘আমরা কখনোই স্বপ্ন দেখা ছাড়িনি এবং এই স্বপ্নগুলো আমাদের গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়’, গানে গানে বলেন বেহিন ও সামিন।
নাসরিন তৈমুরি
পেশায় স্টান্টওম্যান নাসরিন ইরানের প্রথম নারী স্টান্ট দলের সুপারভাইজর। সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়া, গাড়ি ভাঙচুর কিংবা গায়ে আগুনের কারসাজি-সবকিছুই এ স্টান্টের অন্তর্ভুক্ত।
নাসরিন বলেন, ‘আমার দেশের যেসব নারীরা তাদের স্বপ্ন পূরণের পথে আছেন, তাদের আমি সহযোগিতা করতে চাই। স্টান্টওম্যানদের পরামর্শদাতা (মেন্টর) হতে চাওয়ার পেছনে এটাই আমার সবচেয়ে বড় কারণ।’
সোগোল খেইরানডিশ
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক আর হেয়ারস্টাইলে ‘ফ্লো আর্ট’ ইরানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এরই একজন পারফরমার হিসেবে সোগোল নাচ দেখান, আবার কখনো আগুনের কারিকুরি বা অন্যান্য শারীরিক কসরত প্রদর্শন করেন। ইরানে জনসমক্ষে নারীদের নাচে নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দমবন্ধ সমাজে একজন নারীর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী বাধা হলো সেই সমাজের নিম্ন মানসিকতার লোকজন।’
হাস্তি রেজাই
ইরানে নারীরা গাড়ি চালাতে পারলেও শহরগুলোতে মোটরসাইকেলের লাইসেন্স অবৈধ। এমন একটি দেশেই হাস্তি সর্বকনিষ্ঠ নারী মোটোক্রস রাইডার। একাধিক ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হাস্তি বলেন, ‘মানুষ মনে করে এটি একটি পুরুষালি খেলা এবং নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের কেউ কেউ আমার কাছে জানতে চান , ‘‘তোমার ভয় করে না? যদি আহত হও?’’ আমি বলি, ইনজুরি ঝুঁকির একটি অংশ শুধু।’


স্বামীর অত্যাচারে ঘরছাড়া মেয়েটির ১০বার এভারেস্ট জয়
প্রকৃতি রক্ষায় ৭৩৮ দিন গাছে থাকেন জুলিয়া
ফ্যাশন জগতকে বদলে দেওয়া কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা 
