আফগানিস্তান কি নারীদের জন্য কারাগার হয়ে উঠছে?

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:৫৩ পিএম

আফগানিস্তানে তালেবানের প্রথম শাসনামল নারীদের জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান যখন দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা দখলে নেয়, তখন দেশটি নারীদের জন্য কেমন হবে, তা নিয়ে মিশ্র মতামত ছিল। আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী মহল ও দাতাগোষ্ঠীদের একাংশের ধারণা ছিল, এবারের তালেবান নেতারা উদার হবেন, তাঁরা নারীদের প্রতি কিছুটা হলেও সুবিবেচনার পরিচয় দেবেন। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।

তালেবানের তিন বছরের শাসনামলে একটু একটু করে দেশটির নারীরা এরই মধ্যে প্রায় সব ধরনের অধিকার হারিয়েছেন। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট ক্ষমতা দখলের পর মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা নিষিদ্ধ করে তালেবান। ফলে ১৪ লাখ আফগান মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। দেশটিতে এখন মেয়েরা শুধু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। তবে সেখানেও দ্রুত কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

ক্ষমতা দখলের পরপরই বলতে গেলে সব ধরনের সরকারি চাকরি থেকে নারীদের সরিয়ে দেয় তালেবান শাসকগোষ্ঠী। তাদের বলে দেওয়া হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অফিসে আসার দরকার নেই। পরবর্তী নির্দেশ আর আসবে না বলে ধরে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরপর একে একে নারী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বাতিল, নারীদের পড়াশোনা, চলাফেরা, পোশাক, খেলাধুলা, পার্কে যাওয়া, সংবাদ উপস্থাপনের মতো বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।  সবশেষ ‘পাপ-পূণ্য’ বিষয়ক আইনের অধীনে এক আদেশ জারি করা হয়েছে দেশটিতে। গত মাসের শেষ দিকে জারি করা এই আদেশে নারীর শরীরকে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। 

নতুন আদেশে ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় মুখমণ্ডলসহ নারীদের সারা শরীর কাপড়ে ঢেকে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমন করে ঢাকতে হবে, যাতে কোনো নারী বা মেয়েকে দেখে কোনো পুরুষ ‘প্রলুব্ধ’ না হয়। নারীর কণ্ঠস্বরকে গোপন রাখতে বলা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী যখন প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাবে, তাকে অবশ্যই তার কণ্ঠস্বর, মুখমণ্ডল ও শরীর গোপন রাখতে হবে।’ ফলে জনসম্মুখে জোরে কথা বলা কিংবা গান গাওয়ার মতো কাজ আফগান নারীরা করতে পারবেন না। 

নতুন আইন অনুযায়ী, স্বামী বা রক্তের সম্পর্কের (পিতা-ভাই) নয়–এমন কোনো পুরুষের দিকে সরাসরি তাকাতে পারবে না নারীরা। পুরুষ সঙ্গী নেই–এমন কোনো নারীকে গাড়িতে তুললে চালককে শাস্তি পেতে হবে। আর যেসব নারী এসব আইন পালনে ব্যর্থ হবে, তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

তালেবানের নতুন আইনকে অসহনীয় মাত্রায় কড়াকড়ি বলে মন্তব্য করেছেনে জাতিসংঘের আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি রোজা অটুনবায়েভা। তিনি বলেন, ‘এসব আইন আফগানিস্তানের জন্য একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। এই আইনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথেচ্ছ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’

আইনটি সম্পর্কে দ্য কনভারসেশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, এই আইনে বলা হয়েছে সমাজের ‘বিশ্বাসযোগ্য’ দুজন ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে ‘ক্ষমতাবান’ যেকোনো ব্যক্তিই আইনটি প্রয়োগ করতে পারবেন। আইনটির এই ধরনের অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট ভাষা বেশ উদ্বেগজনক। কারণ, ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে যে কারও বিরুদ্ধে আইনটি প্রয়োগ করা হতে পারে।

মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা নিষিদ্ধ করেছে তালেবান। ছবি: রয়টার্সনতুন আইনটি আফগান সমাজকে এরই মধ্যে সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। রাজধানী কাবুলের শাবানা নামের এক নারী বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা যদি কথাই বলতে না পারি, তাহলে বেঁচে থেকে লাভ কী? এখন আমরা হাঁটাচলা করতে পারা কিছু মৃত মানুষের চেয়ে বেশি কিছু নই।’

অথচ কিছুদিন আগেও শাবানা বান্ধবীদের সঙ্গে একটি প্রাইভেট সেন্টারে ইংরেজি শিখতেন। নতুন আইন ঘোষণার পর ইংরেজি শিখতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। তবে মায়ের উৎসাহে আবারও ইংরেজি শিখতে যাচ্ছেন শাবানা।

শাবানা বলেন, ‘এখন যতক্ষণ বাইরে থাকি, সারাক্ষণ ভয় হয়। গাড়িতে ভয় করে। প্রাইভেটে যাওয়ার সময় আমরা গাড়িতে মাস্ক খুলতে পর্যন্ত সাহস করি না। পরস্পরের সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলি না। কারণ ভয় হয়, তালেবান যদি শুনে ফেলে!’

তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বলেন, ‘ইসলামি শরিয়া আইনের আলোকে এই আইনটি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা (হায়বাতুল্লাহ আকুন্দজাদা) অনুমোদন করেছেন। যেকোনো ইসলামিক বিশেষজ্ঞ তা খতিয়ে দেখতে পারেন।’

তালেবানের এই মুখাপাত্রের সঙ্গে একমত পোষণ করেন না অনেকে। শিরিন নামের এক শিক্ষক জানান, তিনি আফগান নারীদের শিক্ষাদানে গোপনে পরিচালিত একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এই নারী বলেন, ‘এটি শরিয়ত নিয়ে তাদের মনমতো ব্যাখ্যা। ইসলামে পড়াশোনা থেকে শুরু করে সব বিষয়ে নারী‑পুরুষকে সমানাধিকার দেওয়া হয়েছে। তারা (তালেবান) তো বলছে, নারীর কণ্ঠস্বর যেন অন্যে না শোনে, তাহলে তো ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়। ইসলামের ইতিহাসে এমন অসংখ্য নারীর বর্ণনা আছে, যারা সমাজের বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেছেন।’

নারীদের ঘরবন্দী করার জন্য তালেবানের একের পর এক আইন ও বিধিনিষেধ ঘোষণা আফগান নারীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন কারিনা নামের এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনিও আফগান নারীদের শিক্ষাদানের গোপন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, কড়াকড়ি আইনের কারণে আফগান নারীরা ‘আত্মহত্যার মহামারিতে ভুগছেন।’

নতুন আইন পাস করার পর তাঁর কাছে সহায়তা চেয়ে নারীদের ফোনের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে কারিনা বলেন, ‘আমার এক বান্ধবী মেসেজ দিয়ে জানালেন, এটিই তাঁর শেষ মেসেজ। তিনি তাঁর জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবছেন। অনেকে মনে করেন জীবনের সব আশা শেষ হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই।’

নারীকে কণ্ঠস্বর, মুখমণ্ডল ও শরীর গোপন রাখতে হবে বলে আদেশ জারি করেছে তালেবান। ছবি: রয়টার্সনারীদের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে তালেবান সরকারের এটিই প্রথম আদেশ ছিল না। তিন বছর আগে ক্ষমতা গ্রহণ করেই নারীদের চলাফেরা নিয়ে একগুচ্ছ বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছিল শাসকগোষ্ঠীটি। এরপর কাবুল থেকে শুরু করে দেশটির অন্য শহরগুলোর রাস্তায়, বাজারে নারীর উপস্থিতি কমতে থাকে। এখন তা শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে।

নারীদের প্রতি তালেবানের এসব কড়াকড়ি বিধিনিষেধের প্রতি ইঙ্গিত করে নওশিন নামের এক অধিকারকর্মী বিবিসিকে বলেন, ‘প্রতি মুহূর্তে নিজেকে মনে হবে কারাগারে আছেন। এমনকি নিঃশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত এখানে কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

নারী অধিকার কেড়ে নেওয়া ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলে চাপে থাকলেও খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না তালেবান সরকার। শোনা যায়, তালেবান সরকারের একটা অংশ নারীদের কিছু কিছু অধিকার দেওয়ার পক্ষে। কিন্তু কান্দাহারভিত্তিক জ্যেষ্ঠ নেতাদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। 

ক্ষুধা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, চিকিৎসাহীনতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধুঁকতে থাকা তালেবান সরকার নারীদের কতদিন কত দূর পর্যন্ত কণ্ঠরোধ করে রাখতে পারবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তবে অবরোধবাসী হয়ে পড়া আফগান নারীরা যে সহসা তালেবানের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারছেন না, তা স্পষ্ট।

রাজধানী কাবুলের মতো শহরগুলোতে রাস্তায় অল্পসংখ্যক নারীদের দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁদের প্রায় সবাই কালো অথবা গাঢ় নীল রঙের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা ঢিলেঢালা বোরকার মতো পোশাক পরে থাকেন। অধিকাংশের পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা থাকে, শুধু চোখ দেখা যায়। 

তবে হাজার প্রতিকূলতার মধ্যে আফগান নারী ও মেয়েরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি কিছু আফগান নারীকে প্রতিবাদী ভিডিও পোস্ট করতে দেখা গেছে। মুখঢাকা এসব ভিডিওতে গাওয়া গানে তাদের বলতে শোনা গেছে ‘চল, একটি কণ্ঠস্বর হই, চল হাতে হাত ধরে একসঙ্গে হাঁটি এবং নির্মমতা থেকে মুক্ত হই।’ নিজের মুখ ও শরীর কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে গান গেয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে এক নারী বলেন, ‘আপনি ভবিষ্যতের জন্য আমার কণ্ঠরোধ করেছেন। একজন নারী হওয়ার কারণে আপনি আমাকে আমার বাড়িতে বন্দি করে রেখেছেন।’ নারীদের আরেক দল স্লোগান দেন, ‘নারীর কণ্ঠ, ন্যায়ের কণ্ঠ’। গুটিকয় আফগান নারীর কণ্ঠস্বর দেশটিকে কতটা নাড়া দিতে পারবে এবং অধিকার ফিরে পেতে কতদিন লাগবে সেটিই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য কনভারসেশন, দ্য গার্ডিয়ান, এএফপি, রয়টার্স

হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী কার্ড’ দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী।  বুধবার বিকালে কুড়িগ্রাম শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত ‘দেশ গড়তে...
ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের দমন করার ঘটনা সংক্রান্ত পুলিশের যাবতীয় নথিপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও চিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন দিল্লি হাইকোর্ট।
চলতি বছর না হলেও আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা...
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রুলের বিষয়ে জেনে বিদ্যমান আইন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে কী অবস্থা আছে...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর